Skip to main content

চট্টগ্রামের রাউজানে

 


চট্টগ্রামের রাউজানে বাজারের একটি হোটেলে বসলাম। লক্ষ্য ছিলো সিংগাড়া খাবো। লোভে পড়ে খাই।

আমি সব সময় হোটেল-রেস্টুরেন্টের এক কোণায় গিয়ে বসি। একটু লুকিয়ে থাকার ইচ্ছে আরকি। আমি অবশ্যই অন্তর্মুখী মানুষ। গতকাল কোণার টেবিল ফাঁকা না থাকায় ম্যানাজারের খুব কাছের একটি টেবিলে বসলাম। তার সব কথা শুনতে পাচ্ছিলাম। একজন বয়োঃবৃদ্ধা ভিক্ষুক এলেন। কাতর কন্ঠে বললেন, "বাবা, খুব ক্ষুধা লেগেছে। কিছু খেতে দিতে পারো?" ম্যানেজার একটা টেবিল দেখিয়ে বললেন, "ঐ জায়গায় গিয়ে বসেন খালা।" তারপর চিৎকার দিয়ে বললেন, "খালাকে এক প্লেট খিচুড়ি দে।" আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। ছোট্ট হোটেল। তেমন বেচাকেনা হয় বলেও মনে হলো না। দুই তিন মিনিটের মধ্যেই আরো একজন বৃদ্ধা ভিক্ষুক ভিক্ষা নিতে এলেন। ম্যানেজার বললেন, "খাওয়া দাওয়া হয়েছে খালা?" খালাকে নিশ্চুপ দেখে আগের খালার পাশের চেয়ারে বসালেন এবং তাকেও এক প্লেট খিচুড়ি দেওয়া হলো। দুই জন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত বয়োঃবৃদ্ধাকে খেতে দেখে কী যে ভালো লাগছিলো! এরপর আরো একজন বয়োঃবৃদ্ধা ভিক্ষুক এলেন। ম্যানাজারের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, "বাবা, ভিক্ষা করতে এসেছিলাম। তেমন ভিক্ষা পাইনি আজ। বাড়ি যাওয়ার ভাড়া নেই। ভাড়াটা দিতে পারো।" ম্যানাজার বললো, "আমার তেমন বিক্রি হয়নি খালা। আপনি বরং একটু খেয়ে যান। দেখেন কেউ ভাড়াটা দিতে পারে কিনা।" এতোক্ষণ যে বয়টি খাবার পরিবেশন করছিলো সে বললো, "খালা কয় টাকা ভাড়া লাগে বাড়ি যেতে?" -১৫ টাকা বাবা। হোটেল বয়টি পকেট থেকে ২০ টাকার একটা নোট বের করে খালার হাতে দিয়ে বললেন, "নেন, এটা রাখেন। একটু খিচুড়ি খেয়ে বাড়ি যান। আমি খিচুড়ি দিচ্ছি।" হোটেল ম্যানাজার হাসতে হাসতে বললেন, "শালা যেমন ম্যানাজার, তেমন তার কর্মচারীরা! কেউ মানুষকে ফিরাতে জানে না।" তারপর বললেন, "শোন, কোন ভিক্ষুক যেন খেতে এসে না ফিরে যায়। সবাইকে খাওয়াবি।" আমি সব দেখছিলাম। মাথা নিচু করে বসে আছি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। মনের ভেতর তোলপাড় চলছে। ম্যানাজারকে এক সময় কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বললাম, "ভাই, আপনার ঐ কর্মচারী ছেলেটি সম্পর্কে আমাকে একটু বলুন তো প্লিজ। কয় টাকা বেতন দেন ওকে।" - ব্যবসা তো তেমন চলে না ভাই। সারাদিন হোটেল খোলা। রাত নয়টা পর্যন্ত। ওকে ১২০ টাকা দিই। - বাড়িতে কে কে আছে ওর? - কেউ নেই তেমন। মা মারা গেছে। বাবা আরেকটি বিয়ে করেছে। ওর নানা-নানি বয়স্ক হয়ে গেছে। কোন কাজ করতে পারে না। এই ছেলেটি কাজ করে নানা-নানিকে খাওয়ায়। আমার কাছে এবার অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে গেল। সারাজীবন ভালোবাসা, মায়া, স্নেহ বঞ্চিত বলেই, এই ছেলেটার হৃদয় ভালোবাসা আর মায়ায় পরিপূর্ণ। ছোট্ট ছেলেটিকে কাছে ডাকলাম। বললাম, "লেখাপড়া করেছো?" - না স্যার। - ঢাকার দিকে কোন কাজ ম্যানেজ করে দিলে যাবা? একটু বেশি বেতনের? - নানা-নানি চলতে পারে না। তাদের গোসল করার পানি তুলে দিতে হয়। টয়লেটের, অযুর। খাওয়ার রান্না করতে হয়। আমি এদের রেখে যেতে পারবো না স্যার। আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফিরে এসেছি। মনটা কেমন ভার হয়ে আছে। ছেলেটা সারাদিন কাজ করে একশত কুড়ি টাকা পায়। তিন জন মানুষের সংসার। কীভাবে চলে! এর থেকে সে আবার অসহায়দের দান করে! মন খারাপ হলে আমি আল-কুরআন খুলে বসি। আজও কুরআনুল কারীম খুলতেই সূরা আল-বাকারার একটি আয়াতে চোখ আটকে গেল। "এরা নিজেদের রিজিক থেকে অসহায়দের দান করে.. " আমি আয়াতটির তাফসীর পড়া শুরু করলাম। সেখানে লেখা, "মানুষের এমন পরিমাণ দান করা উচিত, যাতে তার নিজের খাবারে টান পড়ে।" মনের মধ্যে তোলপাড় হচ্ছে। নিজের খাবারে টান পড়া মানে, গোশত খেতাম, দান করার কারণে এখন মাছ খেতে হচ্ছে। দুই প্লেট ভাত খেতাম এখন এক প্লেট খেতে হচ্ছে। কী অদ্ভুতভাবে আয়াতটি আমার কাছে খুলে যাচ্ছে! তাবুক যুদ্ধের সময় আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ(সাঃ) বললেন, "আজ কে বেশি দান করতে পারো দেখি?" উসমান (রাঃ) একশত উট দিয়েছিলেন। উমর (রাঃ) তার সম্পদের অর্ধেক দিয়েছিলেন। আবু বকর (রাঃ) দিয়েছিলেন এক মুষ্টি খেজুর বা একটু যব জাতীয় কিছু আর তার বাড়িতে ঐটুকু সম্পদই ছিলো। রাসূল (সাঃ) যা বলেছিলেন তার সারমর্ম হলো, আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) দানে প্রথম হয়েছে। সে তার সম্পদের শতভাগ দিয়েছে। আমার চোখে ইসলামের ইতিহাসের সেই সোনালী দিন, আজকের ঐ হোটেল কর্মচারী আর আল-কুরআনের আয়াত "তারা রিজিক থেকে অসহায়দের দান করে" এই বিষয়গুলো এক অসহ্য ভালোলাগার এবং পরিতাপের বিষয় হয়ে উঠলো। কী করতে পারলাম জীবনে ভাবতে গিয়ে চোখ থেকে টপ টপ করে কয়েক ফোঁটা পানি পড়লো আল-কুরআনের পাতায়। আমি তাড়াতাড়ি কুরআনুল কারীম বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আরশে আজীম থেকে আল্লাহ তায়ালাও নিশ্চয় আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কোন কিছুই তো তার দৃষ্টির আড়ালে নয়।❣️❣️
collected

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...