"
ছয় বছর আগে, আমি যখন প্রথমবারের মতো নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াই, তখন এক দয়ালু মুসলিম চাচা আমাকে আলাদা করে ডাকলেন। নরম হাসিতে বললেন— “বাবা, মুসলমান সেটা সবাইকে বলতে হয় না।” তার চোখে মমতা ছিল, দাড়িতে গর্ব ছিল, মুখে ছিল নীরব ইতিহাসের ভার। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার—তিনি বারবার শিখেছেন একটাই শিক্ষা: নিরাপত্তা কেবল শহরের ছায়ায় লুকিয়ে থাকে। ছায়ার বাইরে বেরোলে, বিশ্বাসটা পিছনে ফেলে যেতে হয়। এই শিক্ষা নিউইয়র্কের হাজারো মুসলমানের রক্তে লেখা। আর গত কয়েক দিনে, সেই একই শিক্ষা আওড়াচ্ছেন অ্যান্ড্রু কুয়োমো, এরিক অ্যাডামস আর কার্টিস স্লিওয়া। কেউ বলেছেন আমি 9/11 নিয়ে আনন্দ করব, কেউ বলেছেন আমি ইউরোপের সন্ত্রাসীদের মতো, কেউ বলেছেন আমি ‘গ্লোবাল জিহাদ’-এর সমর্থক। রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনগুলো আমাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে দেখায়, আমার খাওয়ার ভঙ্গিকে উপহাস করে, এমনকি ভোটারদের জিজ্ঞেস করে—“আপনি কি চান হালাল খাবার বাধ্যতামূলক হোক?” কিন্তু আজ আমি তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলব না। আজ আমি বলব নিউইয়র্কের মুসলমানদের উদ্দেশ্যে। আমি বলব সেই খালার কথা, যিনি 9/11-এর পর হিজাব পরে ট্রেনে ওঠা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমি বলব সেই মুসলিম শিক্ষক, পুলিশ অফিসার বা সিটি-ওয়ার্কারদের কথা—যারা শহরটিকে বাঁচিয়ে রাখে, অথচ তাদের মুখে থুতু ছোড়ে এই শহরের নেতারাই। আমি বলব সেই বাচ্চার কথা, যে “র্যান্ডম চেক”-এর নামে প্রতিদিন অপমানিত হয়, এবং বুঝতে শেখে—সে “অন্য”। আমি জানি এই সন্দেহ নিয়ে বাঁচা কেমন লাগে। আমার নাম উচ্চারণের পর বাতাসে কেমন ঠান্ডা নীরবতা নেমে আসে, আমি জানি। আমি জানি এয়ারপোর্টে কাচের ঘরে বসে কেউ জিজ্ঞেস করে—“তুমি কি এই শহর আক্রমণ করতে যাচ্ছো?” তবুও আমি জানি, আমি তুলনামূলকভাবে ভাগ্যবান। আমাকে কখনও গোপন তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়নি, আমার গ্যারেজে কখনও “Terrorist” লিখে দেওয়া হয়নি, আমার মসজিদ পুড়িয়ে দেওয়া হয়নি। নিউইয়র্কে মুসলমান হয়ে বাঁচা মানেই অপমানের প্রত্যাশা। কিন্তু সমস্যা অপমানে নয়, সমস্যা সেটাকে ‘সহ্য করা’-তে। এক বছর আগে আমি মেয়র প্রার্থী হয়েছি—একজন মুসলিম হিসেবে নয়, বরং প্রত্যেক নিউইয়র্কারের প্রতিনিধি হিসেবে। ভাবতাম, যদি সবার জন্য কাজ করি, যদি বিনয়ী থাকি, তবে আমাকে শুধু ধর্ম দিয়ে নয়, মানুষ হিসেবে দেখা হবে। ভুল ভেবেছিলাম। কোনো ব্যাখ্যা, কোনো নীরবতা যথেষ্ট নয়। এই পথে আমি সেই শিশুটিকে ভুল শিক্ষা দিয়েছি—যে এখনো ছায়ায় থাকতে শিখছে। আমি সেই “চাচা”-ই হয়ে গেছি, যিনি আমাকে একদিন সতর্ক করেছিলেন। আর না। আমরা ছায়ায় থাকব না। আমরা আলোয় দাঁড়াব। নিউইয়র্কে এক মিলিয়নেরও বেশি মুসলমান আছে, তবুও আমরা এখনও অতিথি বলে গণ্য হই নিজের শহরে। ইসলামবিদ্বেষ এখনো “গ্রহণযোগ্য ঘৃণা”র তালিকায়। আর না। নির্বাচন আসছে, কিন্তু এই লড়াই নির্বাচনের জন্য নয়। এই লড়াই সেই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, যে সংস্কৃতি বলে—“তুমি মুসলমান, তোমার স্থান ছায়ায়।” আমি মুসলমান, আমি নিউইয়র্কার। আমি আমার বিশ্বাস, পরিচয় বা খাওয়ার ধরন বদলাব না। শুধু একটাই বদল আনব— আমি আর ছায়ায় নিজেকে খুঁজব না। আমি আলোয় দাঁড়াব। — জোহরান মামদানী ইসলামিক কালচারাল সেন্টার, ব্রঙ্কস 24.10.2025

Comments
Post a Comment