Skip to main content

একটা ন্যারেটিভ

 


ক্ষমতার যা আপনি দেখেন, সেটাই আসল নয়।

আমরা প্রতিদিন যেটাকে “ক্ষমতা” বলে দেখি, সেটা আসলে একটা ন্যারেটিভ। আর সেই ন্যারেটিভের কাজই হচ্ছে বাস্তবতাকে আড়াল করা। যাদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা আছে, তারা কখনো সবার সামনে আসে না। তারা ন্যারেটিভ তৈরি করে যাতে আমরা মঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকি, কিন্তু যারা পেছনে থেকে নাটকের চিত্রনাট্য লেখে, তাদের আমরা দেখি না। ক্ষমতার আসল খেলা এখানেই। মানুষের মনোযোগ সরায় রাখা, যাতে প্রশ্নটা কখনো সঠিক জায়গায় পৌঁছাইতেই না পারে। আমরা সাধারণত দেখি একজন রাজনীতিবিদ, একজন নেতা বা একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে। আমরা ভাবি, তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেছে। কিন্তু বাস্তবটা অনেক গভীর। এই নেতারা অনেক সময় কেবল প্রতীকমাত্র। তাদের পেছনে থাকে এমন এক Structure যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় কারা উপরে উঠবে, কারা নিচে নামবে, কোন নীতি “জনগণের জন্য” হবে আর কোনটা হবে বিনিয়োগকারীর জন্য। এই কাঠামো কখনো নির্বাচনে পড়ে না, ক্ষমতা হারায় না, এমনকি বিপ্লবেও পুরোপুরি বদলায় না। এটাই “True Power Structure” বা TPS যেটা থাকে অপরিবর্তিত। এই TPS টিকে থাকে কারণ তারা জানে কীভাবে বর্ণনা তৈরি করতে হয়। তারা জানে মানুষকে কীভাবে বিশ্বাস করাইতে হয় যে পরিবর্তন হচ্ছে, অথচ কাঠামোটা ঠিক আগের মতোই আছে। তাই আপনি যত সরকারই বদলান, যত নেতাই আসুক, মূল সিস্টেমটা কখনো বদলায় না। এটাই ক্ষমতার স্থায়িত্বের রহস্য। এই কাঠামো টিকে থাকতে এক চমৎকার উপায় ব্যবহার করে, যার নাম “Controlled Opposition” বা নিয়ন্ত্রিত বিরোধিতা। এটা এমন এক বিরোধী শক্তি, যাকে দেখলে মনে হয় তারা সিস্টেমের বিরুদ্ধে, কিন্তু বাস্তবে তারা সেই সিস্টেমেরই অংশ। তাদের কাজ হলো মানুষের ক্ষোভকে নিরাপদ পথে প্রবাহিত করা। মানুষ যখন রাগে ফেটে পড়ে, তখন তাদের একটা জায়গা দিতে হয়, যেখানে তারা চিৎকার করতে পারবে, কিন্তু আসল কিছুই বদলাবে না। তাই আমরা দেখি বড় বড় আন্দোলন, মিছিল, পিটিশন সব হচ্ছে, কিন্তু ফলাফল প্রায় শূন্য। মানুষ ভাবে তারা লড়াই করছে, আসলে তারা শুধু নিজেদের ক্লান্ত করে ফেলতেছে। Controlled Opposition এর দ্বিতীয় কাজ হলো দায় এড়ানো। এতে জনগণের দৃষ্টি প্রকৃত অপরাধীদের থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মিডিয়া এমনভাবে গল্প সাজায় যে মানুষ বিশ্বাস করে তাদের সমস্যার কারণ কোনো ছোট গ্রুপ বা ব্যক্তির ভুল, কিন্তু কাঠামোগত অন্যায় সেটা ঠিকই এড়ায় যায় । আমরা যে “শত্রু” দেখি, সেটা আসলে একটা পুতুল যাকে সামনে আনা হয় যাতে পেছনের আসল খেলোয়াড়রা অদৃশ্য থাকতে পারে। তৃতীয় কাজটা আরও সূক্ষ্ম সেটা হইলো তথ্য সংগ্রহ করা । মানুষ যখন কোনো আন্দোলনে জড়ায়, প্রতিবাদ করে, অনলাইনে পোস্ট দেয়, তখন তার তথ্য সংগ্রহ হয়। কে অ্যাক্টিভ, কার প্রভাব আছে, কার টাকা আছে। পরে এই তথ্য দিয়ে ঠিক করা হয় কাকে “Ban” করা দরকার, কাকে একটু প্রশ্রয় দেওয়া যায়। ফলে আসল হুমকিরা চিহ্নিত হয় আগেই। এই কাঠামো এতটাই বুদ্ধিমান যে তারা শত্রুর জন্মের আগেই তার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে। এই পুরো ব্যবস্থাটা এমনভাবে গঠিত যে পরিবর্তনের চেষ্টাও এক প্রকার নাটক হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিটি বিপ্লবের পরে আমরা দেখি নতুন মুখ, নতুন শ্লোগান, কিন্তু একই পদ্ধতি। কারণ কাঠামোটা টিকে থাকে। যে কাঠামো টিকে থাকে, সে-ই আসল ক্ষমতা। রাষ্ট্র ভাঙে, দল ভাঙে, পতাকা পাল্টায় কিন্তু অর্থ কোথা থেকে আসে, মিডিয়া কার হাতে, তথ্য কার নিয়ন্ত্রণে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বদলায় না। আর যখন এই কাঠামো মনে করে কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী তাদের জন্য ব্যয়বহুল বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে, তখন তারা বিনা দ্বিধায় পুঁজি সরিয়ে নেয়। পুরনো ব্যবস্থাকে তারা ভেঙে যেতে দেয়, তারপর একই ফর্মুলায় নতুন একটা কাঠামো বানায়, একটা নতুন সরকার, নতুন বিরোধী দল, নতুন প্রতিশ্রুতি কিন্তু মূল নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় তাদেরই হাতে। এইভাবেই “Controlled Opposition 2.0” জন্ম নেয়। আপনি দেখবেন, ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। রাজা যায়, প্রজাতন্ত্র আসে; একনায়ক শেষ হয়, গণতন্ত্র আসে; কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য একই থাকে। কারণ আসল শক্তির জায়গায় কেউ আঘাত করতে পারে না। এমনকি মানুষও সেটা দেখতে পায় না। কারণ মানুষ দেখে ন্যারেটিভ, গল্প, কিন্তু গল্পের লেখককে চেনে না। এখন প্রশ্ন আমরা কী করব? প্রথমত, আমাদের বুঝতে হবে এই খেলা কীভাবে চলে। যতক্ষণ আমরা বিশ্বাস করব যে সব ঠিক চলছে, ততক্ষণ আমরা এই Structure এর trap’র মধ্যে থাকবো। আমাদের শক্তি ব্যয় হয় ভুল জায়গায় ঝগড়ায়, পক্ষ-বিপক্ষে। কিন্তু আমরা যদি ন্যারেটিভের বাইরে দেখতে শুরু করি এবং বুঝতে পারি কারা আসলে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখনই আসল পরিবর্তনের শুরু হবে। ক্ষমতা কখনো ঘোষণা করে জানায় না সে কার কাছে । ক্ষমতা সবসময় আড়ালে থাকে এবং যারা সত্যিকারের ক্ষমতাবান, তারা জানে, মানুষকে বোকা বানানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তাকে বিশ্বাস করানো যে সে স্বাধীন। তার freedom আছে। তাই আপনি যখন পরের বার কোনো বড় স্লোগান শুনবেন, কোনো আন্দোলন দেখবেন, তখন নিজেকে প্রশ্ন করেন, এই আন্দোলনে কার লাভ? এই বিরোধিতায় কার নিয়ন্ত্রণ? যদি উত্তরটা না জানেন, তবুও চেষ্টা করেন প্রশ্নটা করতে। কারণ প্রশ্ন করাটাই প্রথম ধাপ। আর যে দিন মানুষ গল্পের বাইরে দেখতে শুরু করবে, সেদিনই আসল ক্ষমতার রহস্য বের করা যাবে। ✍🏽By - E V A N ("X" Formar Twitter)

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...