Skip to main content

উইন্ডসর ক্যাসেলের আজান ও লন্ডনের রাজকীয় ইফতার

 টেমস নদীর তীরের শহর লন্ডন। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্য আর আধুনিক নব্য-সভ্যতার এই শহরে রমজান এখন কেবল মুসলিমদের একান্ত বিষয় নয়, বরং এটি ব্রিটিশ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লন্ডনের রমজান মানে এখন রাজকীয় প্রাসাদে আজান, ফুটবল স্টেডিয়ামে গণ-ইফতার আর পরিবেশবান্ধব এক আধ্যাত্মিক আবহ।

উইন্ডসর ক্যাসেলের ঐতিহাসিক ইফতার

লন্ডনের রমজান ইতিহাসের পাতায় ২০২৫ সালটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী ‘উইন্ডসর ক্যাসেল’-এর সেন্ট জর্জ হলে আয়োজিত হয়েছে রাজকীয় ইফতার। প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম প্রাসাদের ভেতরে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হয়েছে।

৩৫০ জন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সংস্কৃতির মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই ইফতার অনুষ্ঠানটি ছিল ধর্মীয় সহাবস্থান ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের উদারতার এক অনন্য প্রতীক।

এমনকি রাজা চার্লস এবং রানী কামিলাও নিজ হাতে খেজুর প্যাকেট করে মুসলিমদের ইফতার আয়োজনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

‘ইফতার স্ট্রিট’ ও ফিনসবারি পার্কের সম্প্রীতি

লন্ডনের আরেকটি জনপ্রিয় ইফতার আয়োজন হলো ‘ইফতার স্ট্রিট’। লন্ডনের ফিনসবারি পার্ক মসজিদের সামনের রাস্তাটি ইফতারের সময় এক বিশাল দস্তরখানে পরিণত হয়। প্রায় দুই হাজার মানুষ—যাদের মধ্যে মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরাও থাকেন—একসঙ্গে রাস্তায় বসে ইফতার করেন।

বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে এটি যেন এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রতিবাদ। এখানে স্বেচ্ছাসেবীরা ‘মৌমাছির মতো’ ব্যস্ত থাকেন খাবার পরিবেশনে, আর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত হয়ে সংহতি প্রকাশ করেন।

পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইফতার’

যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা এখন পরিবেশ সচেতনতায় বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছেন। ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি ইফতার’ বা পরিবেশবান্ধব ইফতার ক্যাম্পেইন এখন লন্ডনের মসজিদগুলোতে খুব জনপ্রিয়। তারা প্লাস্টিকের বোতল বা ওয়ান-টাইম প্লেট ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন।

বার্মিংহাম বা কেমব্রিজের মতো শহরগুলোতে এখন রি-ইউজেবল বা বারবার ব্যবহারযোগ্য পাত্রে খাবার পরিবেশন করা হয়। কেমব্রিজে তো তৈরি হয়েছে ইউরোপের প্রথম ‘ইকো-মসজিদ’, যা সৌরবিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ব্যবহারের জন্য অনন্য।

আকাশচুম্বী টাওয়ারে ইফতার

লন্ডনের ইফতার এখন আকাশছোঁয়া! লন্ডনের একটি ৫৬ তলা বিশিষ্ট নাকাঠচুম্বী ভবনে আয়োজন করা হয় ‘ওপেন ইফতার’। মনে করা হয়, এটিই ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উঁচুতে হওয়া কোনো আজান ও ইফতার। 

শুধু তাই নয়, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ‘চেলসি‘ তাদের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজ স্টেডিয়ামে বড় পরিসরে ইফতার আয়োজন করে অনন্য এক নজির স্থাপন করেছে। মাঠের কোণে জামাতে নামাজ আর গ্যালারিতে বসে ইফতারের দৃশ্য ফুটবল ভক্তদের কাছে এক বিশেষ স্মৃতি হয়ে আছে।

লন্ডনের ইফতারিতে কী থাকে

লন্ডন যেহেতু এক বহুজাতিক শহর, তাই এখানকার ইফতারের মেনুতে পুরো বিশ্বের স্বাদ পাওয়া যায়:

  • এশীয় স্বাদ: বিরিয়ানি, সমুচা ও পাকোড়া এখানকার ইফতারে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • আরবীয় প্রভাব: খুবুজ, ফালাফেল এবং নানা ধরনের কাবাব দস্তরখানে জৌলুস বাড়ায়।

  • মিষ্টিমুখ: খেজুরের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ইংলিশ পুডিং ও টার্কিশ বাখলাভা দিয়ে মিষ্টিমুখ করেন লন্ডনের মুসলিমরা।

  • সরিয়া: বিভিন্ন ধরনের ডাল ও সবজির স্যুপ দিয়ে ইফতার শুরু করাটা এখন লন্ডনের স্বাস্থ্য সচেতন মুসলিমদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

চ্যালেঞ্জ ও আনন্দ

লন্ডনে রমজান পালনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রীষ্মকালে এখানে ১৯ ঘণ্টারও বেশি সময় রোজা রাখতে হয়। দীর্ঘদিনের এই রোজার কারণে কর্মক্ষেত্রে বা স্কুলে মুসলিমদের কিছুটা বেগ পেতে হয়।

আবার ব্রিটিশ ক্যালেন্ডারে ঈদের ছুটি না থাকায় অফিস ও স্কুল সামলে আনন্দ করাটা সংগ্রামের মতো। তবুও সেন্ট্রাল লন্ডনের ওয়েস্টফিল্ড শপিং মল বা জুমহুরিয়াত স্ট্রিটের আলোকসজ্জা এই কষ্টকে আনন্দে রূপ দেয়।

সূত্র: আল–জাজিরা ডটনেট

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...