Skip to main content

প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর বেতন-ভাতা কত ছিল

 খলিফা হয়েই আবু বকর (রা.) একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন, ‘লোক সকল, আপনাদের মধ্যকার সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি যদিও আমি নই, তবু আমাকে আপনাদের দায়িত্বশীল নির্বাচিত করা হয়েছে।

যদি এ ক্ষেত্রে আমি কল্যাণের দিকে এগোই, তবে আপনারা আমাকে সহযোগিতা করবেন; আর বিপথে গেলে আপনারাই আমাকে সঠিক পথে নিয়ে আসবেন।’ (ইবনে জারির তাবারি, তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক, ৩/২১০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৭)

খলিফার বেতনের উদ্যোগ

আবু বকর (রা.) খলিফা হয়েছেন; বলা যায় একরকম পিড়াপিড়ি করেই তাঁকে এই মহান দায়িত্বে বসানো হয়। পরদিনই তিনি কাপড়ের গাট্টি মাথায় নিয়ে সাধারণ মানুষের মতো বাজারের দিকে রওনা হন। তিনি মূলত কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন এবং এতেই তাঁর সংসার চলত।

হজরত ওমর (রা.) বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি খলিফাকে আবু উবায়দা (রা.)-এর কাছে নিয়ে যান। খলিফাকে যৎসামান্য বেতন-ভাতা নিতে রাজি করানো হয়।

মৃত্যুর সময় তিনি পরবর্তী খলিফার জন্য যা রেখে গিয়েছিলেন, তা হচ্ছে স্রেফ একটি দাস, একটি গামলা ও একটি সাধারণ চাদর।

বেতন–ভাতা নির্ধারণ হয়

প্রথম অবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার (বায়তুল মাল) থেকে তাঁর জন্য প্রতিদিন অর্ধেক ভেড়া, বার্ষিক দুই হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) বেতন ও কিছু সাধারণ কাপড় নির্ধারণ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে পরিবারের প্রয়োজন ও জীবন ধারণের আবশ্যকতা বিবেচনা করে বেতনের পরিমাণ বাড়িয়ে দৈনিক একটি ভেড়া ও বার্ষিক তিন হাজার দিনার করা হয়। খলিফা মিম্বরে দাঁড়িয়ে এ ব্যাপারে জনগণের কাছ থেকে সম্মতিও নিয়েছিলেন। (ইবনে সাআদ, তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৪৬-১৪৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, মৃত্যুর আগে আবু বকর (রা.) বলছিলেন, ‘ওমরের পিড়াপিড়িতে বাধ্য হয়ে আমি বায়তুল মাল থেকে মোট ছয় হাজার দিরহাম নিয়েছিলাম।’

কেমন ছিল তার জীবনযাত্রা

তিনি অতিসাধারণ জীবন যাপন করতেন। খলিফা হওয়ার আগে তিনি মহল্লাবাসীর বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। খলিফা হওয়ার পর এক নারী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আপনি তো এখন খলিফাতুর রাসুল, আর কখনো আমাদের বকরির দুধ দোহন করে দেবেন না মনে হয়।’

আবু বকর (রা.) বললেন, ‘অবশ্যই দোহন করে দেব এবং আশা করব, নতুন এই দায়িত্ব যেন আমার পুরাতন জীবনচরিতকে বদলে না দেয়।’ এরপর তিনি আগের মতোই প্রতিবেশীদের বকরির দুধ দোহন করে দিতেন। (ইবনে সাআদ, তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৮৬)

হজরত ওমর (রা.) মদিনার এক অন্ধ বৃদ্ধার বাড়িতে প্রতিদিন ভোরে গিয়ে তাঁর ঘরের কাজ করে দিতেন। একদিন গিয়ে দেখেন, কে যেন কাজগুলো আগেই করে দিয়ে গেছেন। রোজই এমন হতে থাকল।

পরে তিনি লুকিয়ে থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, কাজ শেষ করে ছদ্মবেশে যিনি বেরিয়ে আসছেন, তিনি স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর (রা.)।

মৃত্যু পূর্বে তাঁর সম্পদের পরিমাণ

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আবু বকর যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন আমি তাঁর পাশে উপস্থিত হই। তাঁর ওপর মৃত্যুর বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পেয়ে গিয়েছিল। নিশ্বাস যেন বুকে এসে আটকে যাচ্ছিল।

তিনি বললেন, “আয়েশা, পরিবারের সকলের মধ্যে আমার কাছে তুমিই সবচেয়ে প্রিয়। আমি তোমাকে একটি বাগান উপহার দিয়েছিলাম, কিন্তু এই মুহূর্তে অন্তরে খটকা অনুভব করছি। অতএব তুমি এটি মিরাসের (উত্তরাধিকার) মধ্যে ফেরত দিয়ে দাও।”

আয়েশা তা ফিরিয়ে দিলে আবু বকর বলেন, ‘আমি খলিফা হওয়ার পর মুসলমানদের একটি দিনার বা একটি দিরহামও অন্যায়ভাবে খাইনি। আমি ভুসিযুক্ত আটা খেয়েছি এবং মোটা কাপড় পরেছি।

শুধু একটি হাবশি গোলাম আর উট আছে। এ ছাড়া মুসলমানদের ফাই-এর (রাষ্ট্রীয়) সম্পদ থেকে আমার কাছে আর কিছুই নেই। সে দুটি পৃথক করে নাও এবং আমার ইন্তেকালের পর সেগুলো ওমরের হাতে পৌঁছে দেবে। আমার আঁচল এগুলো থেকে মুক্ত করে দেবে।’

রাষ্ট্র থেকে নেওয়া বেতন পরিশোধ

ইন্তেকালের পর বায়তুল মাল থেকে নেওয়া আবু বকরের দাস ও উট আয়েশা (রা.) খলিফা ওমরের কাছে পৌঁছে দেন। ওমর কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।

তিনি বলতে থাকেন, “আল্লাহ, আবু বকরের ওপর রহম করুন, তিনি পরবর্তীদের জন্য কাজ (খেলাফত পরিচালনা) কঠিন করে দিয়ে গেছেন।” কথাটি তিনি তিনবার বলেন।’ (ইবনে সাআদ, তাবাকাতুল কুবরা, ৩/১৪৬-১৪৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)

অন্য এক বর্ণনায় আছে, মৃত্যুর আগে আবু বকর (রা.) বলছিলেন, ‘ওমরের পিড়াপিড়িতে বাধ্য হয়ে আমি বায়তুল মাল থেকে মোট ছয় হাজার দিরহাম নিয়েছিলাম। অমুক জায়গায় আমার যে বাগানটি আছে, তা এগুলোর পরিবর্তে বায়তুল মালকে দিয়ে দিলাম।’

যখন তিনি ইন্তেকাল করেন এবং ওমরের কাছে তা হস্তান্তর করা হয়, তখন ওমর বলেন, ‘আল্লাহ, তাঁর ওপর রহম করুন। তিনি এটাই চাচ্ছিলেন যে ইন্তেকালের পর যেন কেউ তাঁর সততা নিয়ে আঙুল তুলতে না পারে।’ (ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম, ৪/১২৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)

  • ইলিয়াস মশহুদ : আলেম ও গবেষক

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...