Skip to main content

সাঁওতাল মেয়ে নীলমণি কিসকু

 


সাঁওতাল মেয়ে নীলমণি কিসকু। পড়েন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে, অর্থনীতি বিভাগে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। এসেই ছোটবেলার মতো মা-বাবার সঙ্গে মাঠে নেমে পড়েছেন। শুধু নিজের জমিতেই নয়, এভাবে অন্যের জমিতেও কাজ করেন নীলমণি। যা আয় হয় তা নিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়ান। নীলমণির সঙ্গে দেখা করে এসেছেন আনোয়ার হোসেন

সাঁওতাল মেয়েদের রক্তে মিশে আছে ধান বোনা, ধান কাটা, নিড়ানোসহ নানা কৃষিকাজ। পরিবারের অভাব-অনটন মেটাতে শিশুকালেই এসব কাজ শিখে নেন তাঁরা। নীলমণি কিসকুও রপ্ত করেছেন ছোটবেলায়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও ছোটবেলার সেসব কাজ আজও ছাড়েননি। ধান বোনা ও কাটার মৌসুমের সময় বাড়িতে থাকলে পরের জমিতে এসব কাজ করে আয় করেন তিনি। পরিবারের অভাব–অনটনে, নিজের লেখাপড়া ও হাতখরচে লাগে তাঁর আয় করা টাকা। সাঁওতাল মেয়ে নীলমণি কিসকু। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্রী। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসেছেন। ৭ মে মা-বাবার সঙ্গে বোরো ধান কাটার সময় তাঁর সঙ্গে কথা হয়। নীলমণিদের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জুগিডাইং গ্রামে। নীলমণি কিসকুর পরিবারের ১৩ কাঠা জমি। সে জমিতে এবার ধান চাষ করেছিলেন নীলমণির বাবা তালা কিসকু। এখন ধান পেকেছে। মা-বাবার সঙ্গে জমির ধান কাটছিলেন নীলমণি। এই ধান দিয়ে তাঁদের সারা বছরের খোরাকি চলে না। অন্যের জমিতে খেতমজুরি করেই চলে তাঁদের সংসার। নীলমণি বলছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি বলে মাঠের কাজ করব না, সাঁওতাল মেয়ের এসব অহমিকা মানায় না। জীবনের প্রয়োজনেই আমাদের এসব করতে হয়। কষ্ট করেই লেখাপড়া করতে হয়।’ নীলমণির গল্প ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন নীলমণি। সেবারও জুগিডাইং গ্রামে তাঁর সন্ধানে গিয়ে তাঁকে ধান খেতেই পাওয়া গিয়েছিল। তাঁর ধান বোনার ছবিসহ প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ছিল, ‘নীলমণি কিসকুর এখন কী হবে?’ ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অভাব-অনটনের কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেছেন নীলমণি। একটা চাকরি জোটানোর আশায় ভর্তি হয়েছেন কম্পিউটার শিক্ষার ছয় মাস মেয়াদি কোর্সে। প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর নীলমণির স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসেন অনেকে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান নীলমণি। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নপূরণের গল্পও ছাপা হয় প্রথম আলোর পাতায়। সে খবর পড়ে তাঁর পড়াশোনার সহায়তায় এগিয়ে আসেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। নীলমণি কিসকু বলছিলেন, ‘প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার সুবাদে আমার যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ হয়, তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয় নওগাঁর নিয়ামতপুরের মেয়ে ঝিরিনা মুন্ডা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের সাঁওতাল মেয়ে ছায়া টুডুর। আমাদের মতো মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রথম আলোকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’ বাবার গর্ব মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, এ নিয়ে তালা কিসকুর আনন্দের শেষ নেই। তিনি জানান, নীলমণি কিসকু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লেও বাড়িতে থাকার সময় সব কাজই করেন। ধান রোয়া ও কাটার কাজ করেন। নীলমণি স্কুলে পড়ার সময় ভালো ফুটবলও খেলতেন। তালা কিসকুর আরও এক মেয়ে সুরধ্বনি কিসকুও ভালো ফুটবলার। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) তিনি উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বিকেএসপির হয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের প্রতিযোগিতায় দেশ-বিদেশে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। অভাব–অনটনের সংসারেও এই দুই মেয়ের অর্জন নিয়ে তালা কিসকুর অনেক গর্ব। গ্রামের লোকজন ও আত্মীয়স্বজনও তাঁর দুই মেয়ের অনেক সুনাম করে। তাঁকে সম্মান করে। দুই মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন তিনি। নীলমণি একদিন অনেক বড় হবেন। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবেন। নিজের সম্প্রদায়ের জন্যও কাজ করবেন।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...