Skip to main content

কাজি শুরাইহ: ইসলামের বিচার বিভাগীয় ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র

 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে কাজি শুরাইহ (র.) তাঁর মেধা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়নিষ্ঠার মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। ‘ন্যায়বিচারের ইমাম’ হিসেবে পরিচিত এই মহান ব্যক্তি প্রায় পঁচাত্তর বছর বিচারকের আসনে আসীন ছিলেন। তাঁর বিচারকক্ষের পরিবেশ ছিল ইনসাফে পরিপূর্ণ।

বিচারক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সর্বদা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি তেলাওয়াত করতেন, “হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি, অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করো এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।” (সুরা সদ, আয়াত: ২৬)

পরিচয় ও প্রারম্ভিক জীবন

শুরাইহ ইবনুল হারিস ইবনে কায়েস আল-কিন্দি ছিলেন বংশগতভাবে ইয়েমেনি। তিনি আইয়ামে জাহেলিয়াত বা প্রাক-ইসলামি যুগ পেয়েছিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে সরাসরি তাঁর সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পাননি বলে তাঁকে ‘তাবেয়ি’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আমল ও ইলমের গভীরতায় তিনি সমকালীন মুসলিম সমাজে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

নিয়োগ ও বিচারিক জীবন

কাজি শুরাইহের বিচারিক মেধার পরিচয় পেয়ে খলিফা ওমর (রা.) তাঁকে কুফার কাজি বা বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন।

নিয়োগের সময় ওমর (রা.) তাঁকে এক ঐতিহাসিক মূলনীতি শিখিয়ে দেন, “আল্লাহর কিতাবে যা পাবে, সে অনুযায়ী ফয়সালা করবে, অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করবে না। যদি না পাও, তবে সুন্নাহ অনুসরণ করবে। আর যদি তাতেও না পাও, তবে নিজ প্রজ্ঞা খাটিয়ে ইজতিহাদ করবে এবং নেককার আলেমদের পরামর্শ নেবে।” (ইবনে আসাকির, তারিখে দামিশক, ২৩/১৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

হজরত ওমর, ওসমান ও আলি (রা.)-এর খেলাফতকাল ছাড়িয়ে উমাইয়া শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময় পর্যন্ত তিনি সুনামের সঙ্গে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। হজরত আলি (রা.) তাঁর বিচারিক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “শুরাইহ হলেন আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক।” (ইবনুল আসির, উসদুল গাবাহ, ২/৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯৪)

অসাধারণ মেধা ও উপস্থিত বুদ্ধি

শুরাইহ কেবল আইনের কিতাব পড়তেন না, মানুষের মনস্তত্ত্বও বুঝতেন। বিখ্যাত তাবেয়ি আমেরুশ শাবি (রহ.) বলেন, একবার এক নারী বিবাদে লিপ্ত হয়ে কাজি শুরাইহের সামনে অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি বললাম, “আহা, এই অসহায় নারী বোধহয় মজলুম।”

কাজি শুরাইহ মুচকি হেসে বললেন, “হে শাবি, নবী ইউসুফের ভাইয়েরাও এশার সময় কাঁদতে কাঁদতেই তাঁদের পিতার কাছে এসেছিলেন (অথচ তাঁরাই ছিলেন অপরাধী)।” (ইবনে আসাকির, তারিখে দামিশক, ২৩/৩২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল চোখের জলে বিগলিত না হয়ে তথ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন।

একজন সাধারণ নাগরিকের বিপরীতে খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত দেখে খ্রিষ্টান লোকটি অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং স্বীকার করেন যে বর্মটি আসলে খলিফারই ছিল।

খলিফার বিরুদ্ধে রায়: একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে খলিফা আলি (রা.) ও এক খ্রিষ্টান ব্যক্তির সেই বিখ্যাত বর্মের মামলাটি কাজি শুরাইহের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দেয়। খলিফা দাবি করেছিলেন বর্মটি তাঁর, কিন্তু তাঁর কাছে কোনো সাক্ষী ছিল না।

কাজি শুরাইহ খলিফার পক্ষ না নিয়ে প্রমাণের অভাবে খ্রিষ্টান ব্যক্তির অনুকূলে রায় দেন। একজন সাধারণ নাগরিকের বিপরীতে খলিফার বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত দেখে খ্রিষ্টান লোকটি অভিভূত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং স্বীকার করেন যে বর্মটি আসলে খলিফারই ছিল। (ইবনে আসাকির, তারিখে দামিশক, ২৩/২৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

স্বজনপ্রীতিমুক্ত ন্যায়বিচার

শুরাইহ (র.) নিজের সন্তানের ক্ষেত্রেও ছিলেন কঠোরভাবে ন্যায়পরায়ণ। একবার তাঁর এক ছেলে একটি বিবাদ নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমি কি এই মামলায় জিতব? যদি জিতি তবেই মামলা করব।” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তুমি মামলা করো।”

আদালতে শুনানি শেষে শুরাইহ তাঁর নিজের ছেলের বিরুদ্ধেই রায় দিলেন। ছেলে ক্ষোভ প্রকাশ করলে তিনি বললেন, “বাবা, আল্লাহর কসম, তুমি আমার কাছে পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে প্রিয়। কিন্তু আল্লাহ আমার কাছে তোমার চেয়েও অধিক সম্মানিত। আমি যদি আগে থেকেই রায় জানিয়ে দিতাম, তবে অপর পক্ষ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে আগেই আপস করে নিত।” (ইবনুল জাওজি, আল-মুনতাজাম, ২/২৭২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯২)

ব্যক্তিগত গুণাবলি ও আল্লাহভীতি

কাজি শুরাইহ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও আল্লাহভীরু। বিচারক হিসেবে অনেক সময় তিনি বলতেন, “অর্ধেক মানুষ আমার ওপর অসন্তুষ্ট থাকে।” অর্থাৎ, যার বিপক্ষে রায় যেত, সে অখুশি হতো। তিনি বলতেন, “উপহার যখন সদর দরজা দিয়ে ঢোকে, ন্যায়বিচার তখন জানলা দিয়ে পালিয়ে যায়।” (ইবনে আসাকির, তারিখে দামিশক, ২৩/৩২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)

এই নীতিবোধই তাঁকে ঘুষ ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রেখেছিল।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ফিতনার সময় (যেমন ইবনে জুবায়ের ও বনি উমাইয়ার দ্বন্দ্ব) তিনি বিচারকার্য থেকে সাময়িক বিরতি নিতেন। তিনি মনে করতেন, অস্থির মনে সঠিক বিচার করা সম্ভব নয়।

কাজি শুরাইহ ১০০ বছরেরও বেশি হায়াত পেয়েছিলেন। হিজরি ৮০ সনের দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি অনাড়ম্বর জানাজা ও দাফনের অসিয়ত করে গিয়েছিলেন।

প্রস্থান ও উত্তরাধিকার

কাজি শুরাইহ ১০০ বছরেরও বেশি হায়াত পেয়েছিলেন। হিজরি ৮০ সনের দিকে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি অনাড়ম্বর জানাজা ও দাফনের অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, “যিনি আমাকে পা দিয়েছেন, তিনিই সেখানে রোগ দিয়েছেন; সুতরাং তাঁর সিদ্ধান্তে আমি সন্তুষ্ট।”

কাজি শুরাইহ কেবল একজন বিচারক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি আদর্শ। আধুনিক বিচারব্যবস্থায় যেখানে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার প্রভাব প্রকট, সেখানে কাজি শুরাইহের জীবন আমাদের শেখায় যে ন্যায়বিচারের পাল্লা সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...