আপনি কি জানেন, আমাদের শহরের ঠিক মাঝখানে "ধানমন্ডি লেকের পাশে" দুটি নিরীহ গৃহপালিত বিড়ালকে এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছে যে তাদের চোখ উপড়ে ফেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে? ভাবুন তো, যেই বিড়ালটি একসময় মালিকের কোলে ঘুমাত, যার গলায় এখনও বেল্ট আছে তার চোখ দুটো কেউ নিষ্ঠুরভাবে ছিঁড়ে ফেলেছে! এই ঘটনার ভয়াবহতা শুধু প্রাণীর নয়, এটি আমাদের সমাজ, আমাদের মানবতার ওপর এক গভীর কলঙ্ক। ঢাকার ধানমন্ডি লেকের পাশে এই ভয়াবহ দৃশ্য চোখে পড়ে পথচারীদের। দুইটি গৃহপালিত বিড়াল যাদের দু’জনেরই গলায় বেল্ট বাঁধা অর্থাৎ কারো ভালোবাসার, কারো ঘরের প্রাণ উদ্ধার হয় চোখ উপড়ে ফেলা অবস্থায়। ঘটনাটি শুধু নৃশংস নয়, এটি মানবতার এক ভয়াবহ ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, গত দুই দিন ধরে একের পর এক একই রকম অবস্থায় দুইটি বিড়ালকে লেকের পাশে ফেলে যেতে দেখা গেছে। দু’টিরই চোখ উপড়ে ফেলা, রক্তাক্ত মুখ এবং দেহে আঘাতের চিহ্ন। উদ্ধারকারীরা ধারণা করছেন, কেউ পরিকল্পিতভাবে এই নিরীহ প্রাণীগুলোর ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয়, দু’টি বিড়ালের গলায় কলার বা বেল্ট ছিল। অর্থাৎ তারা রাস্তার নয়, কোনো ঘরের প্রিয় সদস্য ছিল। কেউ একসময় আদর করত, খেলত, খাবার দিত। আর আজ সেই প্রাণীর দেহ নিথর অবস্থায় পড়ে আছে শহরের এক ব্যস্ত এলাকার মাঝখানে। প্রাণী অধিকারকর্মীরা বলছেন, “এটা নিছক নৃশংসতা নয়, এটি একধরনের মানসিক বিকার। যিনি এ কাজ করেছেন, তিনি সমাজের জন্য বিপজ্জনক।” একজন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক বলেন, “যেভাবে চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে সেটা স্বাভাবিক নয়। এটি হয়তো কারো শত্রুতা অথবা বিকৃত আনন্দের অংশ।” ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেখানে সিসি ক্যামেরা রয়েছে প্রায় প্রতিটি মোড়ে, সেখানে এমন কাজ করে কেউ পালিয়ে যেতে পারবে তা ভাবাও কঠিন। তাই এলাকাবাসীর দাবি, ধানমন্ডি লেকের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ অবিলম্বে পরীক্ষা করা হোক যাতে অপরাধী শনাক্ত করা যায়। এমন ঘটনার পরও আমরা যদি নীরব থাকি তবে প্রশ্ন জাগে, আমাদের মানবতা কোথায়? একটা বিড়াল কেবল পোষা প্রাণী নয়, সে একজন সঙ্গী, ঘরের এক নীরব ভালোবাসার উৎস। যে মানুষ নিজের হাতে এমন নির্দয় কাজ করতে পারে সে সহজেই মানুষকেও ক্ষতি করতে পারে। মনোবিজ্ঞানীরা বরাবরই বলেন, প্রাণীর প্রতি সহিংসতা মানে পরোক্ষভাবে সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি তৈরি হওয়া। আজ যদি একটি বিড়ালের চোখ উপড়ে ফেলা হয়, কাল সেই হাতই অন্য কারো ওপর উঠতে পারে। বাংলাদেশে প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ অনুযায়ী, কোনো প্রাণীর ওপর নিষ্ঠুরতা বা অমানবিক আচরণ করলে তা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে বাস্তবে এসব অপরাধের বিচার প্রায় অদৃশ্য। প্রাণী অধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বান, ঘটনাটি নিয়ে থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (GD) করা হোক, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহ করে অপরাধীকে শনাক্ত করা হোক এবং স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো হোক যাতে কেউ এমন কাজের সাক্ষী হলে নির্ভয়ে তথ্য দেয়। ধানমন্ডি লেকের এই দুইটি বিড়াল হয়তো এখনো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, হয়তো কেউ তাদের শেষ আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু তাদের চোখের অন্ধকার যেন আমাদের মনকে না ঢেকে দেয়। প্রতিটি জীব অনুভব করতে পারে, ভয় পায়, ভালোবাসে। আমরা যদি সেই ভালোবাসার প্রতিদান না দিতে পারি, অন্তত নির্মমতা না দেখাই। এই ঘটনা শুধু দুইটি বিড়ালের নয়, এটি আমাদের সমাজের আয়না যেখানে আলো নিভে যাচ্ছে নীরবে। এখন সময় এসেছে সেই আলো আবার জ্বালানোর।

Comments
Post a Comment