Skip to main content

ইসলামে বয়স্কদের জন্য দুটি বিশেষ উপহার


 জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ যেন এক অদ্ভুত অনুভূতির মধ্য দিয়ে যায়। বয়স্করা প্রায়ই তাদের যৌবনের দিনগুলোর কথা মনে করে, যেন একজন প্রবাসী নিজের জন্মভূমির জন্য হাহাকার করে। তারা অতীতের গল্প বলতে ভালোবাসে। কেউ তার পছন্দের সেরা কবিতা আবৃত্তি করে।

তাদের মন পড়ে থাকে অতীতের স্মৃতিতে, কারণ বর্তমান তাদের কাছে উদাসীন, আর ভবিষ্যৎ মনে হয় কুয়াশায় ঢাকা, মৃত্যুর ছায়ায় ম্লান। শরীর দুর্বল হয়, রোগ-ব্যাধি এসে ভর করে, আর জীবনের বাকি দিনগুলো যেন গুটিয়ে আসে। এই সময়ে তারা শান্তি খোঁজে, মানুষের সঙ্গ আর উষ্ণ সম্পর্কের আশ্রয় চায়। এটাই বৃদ্ধ বয়স।

শেষ বয়সে মানুষ একটু শান্তি ও জীবনের অর্থ খোঁজে। ইসলাম তাদের উভয় জগতে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সম্মান ও যত্নের ব্যবস্থা করতে বলে।

বিশ্বে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি

আমাদের পৃথিবী এখন এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এখন ৭০০ মিলিয়নেরও বেশি। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ২০০০ মিলিয়নে পৌঁছাবে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ। এমনকি ৮০ বছরের বেশি বয়সীদের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে ৪২৬ মিলিয়নে পৌঁছাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি দিন বাঁচছে। উন্নত দেশগুলোতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের হার ১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যার নয়, এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সমাজ জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে। বয়স্কদের চিকিৎসা, বৃদ্ধাশ্রম, অবসরপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চিন্তাধারাও বদলে যাচ্ছে।বয়জ্যেষ্ঠদের ধর্মভীতি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর একটি সীমাবদ্ধতা হলো, এগুলো প্রায়শই শুধু শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়। এগুলো বয়স্কদের জীবনের গভীর প্রশ্ন—যেমন জীবনের উদ্দেশ্য বা পরকালের চিন্তা—নিয়ে কথা বলে না। বয়স্করা যখন মৃত্যুর কাছাকাছি আসেন, তখন তাদের এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দরকার, যা শুধু শারীরিক সুস্থতা দিয়ে পূরণ হয় না।

ইসলামে বয়স্কদের প্রতি যত্ন

ইসলাম বয়স্কদের জন্য দুটি বিশেষ উপহার ঘোষণা করেছে: শান্তির আশ্বাস এবং সম্মানের নিশ্চয়তা।

১. শান্তি: ইসলাম বয়স্কদের আশ্বাস দেয় যে পরকাল তাদের জন্য আরও ভালো হবে। আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস আর তওবার মাধ্যমে তারা মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্তি পেতে পারে। নবীজি (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ তায়ালা শীর্ণ বয়স্ককে শাস্তি দিতে লজ্জা পান।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩৫৮)

আরেকটি হাদিসে এসেছে, এক বয়স্ক ব্যক্তি নবীজির (সা.) কাছে এসে বললেন, “আমার অনেক পাপ আছে, আমি কি ক্ষমা পাব?” নবীজি (সা.) বললেন, “তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।” নবীজি (সা.) বললেন, “তোমার পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫৩০)২. সম্মান: ইসলাম বয়স্কদের প্রতি অসাধারণ সম্মান দেখাতে শেখায়। নবীজি (সা.) বলেছেন, “সে আমার উম্মতের মধ্যে নয়, যে আমাদের বয়স্কদের সম্মান করে না এবং আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৪৩)

ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে দেখা যায়, বয়স্ক অমুসলিমদেরও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতো। খালিদ বিন ওয়ালিদের একটি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, যে বয়স্ক বা দুর্বল অমুসলিমরা জিজিয়া (কর) থেকে মুক্ত থাকবে এবং তাদের জন্য মুসলিমদের তহবিল থেকে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা হবে (ইবনে হিশাম, সিরাতুন নবী, ২/৬৩৫, দারুল কুতুব, কায়রো, ১৯৫৫)

শেষ বয়সে মানুষ একটু শান্তি ও জীবনের অর্থ খোঁজে। ইসলাম তাদের উভয় জগতে শান্তির প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সম্মান ও যত্নের ব্যবস্থা করতে বলে। যখন বিশ্ব বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির মুখোমুখি হচ্ছে, তখন বয়স্কদের প্রতি ইসলামের যত্নের কথা তুলে ধরা অনেক বেশি দরকার।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...