Skip to main content

হালাল ক্যারিয়ার গঠনে ইসলামের ৫ নীতি

 জীবিকা নির্বাহের জন্য চাকরি, ফ্রিল্যান্সিং বা যেকোনো পেশা বেছে নেওয়া মানুষের জীবনের একটি বড় অংশ। অনেকেই মনে করেন ইসলাম কেবল ব্যবসা–বাণিজ্যের নিয়ম নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চাকরিজীবী, করপোরেট কর্মী ও নিয়োগকর্তাদের জন্যও শরিয়ত দিয়েছে অমোঘ কিছু নীতিমালা।

কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখা ও কর্মীর অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি বড় ইবাদত। কর্মক্ষেত্রে সততা ও হালাল ক্যারিয়ার গড়ে তোলার এমন পাঁচটি সোনালি ইসলামি নীতি নিচে আলোচনা করা হলো।

১. শর্তের প্রতি শতভাগ অনুগত থাকা

যেকোনো সংস্থায় যোগ দেওয়ার সময় যে কাজের বিবরণ (জব ডেসক্রিপশন) ও শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়, তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা প্রত্যেক কর্মীর ধর্মীয় দায়িত্ব।

কোনো ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়, তবে অলসতা বা অবহেলার কারণে কাজের সময় নষ্ট করলে তার বেতন থেকে বরকত কমে যায় এবং সে আমানতের খেয়ানতকারী হিসেবে গণ্য হয়। (ইবনে কুদামাহ, আল–মুগনি, ৬/৪৩, মাকতাবাতুল কাহেরা, কায়রো, ১৯৬৮)

নিয়োগকর্তা বা বসের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো কর্মীর কাজের মূল্যায়ন করা এবং তার প্রাপ্য বেতন–ভাতা কোনো ধরনের টালবাহানা ছাড়া বুঝিয়ে দেওয়া।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১)

২. পারিশ্রমিক সময়মতো পরিশোধ করা

নিয়োগকর্তা বা বসের জন্য সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো কর্মীর কাজের মূল্যায়ন করা এবং তার প্রাপ্য বেতন–ভাতা কোনো ধরনের টালবাহানা ছাড়া বুঝিয়ে দেওয়া।

আব্বাসীয় যুগের বিখ্যাত প্রধান বিচারপতি ইমাম আবু ইউসুফ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত শ্রমের অধিকার নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, কোনো কর্মীকে খাটিয়ে তার পারিশ্রমিক আটকে রাখা বা দেরিতে দেওয়া একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক জুলুম, যা রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করে। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১৩২, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৭৯)মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩)

৩. কর্মক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বর্জন

আজকের করপোরেট বা সরকারি চাকরিতে প্রমোশন, নতুন নিয়োগ কিংবা ফাইল পাসের ক্ষেত্রে ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অযোগ্য ব্যক্তিকে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কোনো পদে বসানো আমানতের বড় খেয়ানত এবং ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত যেকোনো পদ বা অর্থ পুরোপুরি হারাম। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১৩/১২১, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)

কর্মক্ষেত্রের সময়টুকু কর্মীর কাছে একটি আমানত, যা সে বেতনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে। সুতরাং এই সময়ে অবহেলা করা মানে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ বিষয়ে লানত দিয়ে বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩১৩)

৪. কাজের সময়কে আমানত মনে করা

অফিসের সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করা, বসের অনুপস্থিতিতে অলস সময় কাটানো কিংবা ভুয়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দিয়ে ছুটি কাটানো ক্যারিয়ারের হালাল উপার্জনকে কলঙ্কিত করে।

কর্মক্ষেত্রের সময়টুকু কর্মীর কাছে একটি আমানত, যা সে বেতনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে। সুতরাং এই সময়ে অবহেলা করা মানে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা। (ইমাম আল–গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/৮৮, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৮২)নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)

৫. কর্মীকে সামর্থ্যের অধিক চাপ না দেওয়া

ম্যানেজার বা নিয়োগকর্তাদের উচিত অধীন কর্মচারীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা এবং তাদের ওপর এমন কোনো কাজের বোঝা না চাপানো, যা তাদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষমতার বাইরে।

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা এতটাই ওপরে যে তাদের দাস বা নিচু স্তরের ভাবা যাবে না; বরং তাদের নিজেদের ভাইয়ের মতো সম্মান দিতে হবে। (ইমাম নববি, শারহু সহিহ মুসলিম, ১১/১৩১, দারুল ইহয়া আত–তুরাস আল–আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)

মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তারা তোমাদেরই ভাই, আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন... সুতরাং তাদের এমন কাজের কষ্ট দিয়ো না, যা তাদের সাধ্যের অতীত, আর যদি এমন কঠিন কাজ দাও, তবে তোমরা নিজেরাও তাদের সাহায্য করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০)

কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি তাঁর পদের কারণে কোনো পক্ষ থেকে উপহার বা অতিরিক্ত টাকা নেন, তবে তা ‘হাদিয়া’ নয়; বরং একপ্রকার সুপ্ত ঘুষ বা আত্মসাৎ।

কর্মজীবীদের ৩টি জিজ্ঞাসা

১. চাকরিজীবীদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে ‘উপহার’ বা ‘বকশিশ’ নেওয়ার বিধান কী?

শরিয়তের দৃষ্টিকোণ হলো, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি যদি তাঁর পদের কারণে কোনো পক্ষ থেকে উপহার বা অতিরিক্ত টাকা নেন, তবে তা ‘হাদিয়া’ নয়; বরং একপ্রকার সুপ্ত ঘুষ বা আত্মসাৎ।

মহানবী (সা.) সরকারি কর্মকর্তার এমন উপহার গ্রহণকে সরাসরি ‘খেয়ানত’ বলে অভিহিত করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৬০১)

২. কেউ যদি সুদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তবে তাঁর আয়ের বিধান কী হবে?

ইসলামে সরাসরি সুদের হিসাব রাখা, সুদের চুক্তি লেখা বা সুদে সাহায্য করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইমাম শাফেয়ি লিখেছেন, যে কাজের মূল ভিত্তিই হারাম, তার মাধ্যমে অর্জিত আয়ও শরিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। (ইমাম শাফেয়ি, কিতাবুল উম্ম, ৩/২৫৪, দারুল মা’রিফা, বৈরুত, ১৯৯০)

তবে সুদের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয়, এমন সাধারণ আইটি বা সিকিউরিটি পদে থাকলে ওলামাদের ভিন্ন মত রয়েছে।

৩. বর্তমান যুগের ফ্রিল্যান্সিং বা রিমোট জবের ক্যারিয়ারের হালাল–হারাম হওয়ার বিষয়টিও নির্ভর করে কাজের ধরনের ওপর। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে যে কাজটি করা হচ্ছে (যেমন ওয়েব ডিজাইন, কনটেন্ট রাইটিং বা অ্যাকাউন্টিং)।

তা যদি কোনো অবৈধ বা হারাম পণ্যের (মদ, জুয়া, সুদ) প্রচার বা প্রসারে সাহায্য না করে এবং কাজের চুক্তিতে কোনো ধোঁকা না থাকে, তবে সেই ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ হালাল। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১৩৮)

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...