Skip to main content

‘আল্লাহু আকবার’ এক বৈশ্বিক আত্মশুদ্ধির ডাক

 


চলমান কর্মব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়শই নিজেদের মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ি। আমাদের সমাজ এখন এমন এক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে চলছে, যেখানে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ‘উৎপাদনশীল’ (প্রুডাক্টিভ) হতে হবে—হয় কিছু শিখতে হবে, না হয় ক্যারিয়ারে এক ধাপ এগোতে হবে। সামান্য বিরতি, নীরবতা বা নিছক আল্লাহর স্মরণ আমাদের কাছে প্রায়শই ‘অনুৎপাদনশীল’ বলে মনে হয়।

কিন্তু আমরা যখন প্রতিনিয়ত পডকাস্ট, অডিওবুক বা কাজের মাধ্যমে আমাদের সব নীরব মুহূর্তকে পূরণ করে ফেলি, তখন আল্লাহর স্মরণের জন্য কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না। আমরা ভালো পেশাজীবী হওয়ার ওপর এত বেশি মনোযোগ দিই যে, আল্লাহর উন্নত বান্দা হওয়ার কথা ভুলে যাই। ইসলাম এই ভারসাম্যহীনতাকে দূর করে।

তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।
কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২

‘আল্লাহু আকবার’-এর গভীর তাৎপর্য

আমরা প্রায়ই ইতিবাচক চিন্তাভাবনার জন্য ‘ইতিবাচক মন্ত্র’ পুনরাবৃত্তির কথা শুনি। কিন্তু ‘আল্লাহু আকবার’ একটি জাগতিক মন্ত্রের চেয়েও অসীম ক্ষমতাশীল। আমরা কেবল আমাদের মনকে ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে পুনর্নির্মাণ করছি না, বরং আমরা নিজেদেরকে চূড়ান্ত সত্যের সাথে সারিবদ্ধ করছি।

প্রতিবার যখন আপনি ‘আল্লাহু আকবার’ বলেন, তখন আপনি আপনার পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে যাওয়া একটি ঘোষণা দিচ্ছেন:

  • আল্লাহ আপনার ক্যারিয়ারের উদ্বেগ থেকে মহান।

  • আল্লাহ আপনার পারিবারিক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের চেয়ে মহান।

  • আল্লাহ আপনার আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে অনেক বড়।

  • আল্লাহ আপনার অন্তহীন কাজের তালিকা ও ডেডলাইন থেকে অনেক মহান।এই সত্যকে এই বরকতময় দিনগুলোতে শত শত বার পুনরাবৃত্তি করলে এক গভীর পরিবর্তন আসে। আমরা কেবল আমাদের চ্যালেঞ্জগুলোর সাথে মানিয়ে নিচ্ছি না, বরং সেগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ককে আমূল পুনর্গঠন করছি।

    আরবি শব্দ ‘তাকবির’ মানে কেবল আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা নয়, এটি এসেছে ‘কাবারা’ মূল থেকে, যার অর্থ ‘মহিমান্বিত করা’ বা ‘বিশাল করা’। আমরা আমাদের চেতনায় আল্লাহর ক্ষমতার ধারণাকে এত বড় করে তুলছি যে, আমাদের সমস্যাগুলো—তা যত বড়ই হোক না কেন—খুবই ক্ষুদ্র মনে হয়।

    আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমি তোমাদের স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও এবং অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)

    মুহাম্মাদ (সা.)-এর দুই মহান সাহাবি—আবু হুরায়রা এবং আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর একটি অসাধারণ অভ্যাস ছিল। তাঁরা মদিনার বাজারে যেতেন এবং উচুঁ স্বরে তাকবির পাঠ করতেন।

    বাজারে তাকবিরের প্রতিধ্বনি

    মুহাম্মাদ (সা.)-এর দুই মহান সাহাবি—আবু হুরায়রা এবং আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর একটি অসাধারণ অভ্যাস ছিল। তাঁরা মদিনার বাজারে যেতেন এবং উচুঁ স্বরে তাকবির পাঠ করতেন। কল্পনা করুন, দুইজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব বাজারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন এবং উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করছেন, “আল্লাহু আকবার”। (ফাতহুল বারি, ১/৫৫৯, মাকতাবাতুস সালাফিয়্যা, কায়রো, ১৩৭৮ হিজরি)

    এই ঘটনা থেকে আমাদের সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করে যে, বাজারের ব্যবসায়ী বা ক্রেতারা তাঁদের এড়িয়ে যেতেন না বা নিচুস্বরে বলতে বলতেন না। বরং তাঁরাও তাঁদের সাথে যোগ দিতেন।

    ফলস্বরূপ, পুরো বাজার আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণায় প্রতিধ্বনিত হতো। মদিনার মানুষ এমন একটি বিষয় বুঝতেন যা আমরা ভুলে গেছি: আমাদের পেশাদার স্থানগুলোতে আধ্যাত্মিকতাকে নিয়ে আসা কোনো বাধা বা বিপত্তি নয়, বরং এটি হচ্ছে বারাকাহ বা প্রাচুর্যের উৎস।

    বৈশ্বিক ঐকতানে আমাদের অংশগ্রহণ

    আমরা ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে ‘আল্লাহু আকবার’-এর বৈশ্বিক ঐকতানে অংশ নিতে পারি।

    ১. প্রতিদিন শোনা পডকাস্টের পরিবর্তে যাতায়াতের সময় মাঝেমধ্যে তাকবির বলতে পারি।

    ২. কোনো সমস্যায় আটকে গেলে, তাকবির আপনার মানসিক অবস্থাকে সতেজ করতে পারে। কেননা, এর মাধ্যমে আল্লাহকে আপনি সকল সংকট থেকে মুক্তি দাতা মহান বলে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন।

    ৩. সিঁড়ি, এলিভেটর বা এস্কেলেটরে উপরে ওঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ তসবিহ পড়তে পারি।

    ৪. শুধু ব্যক্তিগত অনুশীলন নয়। আপনার সন্তানদেরকেও এই বরকতময় শব্দগুলো শুনতে দিন। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করুন যেখানে রুটিনের চেয়ে আধ্যাত্মিকতা অগ্রাধিকার পায়। মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ তার পরিবারের জন্য কিছু ব্যয় করে, আর সে এতে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখে, তবে তার এই ব্যয়টুকুও সদকা হিসেবে গণ্য হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)

    আল্লাহর স্মরণকে পারিবারিক সংস্কৃতিতে পরিণত করা সবচেয়ে বড় সদকা।

    আপনার বলা প্রতিটি ‘আল্লাহু আকবার’ একটি মহান দিবসের জন্য আপনার হৃদয়কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আপনি সেদিন শুধু অভিযোগ এবং অনুরোধের তালিকা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন না।

    ৫. আপনি একা নন। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম, বিশেষ করে মক্কায় যারা কাবা শরিফ তাওয়াফ করছেন, বা ওমরাহ পালন করছেন, তারও এই জিকিরে মগ্ন। এটি অত্যন্ত শক্তিশালী অনুভূতি যে আপনার কণ্ঠস্বর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের বিশ্বব্যাপী ঘোষণায় যোগ দিচ্ছে। এই সম্মিলিত তাকবির ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত আরোগ্য হিসেবে কাজ করে।

    আমরা একটি উম্মাহ হিসেবে নিজেদেরকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে, আমাদের চ্যালেঞ্জ, আমরা যে অন্যায়গুলো দেখি এবং আমাদের ভাই-বোনেরা গাজা, সুদান এবং বিশ্বজুড়ে যে ব্যথা সহ্য করে—আল্লাহ সে সবকিছুর চেয়ে অনেক মহান। তাঁর শক্তি ও ক্ষমতা দিয়ে তিনি এমন জায়গা থেকে বিজয় দান করতে পারেন যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।

    আপনার বলা প্রতিটি ‘আল্লাহু আকবার’ একটি মহান দিবসের জন্য আপনার হৃদয়কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। আপনি সেদিন শুধু অভিযোগ এবং অনুরোধের তালিকা নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবেন না। আপনি এমন এক হৃদয় নিয়ে আসছেন, যা আপনার সম্পর্কিত সবকিছুর ওপর তাঁর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নেয়।

    আসুন আমরা নিজেদেরকে প্রস্তুত করি। আমাদের মুখ ও হৃদয় থেকে বারংবার উচ্চারিত হোক, “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”

    এই শব্দগুলোকে আমাদের বাকি জীবন এবং ইবাদতের মূল মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করি।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...