Skip to main content

সাহাবী আবূ হুরাইরাহ রাযি.

 (সাহাবি- তাবেয়িরা) শুধু দেখেছে দ্বীনদারিতা!


সুপাত্রে কন্যাদানের এক অনুপম দৃষ্টান্ত!! সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. একজন সুপ্রসিদ্ধ তাবিয়ী। ইলম, আমল, তাকওয়া—সব বিষয়ে ছিলেন অনন্য। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তিনি ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী আবূ হুরাইরাহ রাযি. এর জামাতা। তাবিয়ী সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. এর এক কন্যা ছিলো। রূপ, গুণ, নম্রতা ভদ্রতা, উত্তম চরিত্রসহ যাবতীয় উত্তম বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তার এসব বৈশিষ্ট্যের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের কানে এ সংবাদ পৌঁছে যায়। খলীফা তাকে পুত্রবধূ করার ইচ্ছা করলেন। এ লক্ষ্যে তিনি সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. এর নিকট দূত মারফত প্রস্তাব পাঠালেন। দূত সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. এর সামনে প্রস্তাব পেশ করা মাত্রই তিনি অস্বীকার করে বসলেন। দূত অস্বীকারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আমি তার চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নই। দূত প্রথমে তাঁকে ফুসলাতে লাগলেন। বললেন, আপনি কার প্রস্তাব নাকচ করছেন, একটু চিন্তা করুন। তিনি হচ্ছেন আমীরুল মুমিনীন। তাঁর সুনাম সুখ্যাতি জগৎস্বীকৃত। অর্থ সম্পদের তো কোনো শেষ নেই। সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. জবাবে বললেন, আপনি কি জানেন এ দুনিয়ার মূল্য আল্লাহর কাছে মাছির এক ডানার থেকেও কম? তাহলে খলীফার অর্থ সম্পদ মাছির ডানার থেকে কতশতহাজার তুচ্ছ। এ উপায়ে কাজ হলো না দেখে দূত এবার ভয় দেখিয়ে বললেন, আপনি বিয়েতে রাজি না-হলে খলীফা আপনার বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নিতে পারেন। সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. এবার তার জবাবে বললেন, আল্লাহ মুমিন বান্দাদের হেফাযত করবেন। এরপর তিনি মাসজিদে নববীতে দারস দেওয়া শুরু করলেন। আবূ ওয়াদা'আহ নামে তাঁর একজন ছাত্র ছিলো। সে-ছাত্র ছিলেন খুবই দ্বীনদার পরহেযগার। তিনি গত তিনদিন ক্লাসে উপস্থিত হননি। তাকে ক্লাসে দেখামাত্র সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার গত তিনদিন ক্লাসে উপস্থিত হওনি কেনো? তিনি বললেন, আমার পরিবারের একজন মারা গেছেন। তাই উপস্থিত হতে পারিনি। সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. বললেন, আমাদের খবর দাওনি কেন? আমরা জানাযায় অংশগ্রহণ করতাম। আবূ ওয়াদা'আহ বলেন, আমি উঠতে যাবো এমন সময় তিনি বললেন, পাত্রী খোঁজাখুঁজি করছো না কি? —আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! আমার মতো গরীবের সাথে কে মেয়ে বিয়ে দিবে? আমার সম্পদ বলতে রয়েছে দুই বা তিন দিরহাম। —আমি মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি। তুমি কি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাও? — হ্যাঁ, আমি রাজি। সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব রাহি. আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং দরুদ পাঠ করলেন। তারপর দু'দিরহাম মাহরে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন। আবূ ওয়াদা'আহ বলেন, আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। আমি এতোটাই আনন্দিত ও খুশি হলাম যে, কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে আমি বাসা ফিরে গেলাম। বাসা ফিরে গিয়ে ভাবতে লাগলাম কার থেকে কিছু করয নেওয়া যায়? মাগরিবের সালাতের আযান হয়ে গেলো। আমি সালাত আদায় করার জন্য মাসজিদ গেলাম। আমি সে-দিন সিয়ামাবস্থায় ছিলাম। তাই সালাত থেকে ফিরে এসে খেতে বসলাম। খাবার ছিলো রুটি ও যায়তুল তেল। এমন সময় কে যেন দরজায় কড়া নাড়লো। বললাম, কে? আগন্তুক লোকটি বলল, সাঈদ। সাঈদ নামে যত ব্যক্তিকে আমি চিনতাম সবার কথা ভাবলাম, কোন সাঈদ হতে পারে? কিন্ত সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব এর কথা মনে হলো না। এর কারণও আছে। আমি চল্লিশবছর ধরে তাঁকে মাসজিদ ও বাড়ির রাস্তার বাইরে দেখিনি। দরজা খুলে দেখলাম সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাঁকে দেখামাত্র ভাবলাম, তিনি হয়তো তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলেছেন। আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ করে ফেলবেন। বললাম, আপনি কষ্ট করে কেন আসলেন? আমাকে ডেকে পাঠালেই ভালো হতো। তিনি বললেন, কী বলো এসব? তোমার কাছে আসা আমারই দায়িত্ব। তুমি অবিবাহিত যুবক। আজকে বিয়ে করলে। প্রথম রাতই স্ত্রী ছাড়া কাটাবে, এটা হয় না। তোমার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে এসেছি। দেখলাম, আমার স্ত্রী পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাঁর কন্যার হাত ধরে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে চলে গেলেন। আমার স্ত্রী লজ্জায় আঁটোসাঁটো হয়ে গুটিয়ে গেছে। আমি তাকে ওঠালাম এবং তার সামনে রুটি ও যায়তুন তেলের খাবারের বাটিটা আগিয়ে দিলাম। এরপর আমি ছাদে উঠে চিৎকার করে পাড়াপ্রতিবেশিদের ডাকতে লাগলাম। তারা এসে বলল, কী ব্যাপার এভাবে চিৎকার করে ডাকছো কেন? বললাম, সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব আজ আমার সাথে তাঁর কন্যার বিয়ে দিয়েছেন। তারপর এইমাত্রই আমার অজান্তেই স্বয়ং তিনি এসে তাঁর মেয়েকে রেখে গেলেন। আমার মাও এ খবর শুনতে পেলেন। আমার মা এসে বললেন, তিনদিন পর্যন্ত তাকে স্পর্শ করা তোমার জন্য হারাম। তিনদিন তোমার জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করে নিক। তারপর স্পর্শ করবে। আমি তিনদিন পর তার কাছে গেলাম। দেখলাম, তিনি বিশ্বসুন্দরী। তার থেকে আর সুন্দরী হতে হয় না। তিনি ছিলেন সকলের সেরা কুরআনের হাফিযা। সুন্নাতের ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞানী। স্বামীর অধিকারের ব্যাপারে সর্বাধিক সচেতন। এভাবে প্রায় একমাস কেটে গেলো। সাঈদ ইবনু মুসাইয়িব আমাদের বাড়ি আসেন না। আর আমিও তাঁর দারসে যোগদান করি না। কাছাকাছি একমাস হয়ে গেলে আমি দারসে যোগদান করলাম। দারসে গিয়ে তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিলেন; কিন্তু কোনো কথা বললেন না। দারস শেষ হয়ে গেলো। আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সবাই চলে গেছে। তিনি আমাকে বললেন, সে-ই লোকটির খবর কী? কেমন আছে? বললাম, আলহামদুলিল্লাহ। প্রিয় মানুষ যেমনটি আমার ব্যাপারে চায় আর শত্রুরা যেমনটি চায় না—তেমনটি আছি। আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিবো, এমন সময় তিনি আমার হাতে বিশহাজার দিরহাম তুলে দিলেন।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...