Skip to main content

দাম কম পেলে কি কোরবানির চামড়া নষ্ট করা বৈধ হবে

 পবিত্র ঈদুল আজহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব। বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এক নজিরবিহীন ধস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চামড়ার সঠিক মূল্য না পেয়ে রাগে, ক্ষোভে ও হতাশায় অনেক মৌসুমী ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষ চামড়া মাটির নিচে পুঁতে ফেলছেন।

বাহ্যিকভাবে এটিকে একটি অর্থনৈতিক বা বাজার ব্যবস্থাপনার ক্ষতি মনে হলেও, ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ধর্মীয় ও নৈতিক সংকট। আমাদের এই অবহেলার কারণে সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলো তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কোরবানির পশু জবাই করার পর তার মাংস যেমন তিন ভাগে বণ্টন করা হয়, তেমনি পশুর চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ মূল্যের ক্ষেত্রেও শরিয়তের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

চামড়ায় কোরবানিদাতার মালিকানা

কোরবানির পশু জবাই করার পর তার মাংস যেমন তিন ভাগে বণ্টন করা হয়, তেমনি পশুর চামড়া বা তার বিক্রয়লব্ধ মূল্যের ক্ষেত্রেও শরিয়তের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

কোরবানিদাতা নিজে চাইলে এই চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে ব্যক্তিগত কাজে (যেমন: জায়নামাজ, দস্তরখান বা চামড়ার ব্যাগ তৈরিতে) ব্যবহার করতে পারেন। তবে যদি চামড়াটি বিক্রি করা হয়, তবে তার পুরো টাকা এতিম, মিসকিন ও অভাবী মানুষকে দান করে দেওয়া ওয়াজিব।

রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করল (এবং নিজের কাজে লাগাল), তার কোরবানিই হলো না।” (বাইহাকি, সুনানুল কুবরা, হাদিস: ১০৪৭৪)

অর্থাৎ, চামড়া বিক্রির টাকা নিজের কোনো পার্থিব প্রয়োজনে বা কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

চামড়া নষ্ট করা আমানতের খেয়ানত

চামড়ার বাজার মন্দা হওয়ার অজুহাতে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা বা অবহেলা করে পচিয়ে ফেলা ইসলামের দৃষ্টিতে ‘অপচয়’ (ইসরাফ) এবং এক ধরনের গুনাহের কাজ। ইসলামে সম্পদ নষ্ট করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আল্লাহ-তাআলা পবিত্র কোরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সুরা ইসরা, আয়াত: ২৭)

কোরবানির পশুর প্রতিটি অংশই আল্লাহর নামে নিবেদিত এবং এর চামড়াটি গরিবের জন্য একটি সামাজিক আমানত। বাজারে দাম কম হলেও যতটুকু মূল্য পাওয়া যায়, ততটুকুই আদায় করে হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া কোরবানিদাতার অন্যতম দায়িত্ব।

সিংহভাগ এতিমখানা ও ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’, যেখানে এতিম ও দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়—তাদের সারা বছরের খরচের একটা বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বা চামড়া বিক্রির ফাণ্ড থেকে।

এতিমখানায় নীরব হাহাকার

আমাদের দেশের সিংহভাগ এতিমখানা ও ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’, যেখানে এতিম ও দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়—তাদের সারা বছরের খরচের একটা বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বা চামড়া বিক্রির ফাণ্ড থেকে।

চামড়ার বাজারে ধস নামার কারণে এবং সাধারণ মানুষের অসচেতনতার ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তীব্র আর্থিক সংকটে ভুগছে। কোরবানির চামড়ার বিক্রয়লব্ধ অর্থ কেবল জাকাত ও ফিতরার উপযুক্ত দরিদ্র মুসলিমদেরই দেওয়া যাবে। (ইবনুল আবিদিন, ফাতাওয়ায়ে শামি, ৬/৩২১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

সুতরাং, চামড়া নষ্ট করার অর্থ হলো পরোক্ষভাবে হাজার হাজার এতিম শিশুর মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার পথকে বন্ধ করে দেওয়া।

কসাইয়ের পারিশ্রমিক সমন্বয়

অনেক সময় দেখা যায়, অনলাইন কোরবানি এজেন্সি কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ে কসাইয়ের মজুরি বা চামড়া ছাড়ানোর প্রসেসিং ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে চামড়ার দামকে সমন্বয় (অ্যাডজাস্ট) করা হয়।

অর্থাৎ, চামড়াটি কসাইকে দিয়ে দেওয়া হয় পারিশ্রমিকের অংশ হিসেবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল বা ফাসিদ। আলি (রা.) বলেন, “নবীজি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন... আমি যেন কসাইকে কোরবানির পশুর কোনো অংশ (চামড়া বা গোশত) পারিশ্রমিক হিসেবে না দিই।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭১৭)

কসাইয়ের পারিশ্রমিক সম্পূর্ণ আলাদা নগদ অর্থ দিয়ে মেটাতে হবে, চামড়া দিয়ে নয়।

চামড়ার বাজার যেমনই হোক না কেন, কোরবানিদাতার উচিত অবহেলা না করে দ্রুততম সময়ে চামড়াটি কোনো বিশ্বস্ত এতিমখানা বা প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া।

সচেতনতাই হোক ইবাদতের পূর্ণতা

কোরবানি শুধু পশু জবাই করার নাম নয়, বরং এর সামাজিক কল্যাণকে মজলুম ও দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নাম। চামড়ার বাজার যেমনই হোক না কেন, কোরবানিদাতার উচিত অবহেলা না করে দ্রুততম সময়ে চামড়াটি কোনো বিশ্বস্ত এতিমখানা বা প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে তুলে দেওয়া।

কোরবানির পশুর চামড়া জীবিতাবস্থায় বা জবাইয়ের পর সদকা করে দেওয়া উত্তম। (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০১, মাকতাবায়ে রশিদিয়া, কোয়েটা, ১৯৮০)

তাই আসুন, চামড়া নিয়ে অবহেলা বা ক্ষোভ প্রকাশ না করে, শরিয়তের বিধান মেনে গরিবের এই হকটুকু সদ্ব্যবহার করি এবং আমাদের ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত রাখি।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...