ঘুমিয়ে আছেন, হঠাৎ পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠলো। বিল্ডিং, আলো, শহর সব কিছুর নিচে থেকে শুধুই একটাই প্রশ্ন বেরিয়ে আসছে: “এটা কী হচ্ছে? সম্প্রতি ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের সবার মাঝেই কম-বেশী অস্থিরতা কাজ করছে। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছি। কিন্তু কোরআনে আল্লাহ্ আমাদের এ সম্পর্কে কি বলে? চলেন সুরা যিলযালের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝার চেষ্টা করি। আয়াত ১ “যখন পৃথিবী তার প্রচণ্ড কাঁপনে কেঁপে উঠবে।” যিলযাল শব্দটা মানে শুধু সাধারণ ভূমিকম্প না। কেয়ামতের আগের সেই দিনটা এমন হবে যেখানে বিজ্ঞান আর ব্যাখ্যা কিছুই কাজ করবে না। মানুষ একে আর “প্রাকৃতিক দুর্যোগ” বলতে পারবে না। আমরা পৃথিবীর যত ভূমিকম্পের দিকে তাকাই রিকটার স্কেলে আমরা কি দেখি, পৃথিবী খুব একটা অল্প অংশ কাঁপলে আমরা দেখি কত মানুষ মারা যায়, কত বিল্ডিং ভেঙে যায় কিন্তু যখন পুরা পৃথিবী তার প্রচন্ডতা নিয়ে কাঁপবে আমরা শুধু কল্পনা করতে পারি সেটা কতটা তীব্র হইতে পারে। আয়াত ২ “আর যখন পৃথিবী তার ভারসমূহ বের করে দেবে।” মুফাসসিরগণ বলছেন, এখানে “ভার” বলতে এমন মানুষদের বোঝানো হয়েছে যাদের দাফন করা হইছে। আবার অনেকে বলছেন ভার বলতে পৃথিবীর ভেতরের স্বর্ণ-রত্ন সব বের হয়ে আসবে এই কথাকে বুঝায়। সহিহ মুসলিম ১০৩ নম্বর হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বলেছেন, পৃথিবী তার কলিজার টুকরার মত বিশাল স্বর্ণের স্তুপ বের করে দেবে। তখন হত্যাকাণ্ড, সম্পদ নিয়ে মারামারি, সম্পর্ক নষ্ট এই কাজগুলো যারা করছে তারা আফসোস করবে, কারণ স্বর্ণ তখন মূল্যহীন হবে। সেদিন সম্পদের কোনো দাম থাকবে না। আর সবাই বলবে, “আমি এই স্বর্ণের জন্য এতো খারাপ কাজ করলাম?” আয়াত ৩ মানুষ বলবে “এটা কি হইলো!” কারণ মানুষ এমন প্রচন্ড কাঁপন আগে দেখে নাই। ৪-৫ আয়াতে বলা হচ্ছে, পৃথিবী তার বৃত্তান্ত বর্ণনা করবে, কারণ আল্লাহ তাকে আদেশ দেবেন। তিরমিজী ও মুসনাদে আহমদের হাদিসে আসে পৃথিবী সাক্ষী দিবে কে কোথায় কী কাজ করেছে সেই সব কিছুর। আমরা অনেক অপরাধ দেখি যেগুলোর প্রমাণ কেউ পায় না, কিন্তু মাটি জানে। মাটি নীরব, জড় পদার্থ হইলেও আল্লাহ চাইলেই তাকে কথা বলার ক্ষমতা দিতে পারেন। সূরা ইয়াসিনেও আছে আমাদের হাত-পা কথা বলবে, আমাদের কাজের সাক্ষী হবে। আমরা অনেক কাজ লুকিয়ে করি, ভাবি কেউ দেখছে না। কিন্তু কেয়ামতের দিন আমাদের লুকানো চরিত্র প্রকাশ পাবে। নামাজে সূরা জিলজাল পড়েও আমরা ভাবি না এই আয়াতগুলোর বাস্তব মানে কি। একজন মানুষ হত্যা করে এসে হয়তো এই সূরাই পড়ছে, অথচ বুঝতেছে না যে মাটি তো সাক্ষী। আয়াত ৬ মানুষকে বিভক্ত করা হবে ভিন্ন ভিন্ন দলে, যাতে তাদের কাজ দেখানো যায়। এখানে “বিভিন্ন দল" শব্দটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এর অর্থ ভিন্ন গ্রুপ, ক্যাটাগরি করা। পৃথিবীতে আমরা জাতি, ভাষা, দেশ, পাসপোর্ট, সম্পর্ক অনুযায়ী ভাগ হই, কিন্তু কেয়ামতের দিন ভাগ হবে ঈমান ও আমল অনুযায়ী। জান্নাতি, জাহান্নামী, মুনাফিক, মুমিন। পৃথিবীতে আপনি ইচ্ছা করলেই গ্রুপ বদলাইতে পারেন, পরিচয় লুকাইতে পারেন, মুখোশ পড়তে পারেন। কিন্তু কেয়ামতের দিন পারবেন না। নূহ ও তার সন্তান, ইব্রাহিম ও তার বাবা এক পরিবার হইলেও আলাদা গ্রুপে থাকবে। কারণ তাদের ঈমান এক ছিল না। ৭-৮ নম্বর আয়াতে আছে, অণু পরিমাণ ভালো কাজ করলে সেটাও দেখা হবে আর অণু পরিমাণ খারাপ করলেও সেটা দেখা হবে। ছোট গুনাহ জমে পাহাড় হয় এটা বুখারী-মুসলিমে এসেছে। আমরা ছোট গুনাহকে গুরুত্ব দেই না। বাবা-মায়ের সাথে খারাপ ব্যাবহার, নামাজ দেরি করে পড়া, রাগ, প্রতারণা, আত্মীয়ের হক না দেয়া অনেক খারাপ কাজ আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে, আর এ সব কিছুরই হিসাব নেওয়া হবে। অন্যদিকে অর্ধেক খেজুর দিয়ে, হাসিমুখে কথা বলে, ভাল ব্যবহার করে, এগুলোও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ হইতে পারে। সব সময় বড় কাজ করা সম্ভব না, কিন্তু গুনাহ থেকে বাঁচতে, ছোট ভালো কাজ করা আমাদের রিজিক, হেদায়েতে বরকত এনে দিতে পারে। অনেকেই বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভূমিকম্প নিয়ন্ত্রণ, যে আমরা উপেক্ষা করি সেটার কারণ হিসেব ইসলাম ধর্মকে দোষ দেয়। কিন্তু আসলে আমরা যদি ইসলাম ধর্মকে প্রকৃতপক্ষে বুঝতাম, কুরআন পড়তাম, চিন্তা করতাম তাহলে আমরা আরো বেশি মানবসম্পদ- প্রকৃতির যত্ন নিতাম। ইসলাম আমাদেরকে বৈজ্ঞানিক হইতে নিরুৎসাহিত করে না এমনকি ভূমিকম্প পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিতেও নিরুৎসাহিত করে না। বরং আরো বেশি উৎসাহিত করে। কিন্তু অনেকেই ইসলাম এবং বিজ্ঞানকে এ ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে বিপরীত মুখী দেখানোর চেষ্টা করে, যেটা আসলে সম্পূর্ণ কোরআন বিরোধী এবং তাদের ইসলাম ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। ইসলামকে যদি মুসলমানরা ধারণ করত তাহলে কেউ নিয়ম ভঙ্গ করে বা অপরিকল্পিত নগরায়নকে উৎসাহিত করত না। যেখানে ইসলাম বিনা কারণে একটা গাছের পাতা ছিঁড়তে মানা করছে, সেখানে বন উজাড় করে বাড়ি বানানো তো ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম। মূল কথা, আমরা একসময় মাটিতে নিঃশেষ হয়ে যাবো, মানুষ আমাদেরকে ভুলে যাবে, কিন্তু আমাদের কাজের হিসাব জমা থাকবে। এই সূরা যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি এটাই জীবনের জন্য যথেষ্ট। আমরা যেন এটা মুখস্ত করি, ঠিকভাবে তিলাওয়াত করি এবং নামাজে পড়ার সময় গভীরভাবে ভাবি। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করুক, সুস্থ রাখুক, নেক হায়াত দেক, হেদায়েত প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত এবং ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করুক
yahia amin

Comments
Post a Comment