বিশ্বাস আধিপত্যবাদের সূক্ষ্মতম হাতিয়ার। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। রাশিয়ার অফিসিয়াল ধর্ম হচ্ছে অর্থডক্স খ্রিস্টান। সে যদি দুনিয়াতে এই ধর্মের অনুসারী বাড়াতে পারে, তার ক্ষমতাই বৃদ্ধি পাবে। আবার শিয়াদের কথা চিন্তা করেন। ইরানের অফিসিয়াল ধর্ম শিয়া। তাই সারা দুনিয়ার যত শিয়া আছে সে ইরানকে রক্ষা করতে চাইবে। খ্রিস্টান ধর্মের ধারক বাহক যেই রাষ্ট্র সে সব সময় লাভবান হবে যদি সে সারা দুনিয়ার মানুষকে খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করা যায়। আবার মক্কা ও মদিনা যার হাতে থাকবে, সে যত বেশী মানুষকে ইসলামের দিকে আনতে পারবে তা সরাসরি অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে। যদি কোন দেশের ধর্ম না থাকে তাহলে সে কি করবে? সে সেকুলারিজমের ধারক বাহক হবে। একটি বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন যে একটি রাষ্ট্রের নেতা বা জনগণের জন্য কেবলমাত্র মুসলিম, হিন্দু, নাস্তিক বা ক্যাথলিক হওয়াটাই যথেষ্ট না। ক্ষমতায়নের জন্য আপনাকে রক্ষক হতে লাগে। মূল রাজনৈতিক স্তম্ভ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সেই ভিত্তিক চলতে লাগে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের অফিসিয়াল ধর্ম হচ্ছে নাস্তিকতা। সেই দেশের প্রায় সবাই ধর্ম হীন। কিন্তু সে এই নীতি বিশ্বব্যাপী সে প্রচার করে বেড়ায় না। সে কোন নাস্তিকের দায়িত্ব নেয় না। বিশ্বের নানা প্রান্তে নাস্তিকরা আক্রমণের শিকার হলে সে পাত্তা দেয় না। এই মতবাদের সম্মানে লড়াইও করে না। মিডিয়াগুলো পর্যন্ত নাস্তিক্য ইস্যুতে নীরব। আমেরিকা বা ফ্রান্স যেমন বিভিন্ন দেশের নাস্তিক ব্লগার ও এক্তিভিস্টদের স্থান দেয় তেমনটিও চীন করে না। ফলে সে এই মতবাদের পতাকাবাহী হতে পারে নাই। বিশ্ব ব্যাপী নাস্তিকদের চোখের মনি হতে পারে নাই। অস্তিত্ব প্রশ্নের জায়গায় এক হতে পারে নাই। বর্তমান বিশ্বের দিকে যদি তাকাই আমেরিকা বা পশ্চিমের দেশগুলো দায়িত্ব নিয়ে প্রচার করছে লিবারেল দর্শন, সেকুলারিজম, বহুত্ববাদ ইত্যাদি। ফলে বিশ্ব জুড়ে এই দর্শন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার সাথে সাথে ঝোঁক তৈরি হচ্ছে (ক্রেইজ) পশ্চিমের প্রতি। আর তাই পশ্চিম পাচ্ছে মেধা, সম্পদ ও অনুসারী। এবার একটি করি আপনাকে। পশ্চিমের স্বার্থের জন্য কাদের মাঝে এই প্রচার বেশী বেশী করা উচিৎ? আপনি যদি লক্ষ্য করেন যে লিবারেল ও সেকুলার দর্শন কাদের কাছে বেশী বেশী প্রচার করা হচ্ছে তাহলেই এই বিষয়টি আপনার নিকট পরিষ্কার হয়ে যাবে। জি, ধনী এবং উচ্চ শিক্ষিতদের মাঝে। ট্রাক ড্রাইভার, কৃষক কিংবা গার্মেন্টস কর্মীদের মাঝে এই ধারণা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ ধনীদের সন্তান ও উচ্চ শিক্ষিত সার্কেলে লিবারেল দর্শনের প্রচার সুচারু ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এর ফলে সারা বিশ্ব থেকে মেধাবী ও সম্পদশালীরা এই দেশগুলোর প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। চীনের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি কাজ করে না। চীন যদি চায় সে বিশ্বব্যাপী সেকুলারিজমের চোখের মনি হবে (কিংবা বাংলাদেশ যদি চায় সে ইসলামের ক্ষেত্রে হবে) তাহলে রাষ্ট্রীয় ভাবে এই ধ্যান ধারণা প্রচার - প্রসার করতে হবে। সংসদে এই নীতি নিয়ে আলোচনা চলবে। মিডিয়া কথা বলবে। রাষ্ট্র বিভিন্ন দেশে দমনের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিবে। নিজ দেশে এক্টিভিস্টদের আশ্রয় দিবে। এভাবে নিজের পরিচয়ের সাথে চীনকে একীভূত করে ফেলবে। ফলে বিশ্বব্যাপী চীনের ভক্তকুল, নেটওয়ার্ক ও গুপ্তচর তৈরি হতে থাকবে। একই ভাবে কোন দেশ যদি নিজেকে রক্ষণশীল হিসেবে দায়িত্বের জায়গায় নিতে পারে, বিশ্ব ব্যাপী রক্ষণশীল মেধাবী , ধনী ও যোগ্য ব্যক্তিদের সে আকর্ষণ করতে পারবে।

Comments
Post a Comment