Skip to main content

“উপদ্রব”


 গভীর এক জঙ্গল। যেখানে মাটির গন্ধে মিশে ছিল বেঁচে থাকার গল্প। সেখানে একসময় সাপেরা ছিল রাজা। তাদের পৃথিবী ছিল ভেজা মাটি, কুয়াশা, শিশির আর গাছের শিকড়ে লুকিয়ে থাকা উষ্ণতা। দাদারা থাকত, নানারা থাকত আর তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠত সেই জঙ্গলের ছায়াতলে। তারা জানত না শহর কী, মানুষ কী, ইট বা সিমেন্ট কী জিনিস। তাদের কাছে প্রকৃতিই ছিল সংসার... একটা নিঃশব্দ, শান্ত কিন্তু জীবন্ত পৃথিবী।

তারপর একদিন দাদারা টের পেল, মাটিতে দোপায়া প্রাণীর হাঁটার কম্পন। মানুষ এসেছে! তারা গাছ কাটছে, আগুন জ্বালাচ্ছে আর বলছে “এখানে ফসল ফলবে।” দাদি বলল “কী উপদ্রব!” দাদা বলল “এরা প্রকৃতিরই সন্তান। উপদ্রব বলার কিছু নেই। চলো, মানিয়ে নেই।” ধীরে ধীরে জঙ্গল উধাও হয়ে গেল। আমাদের পূর্বপুরুষরা ভয় পায়নি, শুধু জায়গা বদলাল। তারা ভেবে নিল, মাটি তো একই আছে! শুধু গাছটা নেই, ছায়াটা নেই। নতুন ধানিজমিতে আমাদের জীবন মোটামুটি কেটে যাচ্ছিল। ইঁদুর ছিল, ব্যাঙ ছিল, রাতে ঠান্ডা হাওয়া বইত। কিন্তু একদিন আবার তারা এল। এখন দাদারা আর নেই। আমরাই মাটিতে টের পেলাম দোপায়ার কম্পন। ওরা এবার এলো ইট, বালি, সিমেন্ট নিয়ে। বলল “এখানে বাড়ি হবে।” আমাদের গর্তের ওপর ইঁট চাপা পড়ল, কেউ খেয়ালই করল না। আমার স্ত্রী, বাচ্চারা বলল “কী উপদ্রব!” আমি বললাম দাদার সেই কথাটাই “এরা প্রকৃতিরই সন্তান। উপদ্রব বলার কিছু নেই। চলো, মানিয়ে নেই।” ছানা পোনাদের নিয়ে পাশের ফাঁকা জায়গায় চলে গেলাম। তারপর একদিন মানুষেরাই আমাদের দেখে ভয় পেল। চিৎকার, লাঠি, দৌড়ঝাঁপ... যেন আমরা কোনো শত্রু! এরপর দেখলাম মানুষের পত্রিকায় বেরিয়েছে, এখানে‑সেখানে সাপ। কী উপদ্রব! অথচ উপদ্রব তো তখনই শুরু যখন জঙ্গলের প্রথম গাছটা কাটা হয়েছিল। বাস্তবতাও একই রকম। Sundarbans'র (বাংলাদেশ অংশ) অবস্থা ভয়াবহ হয়ে উঠছে, গবেষণা বলছে, আগের কয়েক দশকে বনভূমি অনেক কমে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৪–১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন ছিল প্রায় ৭,১৪২ বর্গকিমি এবং ২০১৫–১৬ সালে এটি দাঁড়িয়েছে ৬,৮৭১ বর্গকিমি। অর্থাৎ একশ বছরে প্রায় ২৫২ বর্গকিমি হারিয়েছে। আরও দেখা গেছে, প্রায় ১.৫–২ শতাংশ বছরের হার দিয়ে বনক্ষয় হচ্ছে অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০,০০০ হেক্টর এলাকায় বন হারাচ্ছে। বাংলাদেশে সাধারণ বনভূমির অভাব... দেশে বর্তমানে মাত্র ~১০.৭৪ % বনআচ্ছাদন রয়েছে অথচ প্রকৃতি‑ভারসাম্য রক্ষার জন্য কমপক্ষে ~২৫ % প্রয়োজন। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বনভূমি সরাসরি উচ্ছেদ, ধানের জমিতে পরিবর্তন, ইলেকট্রনিক চারা রোপণ না হওয়া বা শুষ্ক হয়ে যাওয়া সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ খুলনা বিভাগের দক্ষিণ উপকূলে এক রিপোর্ট বলছে ২০০১–২০২৩ সময়কালে শুধু খুলনায়ই প্রায় ৪৩,৬৮৯ একর বনভূমি হারিয়েছে। এসবের প্রভাব শুধু গাছের উপরই নয়... প্রকৃতি, প্রাণী, মানুষ সবকিছুর উপর পড়ছে। আরেক তরফে, বনভূমি হারার কারণে পরিবেশ পরিবর্তন, কৃষিক্ষেত্রে পরিবর্তন, অতিবৃষ্টিপাত সব মিলিয়ে মানুষের‑প্রাণীর বাসস্থানের খারাপ প্রভাব তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৫,০০০ জন সাপে কামড়ানোর শিকার হয়েছেন এবং ৮৪ জন মৃত্যুবরণ করেছেন বলে রিপোর্ট হয়েছে। যেখানে কারণ হিসেবে বলা হয়েছে.... অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, সাপের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া ও কৃষি পদ্ধতির বদল। এই তথ্য‑উপস্থাপন শুধু এক জন বা এক কাজের পরিণতি নয়, একটা সিস্টেমিক চিত্র তুলে ধরে যেখানে বনভূমি হারাচ্ছে, বাসস্থান বদলাচ্ছে, প্রাণীরা মানুষের সঙ্গে বাধ্য হয়ে বাস করছে এবং মানুষ এটাকে “উপদ্রব” ভাবছে কিন্তু প্রকৃত উপদ্রবটি অন্য জায়গায় শুরু হয়েছিল। এই পোস্টের উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়। বরং এটি সচেতন করার জন্য বলতে চায় মানুষের অবহেলা কিভাবে প্রকৃতিকে তথা আমাদের নিজের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তার প্রভাব আমাদের সবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রকৃতির ক্ষতি শুধু প্রাণীদের জন্য নয়, আমাদের জন্যও। আমরা যখন বন, নদী, জলাশয় ও বন্যপ্রাণীর বাসস্থান রক্ষা করি তখন আমরা আমাদের ভবিষ্যত রক্ষা করি। প্রকৃতি কাউকে বাদ দিয়ে তৈরি হয়নি। সাপ, গাছ, ব্যাঙ, পাখি সবাই একে অপরের ভারসাম্যের অংশ। মানুষ যখন সেই ভারসাম্য ভাঙে তখন প্রকৃতি শুধু প্রতিক্রিয়া দেখায়। “উপদ্রব” শব্দটা সাপের জন্য নয় বরং তাদের জন্য যারা প্রথম কারণ ছাড়াই গাছটা কেটেছিল। আমাদের কাজ হলো সচেতন হওয়া, পরিবেশ রক্ষা করা এবং প্রকৃতিকে সম্মান করা যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম বাঁচতে পারে। ধন্যবাদঃ সৈয়দ খালেদ সাইফুল্লাহ (বিষয়টি জানানোর জন্য)

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...