Skip to main content

প্রতিশ্রুতি রক্ষা আল্লাহর হুকুম

 প্রতিশ্রুতি পূরণ করা নবী-রাসুল ও সৎকর্মপরায়ণ মানুষের বিশেষ গুণ এবং সম্ভ্রান্ত মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা পাপাচারী ও হীন মানুষের চরিত্র। প্রতিশ্রুতি পূরণ করা মুমিনের অন্যতম গুণ। এই গুণ অর্জন না করলে কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যত্নবান হওয়ার আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা-৫ মায়িদা, আয়াত: ১)

কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে হিসাব নেবেন। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা, ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। অবশ্যই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা–১৭ ইসরা, আয়াত ৩৪)

ইসলামে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা ফরজ এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হারাম ও মোনাফেকির লক্ষণ। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) খুব কমই এমন
খুতবা দিয়েছেন, যেখানে তিনি এ কথা বলেননি, ‘যার আমানতদারি নেই, তার ইমানও নেই; আর যার ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতির মূল্য নেই, তার দ্বীন-ধর্মও নেই।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)। তিনি আরও বলেছেন: ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার কথা ও কাজে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (তিরমিজি)

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মোনাফেকের চিহ্ন তিনটি—১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; ২. যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে এবং ৩. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে।’ (বুখারি: ৩২)

নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘যার মধ্যে এই চার স্বভাব রয়েছে, সে স্পষ্ট মোনাফেক; আর এর যেকোনো একটি যার মধ্যে রয়েছে, তার মধ্যে মোনাফেকের লক্ষণ বিদ্যমান, যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। ১. আমানত খিয়ানত করে, ২. মিথ্যা বলে, ৩. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ও ৪. বিবাদে অশ্লীল কথা বলে।’ (বুখারি: ৩৩)

প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে মানুষের মাঝে বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, সম্মান ও পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) একটি ঋণ। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধ করা যেমন অপরিহার্য, তেমনি প্রতিশ্রুতি পূরণে যত্নবান হওয়াও অপরিহার্য। অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘মুমিনের ওয়াদা ওয়াজিব।’ ফিকহবিদগণ বলেন, ‘ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) ঋণ হওয়া এবং ওয়াজিব হওয়ার অর্থ শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া ওয়াদা পূরণ না করা গুনাহের কাজ।’ (তাফসিরে কুরতুবি, তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩৬)

প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে মানুষের মাঝে বিশ্বাসযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, সম্মান ও পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পরিণতি হলো মানুষের কাছে আস্থা ও বিশ্বাস হারানো, ইহকালে ও পরকালে শাস্তির সম্মুখীন হওয়া এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি হওয়া। যাঁরা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন, তাঁদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। প্রতিশ্রুতি এক প্রকার আমানত।

কোরআন মাজিদে বলা হয়েছে, ‘যারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং তাদের আমানত সংরক্ষণ করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।’ (সুরা-২৩ মুমিনুন, আয়াত: ৮-১১)

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর অনন্য গুণ ছিল সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা। এ কারণে কাফির, মুশরিকরাও তাঁকে ‘আল আমিন’ বা ‘বিশ্বাসী’ বলে ডাকত। আমানতদারি বা বিশ্বস্ততা মুমিনের অনুপম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার প্রকৃত পাওনাদারদের নিকট প্রত্যর্পণ করতে।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৫৮)

সফল মুমিনদের সাতটি গুণের অন্যতম হলো, ‘যারা তাদের আমানত ও অঙ্গীকার রক্ষা করে।’ (সুরা-৭০ মাআরিজ, আয়াত: ৩২)। ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রকৃত হকদারগণের নিকট পৌঁছে দাও।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ৫৮) ‘আর তুমি খিয়ানতকারীদের পক্ষে বাদী হয়ো না।’ (সুরা-৪ নিসা, আয়াত: ১০৫) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের খিয়ানত করো না। আর খিয়ানত করো না নিজেদের আমানতসমূহের, অথচ তোমরা জানো।’ (সুরা-৮ আনফাল, আয়াত: ২৭)

  • অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

    সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...