Skip to main content

একটি ডিভোর্স


 একটি ডিভোর্স 💔

তাহমিনা তানি😔 এইমাত্র একটা চিঠি এলো আমার হাতে। টিউশনি করে বাসায় ফিরছিলাম, গেটে ঢুকতেই সিকিউরিটি চিঠিটা হাতে ধরিয়ে দিলো। হ্যা আমার নামই স্পষ্ট করে লিখা আছে। এর আগে কখনো আমার নামে চিঠি আসেনি, তাই একটা উত্তেজনা কাজ করছিলো। ঘরে ঢুকে তড়িঘড়ি করে রুমে গিয়ে চিঠির খামটা এক টানে ছিঁড়ে ফেললাম। একটা ডিভোর্স লেটার। প্রথমে ভেবেছি ভুল করে এসেছে, পরে ডিটেইল পড়ে হাত পা অবশ হতে শুরু করলো। সোহেলের কাছ থেকে আসা এটা। এক ছাঁদের নিচে থেকেও কখনো বুঝতে পারিনি এতটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সোহেল মনে মনে! গতরাতে ঝগড়া হয়েছে সোহেলের সাথে, তাতে তো আজই ডিভোর্স লেটার আসার কথা নয়, মানে আগে থেকেই পরিকল্পনা করা ছিলো! স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টাটা ব্যর্থ করে বারবার আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কোলে বড় বাচ্চাটা, যার বয়স সাড়ে ৩ বছর। অনেকক্ষণ ধরে বাবা, বাবা করছে। ছোটটার বয়স সাড়ে ৭ মাস। কি করবো আমি, কিভাবে এতবড় ঝড় সামাল দিবো! কাকে বলবো, কি বলবো, এর কি কোনো সমাধান আছে? শাশুড়ীকে ফোন দিতেই ফোনটা কেটে দিলেন। হয়তো শ্বশুর কিছুটা পক্ষে কথা বলবে ভেবে তাঁকেও ফোন দিয়েছিলাম। তিনিও কিছু বলতে পারবেন না বলে রেখে দিলেন। সোহেলের ফোন বন্ধ। দুটো বাচ্চা নিয়ে আমি কোথায় যাবো, বাবার বাড়ি! কিভাবে যাবো! আমার বাবা মা দু'জনকেই রাখতে ভাই হিমশিম খাচ্ছে, আর্থিক সংকট না হলেও, মানসিক সংকট তো আছেই, তার উপর আমি গেলে কিভাবে নেবে তাঁরা! শ্বশুর শাশুড়ীকে সহনশীল মনে হলো না, তবুও সিদ্ধান্ত ফাইনাল, সেখানেই যাবো। আজ পনেরদিন হয়ে গেলো, সোহেলের কোনো খবর নাই। শ্বশুর বাড়ি এসেছি, কিন্তু তারাও মুখে তালা দিয়েই চলছেন। মা'কে জানাতে চাইনি কিন্তু মা বারবার ফোন করে, কি হয়েছে জানতে চাইছেন। কেনো শ্বশুরবাড়ি আছি, ঢাকায় কেনো যাচ্ছি না, চাকরি বা টিউশনি ছেড়ে এতদিন কেনো পড়ে আছি - এতসব জানতে চাওয়ায় বলে দিয়েছিলাম। হু হু করে কেঁদে উঠলেন, তাই ফোনটা রেখে দিয়েছি। আশেপাশে কানাঘুষা চলছে, সোহেল নাকি তার কোনো এক ছাত্রীকে বিয়ে করবে বা করেছে। আমার শরীর জ্বলছে, আলমারি খোলে কাবিননামা বের করে, সোহেলের নামে জিডি করবো, খোরপোশ চাইবো। একথাও বুঝে ফেলেছেন শাশুড়ী, তাই খুব রাগারাগি করে গেলেন, আমি পাত্তা দেইনি। কাবিননামা খোঁজে পাচ্ছি না, নিশ্চয়ই এটাও পরিকল্পিত। খোঁজাখুজি করছি দেখে শাশুড়ী একটা কাগজ এনে ধরলেন সামনে, - এটা খুঁজছো তো, তাই না! - কি এটা? - যা খুঁজে খুঁজে হয়রান হইতেছো, নাও কাবিননামা। আমি ঝটপট নিয়ে কাগজটা খোলে অবাক, কাবিননামায় ১২ হাজার টাকা লেখা, যা ঠিক নয়। এটা বিশ্বাসঘাতকতা! আমাদের বিয়েটা পালিয়ে বিয়ে করা। বাসা থেকে বেকার ছেলে দেখে রাজি হয়নি বাবা। আমরা ঢাকায় চলে আসি বিয়ে করে, আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওর বন্ধুকে দিয়ে কাজী আনা হয়, এবং ৫০ হাজার টাকা কাবিননামায় লেখা হয়। কিন্তু এখানে মাত্র ১২ হাজার টাকা লেখা। এটা কি করে সম্ভব! শাশুড়ী স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তাঁর বাড়ী থেকে চলে যেতে আর ভরনপোষণের আশা যেনো না করি । আমি মুখে কিছু বললাম না, তবে একাই ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে এলাম। বাচ্চা দুটো কাঁদছে, বড় বাচ্চাটা দৌড়ে কাছে আসতেই আলতো ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। বুকে পাথরচাপা দিয়ে মা'য়ের বাড়ি এলাম, কাছাকাছি বাড়ি। মা খুব কাঁদছে। সকাল হতেই বের হলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। বিয়ের পর আমিই আমার এক ছাত্রীর বাবাকে বলে একটা প্রাইভেট কলেজে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম সোহেলকে। সেখানে গিয়ে বিস্তারিত জানালাম। সোহেলের চাকরিটা আগে খেতে হবে, ওকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে সাজা দিবো, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলাম। তিনি আশ্বাস দিলেন, আমি সেই আশ্বাসের উপর বিশ্বাস রেখে গেলাম "ভিকটিম সাপোর্ট কেন্দ্রে।" তাঁরা যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়ে আমাকে একটি মামলা করতে বললেন। আমি আমার বাসার সব দামি জিনিসপত্র সরিয়ে ফেললাম, কারণ ওর কাছেও ডুপ্লিকেট চাবি আছে ঘরের। সিকিউরিটিসহ, বাড়িওয়ালাকে জানালাম তার কৃতকর্মের কথা। তারাও আমাকে আশ্বাস দিলেন, কোনোভাবেই এখানে ঢুকতে দেবেনা তাকে। একটা ফোন এলো... - আপনার স্বামীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। - আলহামদুলিল্লাহ। বিশ্বস্ত একজনকে দিয়ে ওর ছাত্রীর ফোন নম্বর কালেক্ট করেছি, একটা মেসেজ দেয়া উচিত। লিখলাম- "আমি জানি খুব শীঘ্রই তোমাদের আলাদা হতে হবে, কারণ তোমাকে ভরনপোষণ করার মতো ওর কোনো সাধ্য নাই, ওর চাকরি চলে গেছে, আর মনে রেখো, ও আমাকেও এভাবে পাগল হয়ে বিয়ে করেছিলো। ওর সন্তানদের অভিশাপ নিয়ে তুমি কখনো সুখী হবেনা ইনশাআল্লাহ। " রিপ্লাই আসলো, "সন্তান! কে আপনি?" আমি আমাদের একটা অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি পাঠিয়ে দিলাম, সাথে আমাদের বাচ্চা দু'টোর ছবিও। কিছুক্ষণ পর একটা ফোন এলো ভিকটিম সাপোর্ট কেন্দ্র থেকে। - আপনার কাজ হয়ে গেছে আগামীকাল থেকে আমাদের কাজ শুরু, আপনি ভয় পাবেন না, আমরা সাথে আছি। - আলহামদুলিল্লাহ। শ্বশুরবাড়ী থেকে ফোন আসলো, - তুমি ফিরে আসো, তোমাকে আমরা মেনে নিবো, বাচ্চাগুলাকে নিয়া যাও, আর পারছি না। - না মা, আপনাদের নাতী, নাতনী, আর আমার তো ওদেরকে ভরনপোষণের সামর্থ্য নাই, কিভাবে আনবো বলেন! তাছাড়া আমি তো এখানে ওদের বাসায় একা রেখে কিছু করতেও পারবো না, তাই না! ওরা আপনার কাছেই থাকুক, আপনার ছেলেকে বলেন ওদের নিয়ে যেতে! আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফোনটা কেটে দিয়ে চিৎকার করে কাঁদলাম। আমার বুক ভারী হয়ে আছে, অথচ আমার দুধের সন্তান না খেয়ে আছে। তবুও আমাকে ওদের জন্য, ওদের ছেড়ে আরও কিছুদিন থাকতে হবে। ওদের অধিকার আদায় করে তারপর আমি ওদের নিয়ে আসবো। আমার বুকের ভেতরে গুঁজে রাখবো....💔 জীবনে হেরে যাওয়ার আগে হারতে নেই.....🥺

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...