Skip to main content

মশাবাহিত রোগ জাপানিজ এনসেফালাইটিস

 জাপানিজ এনসেফালাইটিস একটি মারাত্মক ভাইরাস সংক্রমণ, যা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্ককে আক্রমণ করে। এটি মূলত ‘ফ্লাভিভাইরাস’ গোত্রের একটি ভাইরাস। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এটি কি বাংলাদেশে হতে পারে?

উত্তর—হ্যাঁ। বাংলাদেশে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এই রোগের প্রকোপ মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। মূলত গ্রামীণ বা আধা শহর এলাকায়, যেখানে ধানখেত এবং জলাশয় বেশি, সেখানে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটে।

পরিসংখ্যান

  • বাংলাদেশে এটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৭৭ সালে, ময়মনসিংহ অঞ্চলে। তখন অনেক মানুষ আক্রান্ত হলেও সঠিকভাবে কতজন আক্রান্ত, কতজন সুস্থ এবং কতজনের মৃত্যু হয়েছে, তা জানা যায়নি।

  • ২০০৩–২০০৫ সালে বাংলাদেশের ৪টি হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় ৪৯২ জন এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ২০ জনের জাপানিজ এনসেফালাইটিস নিশ্চিত হয় এবং তাঁদের মধ্যে দুজন মারা যান।

  • ২০০৭–২০১৬ সালের বড় হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতে ৬ হাজার ৫২৫ জন মেনিনজাইটিস/এনসেফালাইটিস রোগীর মধ্যে ৫৪৮ জনের জাপানিজ এনসেফালাইটিস শনাক্ত হয়। এই গবেষণায় মৃত্যুর মোট সংখ্যা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি।

  • সাম্প্রতিক ২০২৬ সালে ‘ল্যানসেট ইনফেকশান ডিজিজ’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৫৭ হাজার মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হলেও, গড়ে আনুমানিক ১৫৭টি ক্লিনিক্যাল কেস ধরা পড়ে এবং প্রায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়।

  • কেন হয় এই রোগ?

    এই রোগ ছড়ায় কিউলেক্স মশার কামড়ে। ভাইরাসটির প্রধান উৎস শুকর এবং জলজ পাখি (যেমন বক)। মশা যখন এই আক্রান্ত প্রাণীগুলোকে কামড়ানোর পর মানুষকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি মানুষের রক্তে প্রবেশ করে। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি মানুষ থেকে মানুষে সরাসরি ছড়ায় না।

    লক্ষণ ও করণীয়

    অধিকাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না বা সাধারণ জ্বরের মতো মনে হয়। তবে প্রতি ২৫০ জনের মধ্যে ১ জনের ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক রূপ নেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—

    • হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর (১০০ ডিগ্রির বেশি) এবং তীব্র মাথাব্যথা।

    • ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং বমি বমি ভাব।

    • কথা জড়িয়ে যাওয়া।

    • বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন আচরণ।

    • মারাত্মক পর্যায়ে খিঁচুনি হওয়া এবং রোগী অচেতন বা কোমায় চলে যাওয়া।

    এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত নিউরোলজিস্ট এবং বিশেষায়িত হাসপাতালের আইসিইউ সাপোর্টে নেওয়া জরুরি। কারণ, এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতি ৪ জনের মধ্যে ১ জন মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

    স্ট্রোক ও মৃত্যু কেন হয়?

    জাপানিজ এনসেফালাইটিস সরাসরি মস্তিষ্কের কোষে প্রদাহ তৈরি করে। এই প্রদাহের ফলে মস্তিষ্কের ভেতরে চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ছিঁড়ে যেতে পারে, যা থেকে ‘হেমোরেজিক স্ট্রোক’ বা রক্তক্ষরণ ঘটে। মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলেই রোগীর মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

    প্রতিরোধই একমাত্র পথ

    এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ নেই, তাই প্রতিরোধই প্রধান অস্ত্র।

    ১. টিকা নেওয়া: জাপানিজ এনসেফালাইটিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় টিকা নেওয়া। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।

    ২. মশা নিয়ন্ত্রণ: বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং মশার কামড় থেকে বাঁচতে মশারি বা রিপেলেন্ট ব্যবহার করা।

    ৩. সচেতনতা: জ্বর বা স্নায়বিক কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া।

    জাপানিজ এনসেফালাইটিস বিরল হলেও এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। জনসচেতনতা এবং সঠিক সময়ে টিকাদানই পারে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রুখতে।

    সূত্র: ল্যানসেট ও প্রথম আলো

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...