Skip to main content

রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রাণী

 কল্পনা করুন, নির্দোষ একটা বিড়াল বা কুকুর... যার পৃথিবীটা সীমাবদ্ধ খেলা, ভালোবাসা আর খাবারের মধ্যে। হঠাৎ করে তাকে ঠেলে দেওয়া হলো রাজনৈতিক শোরগোল, স্লোগান আর জনসমুদ্রের ভিড়ে। কেমন লাগবে প্রাণীর জন্য?

ভয়, আতঙ্ক আর অস্বস্তি। অথচ আমাদের সমাজে আজও রাজনীতির কাজে প্রাণীদের ব্যবহার করা হয়, যেটা শুধু অনৈতিকই নয়, আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী প্রচারণায় লাইভ প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কারণ, রাস্তায় মিছিল, মাইকিং আর জনসমাবেশে প্রাণীরা ভয় পায়, মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এমনকি অনেক সময় আঘাতেরও শিকার হয়। প্রাণী অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যে রাজনৈতিক প্রচারণা মানুষের কাজ, প্রাণীর নয়। কমিশনের সেই সিদ্ধান্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ছিল। বাংলাদেশের মতো ভারতেও একই ধরণের পদক্ষেপ দেখা গেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচনে ভারতের নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে, জীবন্ত প্রাণী রোডশো বা প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে না এমনকি কোনো দলের প্রতীক যদি প্রাণীও হয়, তবুও লাইভ প্রাণীকে টেনে আনা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে প্রতীকী ব্যবহার আর বাস্তবে প্রাণীকে ভিড়ে টেনে আনার মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। প্রাণীর প্রতীক গ্রহণযোগ্য কিন্তু তাদেরকে জনসমাবেশে দাঁড় করানো অমানবিক। ভারতের কিছু রাজ্য-স্তরে বড় দল যেমন BSP (Bahujan Samaj Party) হাতিকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে প্রতীকী দিকটা শক্তিশালী হলেও হাতিকে বাস্তবে ব্যবহার করার ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে। অনেকে বলেছে, এভাবে প্রাণীদের রাজনৈতিক উপকরণ বানানো পরিবেশ ও প্রাণীকল্যাণ দুই দিক থেকেই নেতিবাচক। রাজনীতি মানুষের বিশ্বাসের খেলা, সেখানে প্রাণীর উপস্থিতি কেবল “শো-অফ” ছাড়া আর কিছু নয়। গবেষণা দেখায়, উচ্চ শব্দ, অচেনা পরিবেশ ও ভিড়ে প্রাণীরা প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে। ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা বলেন, শব্দ দূষণ ও আতশবাজির মতো পরিস্থিতি প্রাণীদের উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। American Veterinary Medical Association (AVMA)-এর রিপোর্টও দেখায়, এধরণের পরিস্থিতি প্রাণীদের আচরণে অস্বাভাবিকতা তৈরি করে যা তাদের প্রাকৃতিক জীবনের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং, রাজনৈতিক সমাবেশ প্রাণীদের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। পাশাপাশি আরেকটি স্বভাব হলো... রাজনীতিবিদদের পোষ্য ব্যবহার করা। উদাহরণ হিসেবে ইংল্যান্ডের 10 Downing Street-এর “Larry the Cat” বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। অনেকেই বলেন, পোষ্য ব্যবহার করে রাজনীতিবিদরা নিজেদের ইমেজকে নরম দেখাতে চান কিন্তু সমালোচকরা এটিকে বলেন “puppaganda” অর্থাৎ পোষ্যকে প্রচারণার উপকরণে পরিণত করা। এতে মূল রাজনৈতিক বিষয় আড়ালে পড়ে যায় আর দর্শকের মনোযোগ সরানো হয় আবেগে। এটা নিঃসন্দেহে কৌশলী হলেও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশের প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ অনুযায়ী, প্রাণীদের প্রতি অমানবিক ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজনৈতিক কাজে প্রাণীকে ব্যবহার করা সরাসরি না হলেও এই আইনের আওতায় পড়ে কারণ এটি তাদের প্রাকৃতিক জীবন ব্যাহত করে এবং অযথা কষ্ট দেয়। তাহলে সমাধান কী? সহজ। রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রাণীর পরিবর্তে ডিজিটাল গ্রাফিক্স, ভিডিও বা আর্টওয়ার্ক ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা এড়ানো যাবে আবার মানুষের কাছে বার্তাও পৌঁছে যাবে আরও সৃজনশীলভাবে। প্রাণীরা মানুষের রাজনীতির খেলোয়াড় নয়। তারা ভালোবাসার, সুরক্ষার, আরেকটা শান্ত পৃথিবীর প্রাপ্য। প্রাণীদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা একদিকে তাদের প্রতি অমানবিক আচরণ, অন্যদিকে সমাজে ভুল বার্তা দেয়। আইন, ধর্ম, নৈতিকতা... সবকিছুই আমাদের শেখায় প্রাণীর প্রতি দয়া করতে। আর তাই বলা জরুরি, "প্রাণীদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করবেন না।" 🐾 রেফারেন্সসমূহ 🐾 * বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রচারণায় লাইভ প্রাণী ব্যবহার নিষিদ্ধ--- https://bdnews24.com/bangladesh/bangl... * ভারত: ২০১৯-নির্বাচন-প্রচারে জীবিত প্রাণী প্রদর্শন এবং রোডশোতে প্রাণীর ব্যবহার বন্ধ করতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ--- https://scroll.in/latest/918564/2019-... https://www.ndtv.com/india-news/poll-... https://timesofindia.indiatimes.com/i... * প্রাণীরা উচ্চ শব্দে ভয় ও মানসিক অস্থিরতায় পতিত হয়--- https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles... https://www.vetmed.ucdavis.edu/news/c... https://www.avma.org/javma-news/2017-... * ভারত: ২০১২-তে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাণী ব্যবহার এড়ানোর জন্য নির্বাচন কমিশনের আদেশ--- https://www.hindustantimes.com/delhi

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...