Skip to main content

নিজের জীবনের তুলনা

 


ঢাকা যাচ্ছি। তূর্ণা নিশিথায়। ট্রেনটির কূপে একটি সীট রিজার্ভ করা আছে। তাতে উঠে বসে সহযাত্রী দেখে মন খারাপ হয়ে গেলো। থুত্থুরে এক বুড়ো। মার্চের গরমেও গায়ে শাল দিয়ে উবু হয়ে সামনের সীটে বসে আছেন। পাশে ঠোঙা ভর্তি পান। মেজাজটাই বিগড়ে গেলো। অভিজ্ঞতা থেকে জানি এ বয়সের মানুষের বাড়িতেই ঠিকমতো ঘুম হয় না, ট্রেনে তো তা দূর অস্ত। এরা সারারাত খকখক কেশে রাত পার করেন আর পাশে যে থাকে তার ঘুমের বারোটা বাজান। তার উপর তাঁর মুখ থেকে ভেসে আসছে কড়া জর্দার গন্ধ। রেলের বদ্ধ এসি রুমে এধরনের গন্ধ যে কী ভয়ংকর তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। তার উপর এসি ঠিক মতো কাজ করছে না। আমি কোনো রকমে নাকমুখ চেপে বসে আছি, ট্রেন ছাড়লেই শুয়ে পড়বো, কিন্তু তা ছাড়ার নাম নেই।

ট্রেন নির্জন, শুধু বাতাসে জর্দার কটু গন্ধ। তিনিই সে নির্জনতা ভেঙে বললেন, আপনি খুব বিরক্ত হচ্ছেন তাই না? আমি খুব লজ্জা পেলাম, বয়স্ক একজন মুরুব্বি আমার বিরক্তি ধরে ফেলেছেন, এটা আমাদের সামাজিক ভদ্রতার সাথে যায় না। আমি কথা খুঁজে না পেয়ে আমতা আমতা করতে লাগলাম। তিনি হেসে বললেন, বুড়োদের দেখলে সবাই বিরক্ত হয়, কিন্তু একবারও ভাবে না যে প্রত্যেক বুড়োই আসলে একজন বীর৷ ইফ দেয়ার ইজ অ্যান ওল্ড ম্যান, দেয়ার ইজ আ হিরো। আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে? তিনি জর্দা খাওয়া খয়েরি দাঁত বের করে হেসে বললেন, আমার বয়স নব্বই, তার মানে তরুণ কিংবা পৌঢ়ত্বে আমি মৃত্যুকে জয় করেছি। মৃত্যুর মতো অজেয় শক্তিকে পরাজিত করে নব্বইয়ে কজন পৌঁছাতে পারে ইয়াং ম্যান? তাই প্রতিটি বুড়োই মৃত্যুঞ্জয়ী বীর, হাহাহাহাহা। আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, কথাটা ঠিক তো! এভাবে তো চিন্তা করিনি! আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি যেন মজা পেয়েছেন, হাসি ধরে রেখে বললেন, তবে মাঝে মাঝে তারুণ্যকে খুব হিংসে হয়, আহা! কী অমিত শক্তি তাদের, কিন্তু হিংসে করি না। কেন করেন না? একটু বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। চিরকাল জেনে এসেছি বয়স্কদের ধর্মই হচ্ছে তারুণ্যের প্রতি ঈর্ষা। তিনি নতুন একটি পান মুখে পুরে তা চিবুতে কিছু সময় নিলেন, তারপর বললেন, মহাকালের বিবেচনায় মানবজীবন একটি মুহূর্ত মাত্র। এ অতি ছোট্ট জীবনে হিংসা করার মতো সময় আমার নেই। কারো থাকা উচিত নয়। তাঁর কথাগুলো অদ্ভুত রকমের সত্য, যা আমরা জানি কিন্তু খেয়াল করি না। এবার নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করলাম, এ দীর্ঘ জীবন আপনার কেমন কেটেছে? কোনো আফসোস আছে? গায়ে শালটা আরো ভালোভাবে মুড়িয়ে তিনি বললেন, আফসোস তো সুখের অপর পিঠ। এক পিঠের মুদ্রা হয় কখনো? তারপর আর কিছুক্ষণ পান চিবিয়ে বললেন, অবশ্যই আফসোস আছে। জীবন সব সময় সুবিবেচনা করে না; কিন্তু তারপরও তা সুন্দর, জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। তাঁর প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে, পান খেয়ে দাঁত লাল করা অতি সাধারণ মানুষটি একদম সরল ভাষায় কঠিন সব সত্য বলে যাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, মানুষের সবচে বড়ো ভুলগুলো কী কী? তিনি আবার হাসলেন, ' ইয়াং ম্যান, আপনি আমাকে জ্ঞানী ভাবছেন, আমি কিন্তু তা না, ম্যাট্রিক পাশ মাত্র, হাহাহাহা।' 'আমি শিক্ষা নয় আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে বলছি।' 'মানুষের সবচে বড়ো ভুল চরম বেদনার সময় একা কাঁদা- এসময় খুব প্রিয় একজন মানুষকে সাথে নিয়ে কাঁদলে কষ্ট অনেক কমে যায়। এরপরের ভুল হচ্ছে, সন্তানদের কাছে চোখের পানি লুকানো।' 'বাচ্চাদের সামনে কাঁদতে হবে কেন?' আমি রীতিমতো হতবাক। 'ইয়াং ম্যান, বাচ্চাদের সামনে কান্না লুকাবেন না, কারণ তাদের জানা দরকার কখন মা-বাবা কাঁদেন।' ট্রেন লম্বা হুইসেল দিচ্ছে, যাত্রা শুরুর সংকেত।তিনি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, কোনো হেল্প লাগবে? 'না, এ সামান্য কাজে আপনার সাহায্য নেওয়া মানে নব্বই বছর বয়সেও শরীর শক্ত রেখে খোদা যে দয়া দেখিয়েছেন তাকে অবজ্ঞা করা।' বলতে বলতে তিনি বিছানা গুছাতে লাগলেন। আমি দ্রুত কণ্ঠে বললাম, ঘুমানোর আগে কি আমাকে কিছু একটা বলতে পারেন? যা আমি ফলো করবো। তিনি কাৎ হয়ে শুতে শুতে বললেন, ম্যাট্রিক পাশের আবার উপদেশ! আচ্ছা, যান, শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, কখনোই অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করবেন না, আপনি আসলে জানেন না তিনি কিসের ভেতর যাচ্ছেন। তারপর মাথাটা শাল দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে বললেন, ও আরেকটা কথা আছে, চাকরি চাকরি করে জান দেবেন না, হাসপাতালে ভর্তি হলে মাথার পাশে চাকরি বসে থাকবে না, সেখানে বসে থাকবে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব - তাই চাকরির পাশাপাশি এদেরও যত্ন নেবেন। কথা শেষ করেই তিনি বিড়বিড় করতে লাগলেন, 'আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।' ঘুমানোর আগের দোয়া। দোয়াটি আমার বাবা সব সময় পড়তেন- ‘হে আল্লাহ! আপনারই নামে মরে যাই আবার আপনারই নামে জীবন লাভ করি।’ 'অদ্ভুত সে-ই বুড়ো মানুষটি'/ বাদল সৈয়দ

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...