Skip to main content

সন্তান প্রতিপালনে ধর্মের দাবি

 সত্যিকারের সফলতা বলতে কী বোঝায়? বৈষয়িক সম্পদ, প্রাচুর্য, নাকি দৃঢ় ইমান ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক? আবু হোরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা, যাঁরা তোমাদের চেয়ে ওপরে আছেন, তাঁদের দিকে তাকিয়ো না; বরং যাঁরা তোমাদের চেয়ে নিচে আছেন, তাঁদের দিকে তাকাও। কারণ, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি প্রদত্ত নেয়ামতকে তুচ্ছ মনে করা থেকে তোমাদের বিরত রাখবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬,৪৯০; মুসলিম, হাদিস: ২,৯৬৯)

এই হাদিস আমাদের শেখায় কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির মাধ্যমে জীবন যাপন করতে। কিন্তু আমরা কি আমাদের সন্তানদের এই দৃষ্টিভঙ্গি শেখাচ্ছি? নাকি আমরা তাদের শিখিয়ে দিচ্ছি যে দুনিয়ার সাফল্য উচ্চ গ্রেড, সম্পদ, ক্যারিয়ার—ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

এক রিকশাচালকের গল্প

ফেসবুকে একটি গল্প ভাইরাল হয়েছিল, যেখানে এক রিকশাচালক তাঁর জীবনের কথা বর্ণনা করেছেন। বৈষয়িক দৃষ্টিকোণে তাঁর জীবন সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণে এটি একজন মায়ের অসাধারণ সাফল্যের গল্প, যিনি তাঁর সন্তানের মধ্যে দৃঢ় ইমান গড়ে তুলেছেন। গল্পটি এমন—

‘ছোটবেলায় আমার মা প্রায়ই আমাকে প্রতিবেশীদের কাছে নুন, লঙ্কা বা পেঁয়াজ ধার চাইতে পাঠাতেন। আমাদের মতোই গরিব প্রতিবেশীরা অসন্তুষ্ট মনে আমাদের দিতেন, জানতেন আমরা তা ফেরত দিতে পারব না। ধার ছাড়া আমাদের রান্না করা প্রায় অসম্ভব ছিল। তবুও আমরা একটি কাজ কখনো বন্ধ করিনি—নামাজ।

‘আমার বাবা ছোটবেলায় মারা যান। মা ও বোনদের সাহায্য করতে আমি ৯ বছর বয়সে কাজ শুরু করি, দিনে ১৫ টাকা আয় করে। আমি তাড়াতাড়ি বড় হতে চাইতাম, বেশি উপার্জন করে পরিবারকে সাহায্য করতে। কিন্তু আমি কখনো সকালের নামাজ বন্ধ করিনি। এখন রিকশা চালিয়ে আমি আমার বোনদের স্কুলে পড়ার খরচ পাঠাই, যা আমি কখনো করতে পারিনি।‘আমার মা এখন বৃদ্ধ ও অসুস্থ। আমি দিনভর রিকশা চালিয়ে তাঁকে প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাই, যাতে তিনি ওষুধ ও খাবার কিনতে পারেন। কাজের মধ্যেও আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় বের করি। প্রতিবার রুকু–সিজদায় আমি মায়ের জন্য দোয়া করি। তিনি আমার জীবনের সবকিছু, আমার মাথার ওপর ছাতার মতো। তাঁর ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া আমি কিছুই নই।

‘আমি দোয়া করি মায়ের স্বাস্থ্য ভালো হোক, তিনি আমার আগে মারা না যান। সম্প্রতি আমি তাঁকে একটি সবুজ শাড়ি কিনে দিয়েছি, কারণ তিনি সবুজ শাড়ি পছন্দ করেন। তাঁকে এত খুশি দেখে আমার হৃদয় ভরে যায়। আমি প্রতিদিন কাজ করব এবং মায়ের জন্য দোয়া করব।’

এই যুবক বৈষয়িক সাফল্য অর্জন করেননি, কিন্তু তিনি সেখানে সফল হয়েছেন যেখানে অনেক অভিভাবক ব্যর্থ হন। তাঁর মা তাঁকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও নামাজের প্রতি অটলতা শিখিয়েছেন।

অভিভাবকদের অগ্রাধিকার

এই গল্প আমাদের প্রশ্ন করে, আমরা আমাদের সন্তানদের কী শেখাচ্ছি? আমাদের লক্ষ্য কি তাদের ধর্মীয় দায়িত্ববোধের প্রতি ভালোবাসা জাগানো, নাকি শিক্ষা ও ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দেওয়া? আমরা অনেকে প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে শুরু করি, কিন্তু সন্তানেরা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অগ্রাধিকার বদলে যায়। পড়াশোনা, অন্যান্য চর্চা ও সামাজিক চাপ ধর্মীয় শিক্ষাকে পেছনে ঠেলে দেয়।

ছোটবেলায় সবকিছু ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুলে গিয়ে সন্তানেরা গেম, মিডিয়া ও বন্ধুদের প্রভাবে বদলে যায়। হাইস্কুলে পড়ার চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও ক্যারিয়ারের দৌড় শুরু হয়। অজান্তেই আমরা দুনিয়ার ইঁদুর দৌড়ে জড়িয়ে পড়ি। আমরা অবিশ্বাসীদের মতো অভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবন দেখতে শুরু করি। ফলে আমরা জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে সরে যাই।

পরীক্ষায় ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা

জীবন পরীক্ষার ময়দান। ওই মায়ের জীবন ছিল দারিদ্র্যের কঠিন পরীক্ষা। তাঁর বাড়িতে কখনো কখনো নুনের ছিটার অভাব হতো। তিনি সন্তানদের ভিক্ষা করতে পাঠাতে পারতেন বা অনৈতিক পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি লড়াই করেছেন। তিনি ধৈর্য ধরেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সন্তানদের মধ্যে ইমানের বীজ বপন করা। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কখনো অস্পষ্ট হয়নি।

অনেকে প্রাচুর্যের পরীক্ষায় পড়েন। আমাদের ফ্রিজে সপ্তাহভর খাবার, প্যান্ট্রিতে মাসভর চাল–ডাল থাকে। কিন্তু আমরা যখন অভাবের মানসিকতায় জীবন দেখি, তখন দৃষ্টিভঙ্গি ঝাপসা হয়ে যায়। আমরা দামি জিনিস, উচ্চ পদ বা সামাজিক মর্যাদার পেছনে ছুটি; ওদিকে পরকালের ক্ষতি হয়ে যায়। ফলে আমাদের সন্তানদের জন্য ইসলাম কেবল একটি সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়ায়—জীবনযাপনের একমাত্র পথ নয়।

কৃতজ্ঞতার শক্তি

প্রথমে বর্ণিত হাদিস আমাদের কৃতজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির শিক্ষা দেয়। আমাদের শিখতে হবে যে আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা কর্তব্য। এই গল্প আমাদের সন্তানদের কৃতজ্ঞতার পাঠ শেখানোর সুযোগ দেয়। যখন তারা বাজারের ব্যাগ আনবে, তাদের স্মরণ করিয়ে দিন, তারা যেন খাবার, বাড়ি ও পরিবারের জন্য কৃতজ্ঞ থাকে। নিয়মিত দোয়া করুন, ছোটবেলা থেকে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের অভ্যাস গড়ে তুলুন, যাতে তারা বড় হয়ে সততায় অটল থাকে।

অভিভাবকদের দায়িত্ব

আমাদের জীবনের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে হবে। আমরা কোথায় যাচ্ছি, এই দুনিয়ায় কী চাই, তা পরিষ্কার হওয়া উচিত। এই মূল্যবোধ আমাদের সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে হবে, যাতে ধর্ম তাদের জীবনে কখনো দুর্বল না হয়। অভিভাবক হিসেবে এই দায়িত্ব আমাদের। প্রতিদিন একটি নতুন সুযোগ—পথভ্রষ্ট হলে সংশোধনের, আল্লাহর কাছে পথনির্দেশনা চাওয়ার।

সূত্র: মুসলিম ম্যাটার্স


Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...