আজকের পৃথিবীতে যখন আমরা “সুদান” নামটা শুনি তখন আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ধ্বংস, অনাহার, শরণার্থী, আর যুদ্ধ। মিডিয়া দেখায় ধ্বংস হওয়া খার্তুম শহরকে যেখানে পড়ে আছে মানুষের লাশ, ভাঙা ঘর বাড়ি। কিন্তু এসবের পরেও কেউ প্রশ্ন করে না এই জায়গাটা এমন হলো কীভাবে? সুদান কি সবসময় এমন দুর্বল আর বিভক্ত দেশ ছিল? নাকি এর পিছনে এমন কোন ঘটনা আছে যা আমরা জানি না? বাস্তবতা হলো, সুদান কোনো ব্যর্থ রাষ্ট্র না বরং ইতিহাসে এই রাজ্য ছিল অনেক উন্নত আর সমৃদ্ধ। আফ্রিকা মানেই দারিদ্র্য, যুদ্ধ, বা অনুন্নয়ন এটা ভুল ধারণা। নীলনদের উপত্যকার এই অঞ্চলে মানবসভ্যতার বহু প্রাচীন অধ্যায় লেখা হইছিল। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে, কেরমা নামের এক রাজ্য গড়ে ওঠে নীলনদের তীরে। এটি আফ্রিকার প্রথম দিকের নগররাষ্ট্রগুলোর একটি, যেখানে গড়ে ওঠে প্রাসাদ, সমাধি, শিল্প, ও প্রশাসন। পরবর্তীতে জন্ম নেয় কুশ সাম্রাজ্য; এক শক্তিশালী রাষ্ট্র, যার রাজারা মিশরের সিংহাসন দখল করে ২৫তম রাজবংশের ফেরাউন হন। এরপর আসে মেরোই সভ্যতা, যা খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। এখানেই দেখা যায় লৌহশিল্পের চূড়ান্ত বিকাশ, নিজস্ব লিপি, এবং নারী নেতৃত্বাধীন রাজতন্ত্র। “কাণ্ডাকে” নামে পরিচিত রাণীরা মেরোই শাসন করতেন, যা ছিল সেই সময়ের জন্য অভাবনীয় ঘটনা। ইউনেস্কো একে “দ্বিতীয় মিশর” বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, কারণ এখানে আজও শত শত ক্ষুদ্র পিরামিড রয়েছে, যেগুলোর সংখ্যা মিশরের পিরামিডের চেয়েও বেশি। গ্রীক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস লিখেছিলেন, কুশ সভ্যতা ছিল “এথিওপীয় আলোকের উৎস”। এই ভূমি একসময় ছিল আফ্রিকার বাণিজ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র। লোহা, সোনা, হাতির দাঁত, এবং কৃষি পণ্য রপ্তানি হতো মিশর ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে। উনিশ শতকের শেষ দিকে ইউরোপীয়দের দৃষ্টি পড়ে আফ্রিকার দিকে। ১৮৯৯ সালে ব্রিটিশরা মিশরের সঙ্গে মিলে সুদানের ওপর “আঙ্গলো-ইজিপশিয়ান কনডোমিনিয়াম” নামে এক যৌথ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলে। কাগজে ছিল দুই দেশেরই ক্ষমতা কিন্তু সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশরাই। এই সময় থেকেই সুদানের মানচিত্রে তৈরি হয় কৃত্রিম রেখা। উত্তরকে তারা বানায় “আরব”, দক্ষিণকে “আফ্রিকান”। ধর্ম, ভাষা, বর্ণ সবকিছুকে ব্যবহার করা হয় বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে। দক্ষিণের খ্রিষ্টান ও অ্যানিমিস্ট জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উত্তরের মুসলিম জনগোষ্ঠীর দূরত্ব ইচ্ছাকৃতভাবে আরো বাড়ানো হয়। ব্রিটিশরা রাজধানী স্থাপন করে খার্তুমে, ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চল আরো বেশি অবহেলিত হয়ে যায়। তারা মূল সেনাবাহিনীকে দুর্বল রাখে, কিন্তু স্থানীয় মিলিশিয়াদের (সেনাবাহিনী দুর্বল রেখে, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া) প্রশ্রয় দেয়, যাতে সহজে বিদ্রোহ থামানো যায়। এই “divide and rule” নীতি সেই সময়ের সব উপনিবেশেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু সুদানে এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ কারণ এখানে মানুষকে শুধু বিভক্তই করা হয়নি বরং তাদের ইতিহাসকেও আলাদা করে দেওয়া হইছিল। ঔপনিবেশিক প্রশাসকরা সুদানকে কখনোই একটা ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলে নাই বরং তারা এটাকে “সম্পদ আহরণ কেন্দ্র” হিসেবে ব্যবহার করছে যেখানে শাসন না, শোষণই ছিল প্রধান লক্ষ্য। ১৯৫৬ সালে ব্রিটিশরা চলে যায়, সুদান স্বাধীন হয়। কিন্তু মানচিত্রে নাম থাকলেও জাতীয় পরিচয় বা ঐক্যের কোনো ধারণা ছিল না। সুদান ১৯৫৬ সালে স্বাধীনতা পায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয় না। নতুন নেতারা সেই ব্রিটিশ প্রশাসনিক নিয়ম ধরে রাখেন। খার্তুমকেন্দ্রিক ক্ষমতা, প্রান্তিক অঞ্চলের অবহেলা, আর বিদ্রোহ দমনে মিলিশিয়া ব্যবহার। এই কাঠামোর সবচেয়ে ভয়ানক রূপ চোখে পড়ে ওমর আল-বশিরের আমলে। ১৯৮৯ সালে ক্ষমতায় এসে তিনি “জঞ্জাউইদ” নামে এক আধাসামরিক বাহিনী গঠন করেন, যার কাজ ছিল দারফুরের বিদ্রোহ দমন করা। সেই জঞ্জাউইদই পরবর্তীতে রূপ নেয় Rapid Support Forces (RSF)-এ। তারা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র তৈরি করে। একদিকে রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী (SAF), অন্যদিকে RSF দুই শক্তি মিলে তৈরি হয় এক অস্থির ক্ষমতার ভারসাম্য। এরপর যখন বশিরকে সরানো হয়, তখন যে RSF ও SAF একসঙ্গে কাজ করেছিল , শীঘ্রই তাদের মধ্যে ভাঙন দেখা যায় । আর সেই ভাঙনই আজ সুদানের গৃহযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। আজকের যুদ্ধ কোনো আকস্মিক ঘটনা না। এটা দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা ক্ষমতার জন্য সৃষ্টি দ্বন্দ্বের পরিণতি। একপাশে আছে SAF সুদানের ঐতিহ্যবাহী সেনাবাহিনী, যারা নিজেদের রাষ্ট্রের বৈধ ধারক বলে মনে করে। অন্যপাশে আছে RSF যারা মূলত দারফুরের জনজাতীয় যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এই সংঘাত শুরু হয় ২০২৩ সালে,যখন RSF সেনাবাহিনীর (SAF) এর নিয়ন্ত্রণে আসতে অস্বীকার করে। ফলে খার্তুম, দারফুর, ওমদুরমান সব শহর পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। মানুষ ঘর ছেড়ে পালায়, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যায়, তৈরি হয় চরম খাদ্য সংকট। এক সাংবাদিক লিখেছিলেন, “প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দ মানে কোনো শিশুর মৃত্যু, কোনো দাদির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়া।” RSF কেবল যুদ্ধ করেনি, তারা বেসামরিক বাড়িঘর লুট করেছে, মানুষ অপহরণ করেছে, নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। খার্তুম থেকে ওমদুরমান পর্যন্ত দেখা গেছে ধ্বংসের একই চিত্র । একসময় যেসব ভবনে মানুষ আনন্দে থাকতো, সেগুলো এখন আর থাকার যোগ্য নাই। আজ খার্তুমের মানুষ যুদ্ধের শব্দে জেগে ওঠে। রাস্তার ধারে ছিন্নবস্ত্র শিশু, নিঃস্ব বৃদ্ধ, আর তরুণ প্রজন্ম যারা জানে না ভবিষ্যৎ কেমন হবে। তাদের জীবনের গল্প কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদে জায়গা পায় না। যে মানুষগুলো একসময় রমজানে রাস্তায় ফালাফেল ভাজত, তারা আজ মাটির নিচে আশ্রয় নেয়। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একসময় ইতিহাস পড়ানো হইতো, সেগুলো এখন পরিণত হইছে ধ্বংসস্তূপে। এই যুদ্ধ শুধু রাজনীতির যুদ্ধ না, এটা এক জনগোষ্ঠীর ধ্বংসের গল্প। সুদানের এই রাজনৈতিক স্ট্রাগেল এর জন্য এককভাবে কোনো আরবরাজ্য দায়ী না বরং এর পিছনে মূল হচ্ছে ইউরোপিয়ান কলোনাইজ। আমেরিকা এখন আবার “গ্লোবাল লিডারশিপ” এ ফিরে যাইতে চায়। বেশ কিছুদিন ধরে তারা মানবাধিকার, গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা এই শব্দগুলো ব্যবহার করে আফ্রিকার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতেছে। কিন্তু তাদের এই “উদ্ধারকর্তা” ভাবের নিচে আছে পুরনো উপনিবেশিক মানসিকতা। যে শক্তিগুলো একসময় এই দেশকে বিভক্ত করলো, এখন তারা আবার “সহায়তা” দিতে চাইতেছে। সুদান যখন নিজের পথে চলত তখন সে ভালো ছিল। যখনই বাইরের সাম্রাজ্য এসে তার মানচিত্রে রেখা টানল, তখনই শুরু হলো বিভাজন আর যুদ্ধ। সুদানের জন্য সমাধান বাইরে নয়, ভেতরেই আছে। প্রথমত, RSF-কে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিবর্তে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক দেশগুলোকে শান্তি প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে হবে ইতিহাসের ঐক্য, বিভাজন নয়। কুশ ও মেরোইর উত্তরাধিকার স্মরণ করে নতুন জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা দরকার যেখানে আরব ও আফ্রিকান বিভেদ থাকবে না। সুদানের ইতিহাস বুঝতে হলে এটাকে আফ্রিকার ঔপনিবেশিক মানচিত্রের প্রেক্ষিতে দেখতে হয়। ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে এমন সীমানা তৈরি করেছিল যা স্থানীয় জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে ভেঙে দেয়। ফলেই স্বাধীনতার পরেও সুদান উত্তরাধিকারসূত্রে পায় বিভক্ত প্রশাসন ও ক্ষমতার লড়াই, যার শিকড় আজও রয়ে গেছে তার রাজনৈতিক অস্থিরতায়। সবশেষে, অর্থনৈতিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। সোনার খনি, তেল, কৃষি সবকিছুর মালিকানা জনগণের হতে হবে, সামরিক বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নয়
y.amin

Comments
Post a Comment