এই পৃথিবীতে এমন মানুষ পাওয়া খুব কঠিন, যে কখনো রোগে পড়েনি। ডাক্তারও এক সময় রোগী হয়। এই বাস্তবতাটাই ইসলাম আমাদের সামনে খুব স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরে।
আমরা যখন সুপারহিরো মুভি দেখি, তখন দেখি অবাস্তব চরিত্র সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান। তারা বিপদে পড়লে অলৌকিক শক্তি দিয়ে সব ঠিক করে ফেলে।
কিন্তু আমাদের জীবনে এমন কোনো সুপারহিরো আসে না। আমাদের idol আমদের super hero আমাদের নবীরা। অতচ আমরা বিপদে পড়লে কোনো নবীর জন্য অপেক্ষা করি না যে তিনি এসে আমাদের উদ্ধার করবেন।
আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর সাথে আমাদের প্রত্যেকের সরাসরি সম্পর্ক আছে। নবীদের কাজ ছিল সেই সম্পর্কটা আমাদের বুঝায় দেওয়া, তৈরি করে দেওয়া। নবী কখনোই আল্লাহ নন। এই জায়গাটায় ইসলাম অবিশ্বাস্যভাবে বাস্তবসম্মত।
আমাদের নবীরা সিনেমার নায়ক নন। তারা বনের রাজা নন, সমুদ্রের রাজা নন, কোনো রোমাঞ্চকর অভিযানের চরিত্র নন। তারা আমাদেরই মতো মানুষ।
কোরআনে তাদের ঘটনাগুলো এসেছে এমনভাবে যেন আমরা নিজেদের জীবনের সাথে মিল খুঁজে পাই। এই কারণেই কোরআন এত জীবন্ত, এত প্রাসঙ্গিক।
আইয়ুব আলাইহিস সালামের ঘটনা মূলত একজন রোগীর ঘটনা। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। কোরআনে তার একটি দোয়া এসেছে, “ইন্নি মাসসানিয়াদ দুর্রু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমিন।” এর অর্থ খুব সহজ কিন্তু গভীর।
তিনি বলছেন, কষ্ট আমাকে স্পর্শ করছে, আর আপনি সব রহমতের মালিক। এখানে তিনি অভিযোগ করছেন না, প্রশ্ন তুলছেন না, শুধু বাস্তবতাটা স্বীকার করছেন এবং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখছেন।
এই দোয়ার ভেতরে তিনটি শক্তিশালী শিক্ষা লুকায় আছে। প্রথমত, গ্রহণ করা। তিনি অস্বীকার করেননি যে তিনি অসুস্থ। অনেক সময় আমরা রোগ, দেউলিয়াত্ব, পারিবারিক ভাঙন এসব কিছুই মানতে চাই না।
এই অস্বীকার করা আমাদের কষ্ট কমায় না, বরং বাড়ায় দেয়। আইয়ুব আলাইহিস সালাম কষ্টকে স্বীকার করেছেন। এই স্বীকার করাটাই মানসিকভাবে সবচেয়ে বড় শক্তি।
দ্বিতীয়ত, ধৈর্য। হাদিস থেকে জানা যায়, তিনি বছরের পর বছর অসুস্থ ছিলেন। সম্পদ হারিয়েছেন, মানুষ দূরে সরে গেছে, সমাজ তাকে সন্দেহের চোখে দেখেছে।
অথচ তিনি আল্লাহর উপর আস্থা হারাননি। তিনি কোনো নাটকীয় কাজ করেননি, শুধু ধৈর্য ধরে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক আঁকড়ে ছিলেন। আল্লাহ তাকে এজন্যই সম্মান দিয়েছেন।
তৃতীয়ত, রহমতের আশা। তিনি শুধু একবার দোয়া করেননি। বারবার করেছেন। আল্লাহর রহমতের ওপর আশা কখনো ছাড়েননি। পরবর্তীতে আল্লাহ তাকে শুধু রোগমুক্তই করেননি, বরং আগের চেয়েও বেশি নিয়ামত ফিরিয়ে দিয়েছেন।
আজকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বিষয় পরিষ্কার যে psychology ও sprituality রোগীর সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখে।
উন্নত দেশগুলোর হাসপাতালে স্পিরিচুয়াল সাপোর্ট দেওয়া হয়, কারণ গবেষণায় প্রমাণিত যে এতে রোগীর মানসিক দৃঢ়তা বাড়ে। কোরআন ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস একজন রোগীকে সেই মানসিক শক্তি দিতে পারে, যা তাকে ভেঙে পড়তে দেয় না।
অতচ বাংলাদেশে এই জিনিসগুলোকে এখনো ''খ্যাত” হিসেবে দেখে মানুষ।
সর্বোপরি আমরা যেন মনে রাখি রোগ বা বিপদ আল্লাহর অনুপস্থিতির প্রমাণ না। অনেক সময় এটা আল্লাহর নৈকট্যের দরজা।
আইয়ুব আলাইহিস সালামের মতো আমরা যদি কষ্টকে গ্রহণ করি, ধৈর্য ধরি এবং আল্লাহর রহমতের ওপর অটল থাকি, তবে সেই কষ্টই একদিন আমাদের মর্যাদার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
Comments
Post a Comment