Skip to main content

আমাদের প্রিয় সম্পর্ক ভাঙ্গার কারণ


আমরা মানুষ হিসেবে একা চলতে পারি না। কিছু মূল্যবান সম্পর্ক আমরা জন্ম থেকে নিয়ে বেড়ে উঠি, আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয় চলার পথে। আমরা সবাই চাই, আমাদের জীবনের এই সম্পর্কগুলো চিরস্থায়ী হোক, অটুট থাকুক। যে কোনো সম্পর্ক সুন্দর থাকার জন্য, নিঃসন্দেহে সম্পর্কে উপস্থিত উভয়ের অবদান প্রয়োজন। কিন্তু, আমাদের প্রিয় সম্পর্ক ভাঙ্গার কারণও কি আমাদের নিজেদের আচরণ হতে পারে?

দেখা যায়, সবসময় ভালবাসা থাকলেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। সম্পর্কের মানুষগুলোর কিছু অভ্যাস, তাদের মানসিক অবক্ষয় ঘটায় - ১. অতিরিক্ত দখলদারি দেখানোঃ সবকিছুতে অতিরিক্ত দখলদারি দেখালে, সন্দেহপ্রবণতা থাকলে, সম্পর্ক গোড়া থেকে নষ্ট হয়ে যায়। একজন মানুষকে শক্ত করে বেঁধে রাখতে চাইলে, স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে সম্পর্ক থেকে তার মন উঠে যেতে থাকে, এবং সে মিথ্যা বলতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে সম্পর্কে যেরকম একটি আর্থিক বন্ধন থাকা জরুরি, তেমনি প্রতিটি মানুষের নিজস্বতাও জরুরি। ২. ব্যক্তিগত সময় না দেয়াঃ প্রত্যেকটি মানুষের কিছু পার্সোনাল স্পেস বা ব্যক্তিগত স্থান ও সময় প্রয়োজন হয়; তা সে আপনার যত আপন মানুষ হোক না কেন! সম্পর্কের অর্ধেক পার্টনার হিসেবে আপনি যদি একজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ সময়টুকু দাবি করেন, জোর দেন যে তার পৃথিবী আপনাকে কেন্দ্র করে ঘুরবে, তাহলে সেটা নিতান্তই বোকামি এবং নিঃসন্দেহে সামনের ব্যক্তির উপর অত্যাচার! তাই নিজের অত্যন্ত কাছের মানুষগুলোকে অবশ্যই দিনের কিছুটা সময় হলেও, তার নিজের সাথে কাটাতে দিন। পার্সোনাল স্পেস মানসিক সুস্থতার জন্য, এবং পরোক্ষভাবে সম্পর্কের উন্নতির জন্য জরুরি। ৩. অপরের বন্ধু, পরিবারের সাথে সময় কাটাতে না দেয়াঃ আপনি যদি আশা করেন, (মূলত দাম্পত্য সম্পর্কে, স্বামী বা স্ত্রী যদি মনে করেন) যে আপনার লাইফ পার্টনারের সময়ের উপর শুধু আপনার অধিকার, তার নিজের বন্ধুদের সাথে বা পরিবারের সাথে সম্পর্ক থাকতে পারবেনা, বা সম্পর্ক থাকলেও সে তাদের সাথে সময় অতিবাহিত করতে পারবে না, তবে আপনাদের সম্পর্ক মধুর হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ! মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক খুবই জরুরী। আর একজন মানুষ মানসিকভাবে সুস্থ না থাকলে, কখনোই ভালো সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবেন না। ৪. অতিরিক্ত কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণঃ সম্পর্কে দুজন মানুষের সমান গুরুত্ব থাকে। একে অপরের মতামতের, সিদ্ধান্তের এবং মতাদর্শের সম্মান করাটা খুবই জরুরী। কিন্তু একজন যদি মনে করে, সম্পূর্ণ সম্পর্কের প্রতিটি সিদ্ধান্তই তার মত অনুযায়ী হবে এবং পার্টনারের জীবনের সম্পূর্ণটুকু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, সেই ক্ষেত্রে অপরজন সঠিক মতামত প্রকাশ করতে পারেন না। একজনের অতিরিক্ত কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণ সম্পর্কের ফাটলের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ৫. অসম্মানসূচক বাক্য ব্যবহারঃ যে কোন সম্পর্কে কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া স্বাভাবিক। কিন্তু ঝগড়ার সময় একজন যদি অনবরত আরেকজনকে অসম্মান করে কথা বলেন, গালিগালাজ করেন এবং এমন সব শব্দ ব্যবহার করেন, যা সামনের ব্যক্তিকে আঘাত করে, তবে তা সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করে। হয়তবা মনোমালিন্যের কারণ খুব শিগগিরই দূর হয়ে যায়, কিন্তু মুখ থেকে নিঃসৃত সেই কথাগুলো সামনের ব্যক্তিটির মনে এমন দাগ কেটে যায়, যা হয়তোবা খুব শিগগিরই দূর হয়না! ৬. তার বা নিজের ক্ষতি করার হুমকি দেয়াঃ ব্ল্যাকমেইল করে তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য হাসিল হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সময়ে সম্পর্কের উন্নতি সাধন সম্ভব নয়। তাই নিজের মত মত কোন কিছু না ঘটলে, অথবা কিছু চেয়ে না পেলে, নিজের বা অন্যের ক্ষতি করার হুমকি দেয়া, আর নিজের হাতে সম্পর্ককে হত্যা করা একই কথা! সম্পর্কে উপস্থিত দুইজনের মাঝে যে কারো এই অভ্যাস থাকলে, সেই সম্পর্কের পরিণতি সুখের হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম! ৭. অনবরত দোষ চাপানো বা অপমান করাঃ সুন্দর সম্পর্কে উপস্থিত প্রতিটি মানুষই জীবনের সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে যায়। কিন্তু ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে, সম্পর্কের একজন ব্যক্তি অপরজনকে অনবরত কিছু না কিছু নিয়ে দোষারোপ করেই চলছে, ছোট করছে, পিছনে টেনে রাখতে চাচ্ছে, তাদের সেই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা মানে আত্মসম্মানের অবক্ষয়! ৮. অবাস্তব চাহিদা দেখানোঃ কোন মানুষই পারফেক্ট নয়, জীবনে কখনোই সবকিছু আপনার মন মতো হবে না। সম্পর্কে যদি আপনি পার্টনার থেকে সবকিছু নিঁখুত আশা করেন, অথবা তার থেকে এমন কিছুর আকাঙ্ক্ষা করেন, যা তার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে আপনার অবাস্তব চাহিদা আপনাদের বাস্তব জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ৯. অনবরত তুলনা করাঃ তুলনা এমন একটি জিনিস, যা যেকোন সুন্দর সম্পর্ককে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। পৃথিবীতে কেউ কারো মতো নয় এবং প্রত্যেকের দোষ-গুণ উভয়ই আছে। কিন্তু অন্যের গুণের সাথে আরেকজনের তুলনা করলে, কখনো জীবনে সুখে থাকা যায় না। ১০. অন্যের অস্তিত্বকে গুরুত্ব না দেয়াঃ সম্পর্ককে বা সম্পর্কে উপস্থিত মানুষটাকে 'ফর গ্র‍্যান্টেড' নেয়া এবং সম্পর্কের জন্য কিছু করার প্রয়াস না থাকা, সম্পর্ককে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। "সে আছে, এবং সে থাকবেই" - এরকম মানসিকতা আমাদের সম্পর্কের জন্য কাজ করতে পিছিয়ে দেয়। কিন্তু আসলে প্রতিটি সম্পর্কই ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই সুন্দর থাকে। অনেক সময় যেই সম্পর্ক আমাদের মানসিক ক্ষতির কারণ, সেই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা দোষের নয়! নিজেদের মাঝেও এই অভ্যাসগুলো থাকলে, তা দ্রুত পরিত্যাগ করে, আমরা আমাদের সম্পর্কগুলো ভাল রাখতে পারি।
source-lifespring limited

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...