Skip to main content

‘বিপ্লব চত্বরে’ হাজারো প্রাণের মিলনমেলা

 ইথিওপিয়ার আমহারা অঞ্চলের ঐতিহাসিক শহর দেসি। আসরের নামাজ শেষ হতেই দেখা গেল এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। একদল তরুণ হলুদ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে রাজপথ পরিষ্কার করছেন। কেউ বিছিয়ে দিচ্ছেন প্লাস্টিকের লম্বা দস্তরখান, কেউবা দূর থেকে বয়ে আনছেন বড় বড় খাবারের পাত্র।

কোনো রেস্তোরাঁ বা বাড়ির আঙিনা নয়, ইফতারের তোড়জোড় চলছে খোদ পিচঢালা রাজপথে। গত কয়েক বছরে ইথিওপিয়ার শহরগুলোতে ‘স্ট্রিট ইফতার’ বা রাজপথের ইফতার এক নতুন ও শক্তিশালী সামাজিক বিপ্লব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রথম হিজরতের স্মৃতি

প্রাচীন আবিসিনিয়ার সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক নাড়ির। যখন মক্কায় নবদীক্ষিত মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চলছিল, তখন মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবিদের বলেছিলেন লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে আবিসিনিয়ায় চলে যেতে। সেই আবিসিনিয়াই আজকের ইথিওপিয়া।

সেখানকার ন্যায়পরায়ণ রাজা নাজ্জাশির আশ্রয় লাভের সেই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে ‘প্রথম হিজরত’ হিসেবে অমর হয়ে আছে। ইথিওপিয়ার মুসলিমরা গর্ব করে বলেন, “আমরাই সেই জাতি যারা সংকটের সময়ে ইসলামের প্রথম সন্তানদের আগলে রেখেছিলাম।”

বর্তমানে দেশটির প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ মুসলিম, যদিও বেসরকারি হিসেবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

মঞ্চ যখন রাজপথ

দীর্ঘ কয়েক দশক ইথিওপিয়ার মুসলিমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা অবহেলার শিকার ছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালের পর থেকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়ায় এখন আর ইফতার কেবল ঘরের কোণে সীমাবদ্ধ নেই। রাজধানী আদ্দিস আবাবা, সুন্দর শহর দেসি, বাতি কিংবা ওরোমিয়া—সবখানেই এখন রাজপথের ইফতার এক নিয়মিত দৃশ্য।

সবচেয়ে বড় আয়োজনটি হয় আদ্দিস আবাবার প্রাণকেন্দ্র ‘মেসকেল স্কয়ার’ বা বিপ্লব চত্বরে। যেখানে হাজারো নারী–পুরুষ দীর্ঘ দস্তরখানে বসে একসঙ্গে ইফতার করেন।

ইফতারের দস্তরখানে কী থাকে

ইথিওপিয়ার ইফতার মানেই স্থানীয় ঐতিহ্য আর আরব সংস্কৃতির এক মিশেল। তাদের ইফতার টেবিলের মূল আকর্ষণগুলো হলো:

  • ইঞ্জেরা: এটি ইথিওপিয়ার জাতীয় খাবার। টক স্বাদের এক ধরনের পাতলা রুটি, যা বিভিন্ন ডাল বা মাংসের ঝোলের সাথে খাওয়া হয়।

  • বুলগুুর ও শুরবা: গম ও সবজি দিয়ে তৈরি পুষ্টিকর স্যুপ বা শুরবা রোজাদারদের তৃষ্ণা মেটাতে দারুণ কার্যকরী।

  • সাম্বুসা: এটি অনেকটা আমাদের দেশের সিঙ্গাড়া বা সমুচার মতো, তবে ভেতরে থাকে ডাল বা কিমার পুর।

  • ইথিওপিয়ান কফি: ইফতারের পর ইথিওপিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী ‘কফি সেরিমনি’ না হলে তাদের সন্ধ্যাটাই অপূর্ণ থেকে যায়। কফির সাথে অনেক সময় পপকর্নও পরিবেশন করা হয়।

সুরের মূর্ছনায় ইবাদত

ইথিওপিয়ার রমজান সংস্কৃতির একটি অনন্য দিক হলো ‘মানজুমাহ’। এটি মূলত মহানবী (সা.)-এর শানে রচিত এক ধরনের কবিতা।

আরবি, আমহারিক ও ওরোমো ভাষার মিশ্রণে তৈরি এই মানজুমাহগুলো কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই কেবল হাততালি বা ড্রাম (কিছু অঞ্চলে) দিয়ে গাওয়া হয়।

তারাবির নামাজের পর বা সাহরির আগে মসজিদের বারান্দায় বা মাদ্রাসার আঙিনায় বসে বৃদ্ধ থেকে যুবক—সবাই মিলে এই আধ্যাত্মিক গানগুলোতে কণ্ঠ মেলান।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির

ইথিওপিয়ার রমজান কেবল মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাজধানী আদ্দিস আবাবায় এমন অনেক ঘটনা দেখা যায় যেখানে খ্রিষ্টান প্রতিবেশীরা তাদের মুসলিম সহকর্মীদের জন্য ইফতারের খাবার তৈরি করে আনছেন।

দেসি শহরের স্ট্রিট ইফতারে অনেক সময় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। সরকার এই পরিবেশকে আরও উৎসাহিত করতে ‘ঈদ থেকে ঈদ’ কর্মসূচি চালু করেছেন, যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইথিওপিয়ান মুসলিমরা এই সময়ে দেশে ফিরে উৎসবের আমেজ ভাগ করে নিতে পারেন।

সামাজিক সেবার মাস

রমজানকে কেন্দ্র করে ইথিওপিয়ায় দাতব্য কাজের জোয়ার বয়ে যায়। 'আবু জর' এতিমখানার মতো সংস্থাগুলো স্ট্রিট ইফতারকে ব্যবহার করে এতিম শিশুদের জন্য ফান্ড সংগ্রহ করে।

আবার ‘বাব আল-খায়ের’ নামের সংস্থাগুলো গৃহহীন ও দুস্থ মানুষের দ্বারে দ্বারে রান্না করা খাবার পৌঁছে দেয়। ইথিওপিয়ার মুসলিমদের কাছে রমজান মানেই হলো ইমানের পরীক্ষা আর ত্যাগের উৎসব।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...