আমেরিকায় একটা নতুন অভিজাত শ্রেণি তৈরি হইতেছে, যারা সম্পদ বাড়ায়… কিন্তু কর দেয় না Ray Matto, বোস্টন কলেজ ল’ স্কুলের অধ্যাপকের মতে- আজকের যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পথে হাঁটছে, যা প্রাক-বিপ্লবী ফ্রান্সের “Second Estate” অর্থাৎ করমুক্ত রাজকীয় অভিজাত শ্রেণির মতোই বিপজ্জনক। তার ভাষায়: “রাষ্ট্র ঋণে ডুবছে, আর কিছু মানুষ কর না দিয়ে অকল্পনীয় সম্পদের পাহাড় গড়ছে” ঠিক এই জায়গা থেকেই আজকের বড় প্রশ্ন উঠে আসে- কে আসলে দেশের খরচ চালায়? সাধারণ মানুষ? নাকি ধনীরা? ২০২৪ সালে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার মোট ৫ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব তুলছিল। যার মধ্যে পড়ে আয়কর ট্যাক্স (ব্যক্তির উপার্জনের উপর সরকার যে কর নেয়), পেরোল ট্যাক্স (কর্মীর বেতন থেকে সোশ্যাল সিকিউরিটি ও মেডিকেয়ারের জন্য কাটা কর), করপোরেট ট্যাক্স (কোম্পানির লাভের উপর সরকার যে কর নেয়), এস্টেট ট্যাক্স (কেউ মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পদের উপর ধার্য করা কর) আর গিফট ট্যাক্স (জীবিত অবস্থায় বড় অংকের সম্পদ/টাকা উপহার দিলে যে কর লাগে।) ইত্যাদি। কিন্তু ব্যয় হয়েছিল ৬.৮ ট্রিলিয়ন ডলার। মানে, ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি যা সরাসরি জাতীয় ঋণে যোগ হইছে। এখন এই প্রেক্ষাপটে যদি আমরা দেখি, ঠিক সেই সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী নাগরিকদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার। পুরো ছবিটা একেবারে অন্যরকম লাগতেছে না? একটা রাষ্ট্র যখন ঋণে ডুবে যাচ্ছে, তখন একটা ছোট অংশের মানুষ কল্পনাতীত সম্পদের মালিক হচ্ছে। এই বিষয় নিয়েই ব্যাখ্যা করেন রে মাত্টা (Ray Matto), বোস্টন কলেজ ল’ স্কুলের অধ্যাপক এবং Forum on Philanthropy and the Public Good -এর প্রতিষ্ঠাতা। রে মাত্টোর ভাষায়, আমেরিকা আসলে নিজের মধ্যেই গড়ে তুলতেছে এক ধরনের “দ্বিতীয় এস্টেট” (Second Estate) যেমনটা ছিল প্রাক-বিপ্লবী ফ্রান্সে, যেখানে অভিজাত শ্রেণি সম্পূর্ণ করমুক্ত ছিল। আজকের আমেরিকায় সেই অভিজাত শ্রেণির জায়গা নিয়েছে “ধনীরা”, যারা কার্যত ফেডারেল ট্যাক্সের বাইরে। আমরা মনে করি, করব্যবস্থা “প্রগ্রেসিভ” মানে যার আয় বেশি, তার ট্যাক্সও বেশি। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা অনেক ভিন্ন। ধনীরা এখন এমনভাবে সম্পদ বাড়াইতেছে, যা “ট্যাক্সযোগ্য আয়” হিসেবেই ধরাই পড়ে না। তাদের সম্পদ আসে শেয়ার, বিনিয়োগ, আর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থ থেকে, যেগুলোর উপর প্রায় কোনো ট্যাক্সই দিতে হয় না। ধরা যাক মার্ক জাকারবার্গকে। ফেসবুকের শেয়ার তার হাতে থাকায় তার সম্পদের মূল্য প্রতিদিনই বাড়তেছে, কিন্তু যতক্ষণ না সে সেই শেয়ার বিক্রি করতেছে, ততক্ষণ এই বৃদ্ধিটা “আয়” হিসেবে ধরা হয় না। তাই কোনো ট্যাক্সও দিতে হয় না। আরও বড় কৌশল হইলো, তাকে শেয়ার বিক্রি করতেই হয় না। সে ওই শেয়ারগুলোকে “জামানত রেখে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়”, আর সেই ঋণের টাকা সম্পূর্ণ “ট্যাক্স-ফ্রি”। এই টাকাতেই চলে তার সব বিলাসী জীবন বাড়ি, প্রাইভেট জেট, ইত্যাদি। ফলে বছরের পর বছর কোটি কোটি ডলার খরচ করেও তার taxable income প্রায় শূন্যই থেকে যায়। আরেকটা বড় দিক হলো উত্তরাধিকার সুত্র। যুক্তরাষ্ট্রে কেউ যদি ১০ মিলিয়ন বা ১০০ মিলিয়ন ডলার উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, তার উপর কোনো income tax দিতে হয় না। একমাত্র যে করটি এই ধরণের সম্পদের উপর পড়ার কথা, সেটা হলো estate tax। কিন্তু সেটার অবস্থাও করুণ। ১৯৯০ সালের পর থেকে একটাও সংশোধনী হয়নি, ফলে এখন সেটার প্রয়োগ তেমন দেখা যায় না। এটা রাজস্ব আনে দেশের মোট আয়ের ১% এরও কম। এদিকে সাধারণ মানুষের যে করগুলো চোখে পড়ে না ।যেমন payroll tax সেটাই আসলে দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্ব উৎস। আয়করের পরে, এই ট্যাক্সই প্রায় ৩৫% রাজস্ব দেয়, যা দিয়ে চালানো হয় সোশ্যাল সিকিউরিটি আর মেডিকেয়ার। আর এই ট্যাক্সের পুরোপুরি দেয় কর্মজীবী মানুষরা। একজন কর্মী তার উপার্জনের প্রথম ডলার থেকেই দেয় ১৫.৩% কর। অর্থাৎ কেউ যদি বছরে ৬০ হাজার ডলার আয় করে, তার প্রায় ৯ হাজার ডলার শুধু payroll tax-এ চলে যায়। অন্যদিকে দেখেন, করপোরেট ট্যাক্স দেয় দেশের মোট ট্যাক্সের মাত্র ১১% আর এস্টেট ট্যাক্স? সেখান থেকে এই ১১% এরও কম ট্যাক্স আসে। ১৯৮২ সালে “SEC” কোম্পানিগুলোকে নিজস্ব শেয়ার “buyback” (কোম্পানি নিজের শেয়ার নিজেই কিনে নেওয়া, যাতে শেয়ারের দাম বাড়ে) করার অনুমতি দেয়। যেটা পুরো খেলার নিয়মটাই বদলায় দেয়। আগে কোম্পানিগুলো তাদের লাভ “dividend”(কোম্পানির মুনাফা থেকে শেয়ারহোল্ডারকে দেওয়া নগদ অর্থ, যেটার উপর কর লাগে) আকারে দিত, যেটা ট্যাক্সযোগ্য ছিল। কিন্তু “stock buyback”-এর পর লাভ আসে শেয়ারের দামের বৃদ্ধিতে যা ট্যাক্সমুক্ত থাকে যতক্ষণ না সেটা বিক্রি হচ্ছে। এর ফলাফল? ১৯৮২ সালে যেখানে Dow Jones ছিল ৩,০০০ পয়েন্টে, আজ সেটা ৪৩,০০০ ছাড়িয়েছে। ধনীরা করমুক্তভাবে আরও ধনী হইতেছে। এখন অনেকে বলতে পারেন, তাইলে wealth tax (ব্যক্তির মোট সম্পদের উপর ধার্য করা কর) চালু করা উচিত। কিন্তু মাত্টো মনে করেন, এটা বিপজ্জনক হইতে পারে, এতে ধনীরা তাদের সম্পদ এমন খাতে সরায় ফেলবে যা পরিমাপ করা কঠিন হবে (যেমন প্রাইভেট বিজনেস বা রিয়েল এস্টেট), আর এর ফলে পুরো স্টক মার্কেটই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বরং সমাধান হতে পারে “realization at death” পদ্ধতি। অর্থাৎ কেউ মারা গেলে বা উপহার দিলে তখন সম্পদের মূল্যবৃদ্ধির উপর কর ধার্য করা। তিনি আরও বলেন, আজকের charitable giving ব্যবস্থাটাও অন্যায্য। সাধারণ মানুষ তাদের দান থেকে কোনো ট্যাক্স সুবিধা পায় না, কারণ তারা স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন (সাধারণ মানুষের নির্দিষ্ট পরিমাণ করমুক্তির সুবিধা, যার কারণে ছোট দানে কর ছাড় পাওয়া যায় না।) নেয়। কিন্তু ধনীরা, যারা নিজের ফাউন্ডেশন বা donor-advised fund-এ দান করে, তারা পায় ৭৪% পর্যন্ত ট্যাক্স ছাড়। মানে কেউ যদি ১০০ মিলিয়ন ডলার দান করে, তার প্রকৃত খরচ মাত্র ২৬ মিলিয়ন বাকি ৭৪ মিলিয়ন রাজস্ব হিসেবে ধরাই হয় না। এই ব্যবস্থায় যারা দান করতেছে তার লাভবান হইতেছে ঠিকই কিন্তু সরকার আর জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। রে মাত্টোর মূল বার্তাটা একটাই, আমেরিকার সবচেয়ে ধনী শ্রেণি এখন এমন এক অবস্থানে পৌছাইসে যেখানে তারা সম্পদ বাড়াচ্ছে কিন্তু দায়িত্বের কোন ভাগ নিচ্ছে না। আর এই “দ্বিতীয় এস্টেট”-এর টিকে থাকা মানে হলো, রাষ্ট্রের বাকি সবাই ক্রমশ ঋণের ভারে আরও বেশি ডুবে যাবে
y.amin

Comments
Post a Comment