Skip to main content

তুষারশুভ্র মস্কোয় সংহতির ইফতার

 আকাশ থেকে ঝরছে তুলার মতো সাদা তুষার। কনকনে হিমেল হাওয়া আর হিমাঙ্কের নিচে থাকা তাপমাত্রায় যখন পুরো মস্কো শহর স্থবির হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই রাশিয়ার মুসলিম হৃদয়ে বইছে উষ্ণ প্রশান্তি। এই প্রশান্তির নাম রমজান।

বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়ায় রমজান মানেই প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব লড়াই। যেখানে তুষারপাতের শুভ্রতা আর ইফতারের আগ মুহূর্তের নীরবতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

ইতিহাসের শেকড় যেখানে

অনেক পশ্চিমা দেশের মতো এখানে মুসলিমরা কেবল অভিবাসী নন, বরং তারা এখানকারই সন্তান। প্রায় এক হাজার বছর আগে, ৯২২ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীন ভলগা বুলগেরিয়া অঞ্চলে ইসলাম রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত হয়েছে। এমনকি রাশিয়ার বর্তমান প্রধান ধর্ম অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্মের প্রসারেরও ৬৬ বছর আগে এই অঞ্চলে ইসলামের আলো পৌঁছেছে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়েভ রাজকুমার ভ্লাদিমির যখন নিজের রাজ্যের জন্য একটি ঐশ্বরিক ধর্মের সন্ধান করছিলেন, তখন তিনি মুসলিম প্রতিনিধিদের কাছ থেকে ইসলামের সুশৃঙ্খল জীবনবিধান দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। যদিও ব্যক্তিগত কিছু কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত খ্রিষ্টধর্ম বেছে নেন।

রাশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ অর্থাৎ ২৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিজেদের মুসলিম পরিচয় দেন। রাশিয়ার মুফতি কাউন্সিলের প্রধান রাভিল আইনুদ্দিনের মতে, ২০৫০ সাল নাগাদ রাশিয়ার প্রতি তিনজনের একজন হবেন মুসলিম।

‘সুলতান আল-শুহুর’

রাশিয়ান মুসলিমদের কাছে রমজান হলো ‘সুলতান আল-শুহুর’ বা মাসগুলোর রাজা। মস্কোতে বর্তমানে মাত্র চারটি বড় মসজিদ রয়েছে, যা ক্রমবর্ধমান বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার তুলনায় বেশ কম। ফলে জুমা বা তারাবির নামাজে হাজার হাজার মানুষ মসজিদের বাইরে তুষারের ওপর কার্পেট বিছিয়েনামাজ পড়েন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রুশ মুসলিমদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন অনেক বেশি ধর্মপ্রাণ। তারা কেবল ঐতিহ্য পালনের জন্য নয়, বরং ইসলামের মূল দর্শন বুঝতে উন্মুখ।

বৈচিত্র্যময় ইফতার সংস্কৃতি

রাশিয়ার ইফতার টেবিল বা দস্তরখান হলো এক বিশাল বৈচিত্র্যের প্রদর্শনী। ককেশাস পাহাড়ের মানুষ, তাতারস্তানের তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম এবং মধ্য এশিয়ার উজবেক বা তাজিকদের খাদ্যাভ্যাস মিলেমিশে এখানে এক অনন্য রূপ নেয়। রাশিয়ার ইফতার টেবিলে যে খাবারগুলো অবধারিতভাবে থাকে তা হলো:

১. খুরমা ও পানীয়: নবীজির সুন্নাহ মেনে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা হয়। সঙ্গে থাকে প্রচুর পরিমাণে পানি এবং স্থানীয় ফলের রস।

২. পিলাফ বা পোলাও: উজবেক ও তাজিক ঐতিহ্যের প্রভাবে মাংস ও গাজর দিয়ে তৈরি সুগন্ধি পিলাফ রাশিয়ার ইফতারের প্রধান আকর্ষণ।৩. তাতার পাই: তাতার মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী মাংসের পুর দেওয়া ছোট ছোট পাই বা সিঙ্গাড়ার মতো খাবারগুলো এখানকার মানুষ খুব পছন্দ করে।

৪. হালাল মাংসের স্টু: ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচতে ইফতারে গরম স্যুপ বা স্টু রাখা হয়, যা দীর্ঘ সময়ের রোজার পর শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়।

সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য দেখা যায় মস্কোর বিশাল বিশাল ‘রমজান তাঁবু’ বা খিমায়। ক্রেমলিনের খুব কাছেই বড় বড় তাঁবু গেড়ে কয়েক হাজার মানুষের গণ-ইফতারের আয়োজন করা হয়। এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই; তাতার, চেচেন, আরব কিংবা রুশ—সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক দস্তরখানে বসে ইফতার করেন। একে তারা বলেন ‘সংহতির ইফতার’।

বারাকাত ব্যাগ

মস্কোর উজবেক সম্প্রদায়ের একটি সুন্দর প্রথা হলো ‘বারাকাত ব্যাগ’। রমজান মাস জুড়ে সামর্থ্যবান মুসলিমরা খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে এই ব্যাগগুলো তৈরি করেন এবং তা অভাবী মানুষের ঘরে পৌঁছে দেন। এছাড়া বিভিন্ন মসজিদে ইসলামি ক্যালিগ্রাফি প্রদর্শনী, সেমিনার এবং বাচ্চাদের জন্য বিশেষ কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

ইসলামি ঐতিহ্য রুশ সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে এক নতুন রূপ পেয়েছে। রাশিয়ার মুসলিমরা প্রমাণ করেছেন, বিশ্বাস যদি অটুট থাকে, তবে হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রাও ইমানের উষ্ণতাকে স্পর্শ করতে পারে না। আগামীর রাশিয়ায় ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে শান্তি ও সহাবস্থানের এক শক্তিশালী স্তম্ভ।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...