পাঠানী স্বভাবএকটি ঠান্ডা পানীয়ের বিজ্ঞাপনের দৌলতে "তুফানী" শব্দটি বেশ পরিচিত বটে, তবে "পাঠানী" শব্দ টি আদৌ বাংলা অভিধানে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে কি না সেই বিষয়ে এই অধমের যারপরনাই সন্দেহ রহিয়াছে ইহা অস্বীকার করিবার দৃঢ়তা দেখাইতে পারিতেছি না, সে যাই হউক, এই কনটেক্সট এ এই শব্দ টিই বেশি মাত্রায় যথাযত, তাই অভিধান আপাতত অস্বীকার করিয়া "পাঠানী" ব্যবহার করিলাম। পাঠানের স্বভাব তাই পাঠানী, এই বার বিচক্ষণ পাঠক পাঠার স্বভাব কি হইবে তাহার ব্যাখ্যা চাহিলে তাহা ঘোরতর সমস্যার বৈ কি। শব্দের মানে ব্যাখ্যায় বেশি সময় ব্যয় না করিয়া বরং আসল বিষয়ে আলোকপাত করি। আমাদিগের সম্প্রতিক আফগানিস্থান ভ্রমণ কালে, ফেলুদা মার্কা তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে, পাঠানদের বেশ কিছু চারিত্রিক এবং ব্যবহারিক বৈশিষ্ট প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম, যাহা বেশ চিত্তাকর্ষক। সর্ব প্রথমে, পাঠানী কুশল বিনিময়, এই সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী যাহা বলিয়াছিলেন তাহা মিলিয়া গিয়াছে, তবে একশত বৎসরের ব্যবধানে কুশল বিনিময়ের সময় কাল ( duration ) খানিকটা কমিয়াছে বটে, কিন্তু প্রথা একই, সালাম বিনিময়ের পর, দুই জনই দুই জন কে একই প্রশ্ন করিয়া চলেন, এ বলে "আপ ঠিক হো?" তো ও বলে "আপ ঠিক হো?" এ বলে "ঘর মে সব ঠিক?" তো অপর দিক হইতে একই প্রশ্ন প্রতিফলিত হইয়া আসে "ঘর মে সব ঠিক?", তারপর "বাল বাচ্চে ঠিক?" আবারও উত্তরের বদলে একই প্রশ্নের প্রতিফলন "বাল বাচ্চে ঠিক?", "আপ খানা খায়া?" এর উত্তরেও উল্টো দিকে কোনও বিচ্যুতি নাই, "আপ খানা খায়া?" এই ভাবেই দুই তরফে প্রশ্ন চলিতে থাকে, উত্তর কেহই দেন না, পরিশেষে সেকেন্ড চল্লিশ হইতে মিনিট খানেক পরে, দুই পক্ষই "শুখর আল্লাহ কা" বলিয়া ক্ষান্ত দেন। পাঠানী সাক্ষাৎকারের এই বিচিত্র প্রথায় যে বেশ পুলকিত হইয়াছিলাম, এই কথা অস্বীকার করি না। এই অধম সাধারণত, যেকোনো স্থানীয় প্রথা খুব তাড়াতাড়ি রপ্ত করিয়া বাস্তবায়ন এর পক্ষপাতী, এই ক্ষেত্রেও অন্যথা হয় নাই, প্রথম দিনেই বুঝিয়া গিয়াছিলাম, কুশল বিনিময়ের ক্ষণে প্রশ্নের উত্তরে একই প্রশ্ন না করিয়া সঠিক উত্তর দেওয়া পাঠানী স্বভাব নহে, বরং প্রশ্নটির loss less প্রতিফলনই প্রথা। দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণটি হইলো পাঠানের স্বাক্ষর, ইহা এক দেখিবার মতো বিষয়। কাবুলে পর্যটক মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়ে অনুমতিপত্রের আবেদন মঞ্জুরির কালে ইহা প্রথম লক্ষ্য করিয়াছিলাম, সংশ্লিষ্ট আধিকারিক তাহার স্বাক্ষর করিবার কালে সাক্ষরের পরে, ডানদিক বামদিক সমান্তরালে বার পাঁচ- ছয়েক পেন চালাইয়া অতঃপর ক্ষান্ত দিলেন। সাক্ষরটির উপর হইতে নিচে প্রায় ছয়টি রেখা ইহাতে জন্ম নিল, পরবর্তীতে হেরাটে এবং কান্দাহারে যতবার পর্যটক কার্যালয়ে অনুমতির জন্য গিয়াছি, অথবা ব্যাঙ্ক এ ডলার পরিবর্তন করিয়া আফগানি সংগ্রহ করিতে গিয়াছি, সকল ক্ষেত্রেই সকল পাঠানই একই ভাবে স্বাক্ষর করিয়া নিজেদের পাঠানী স্বাক্ষর বজায় রাখিয়াছেন। এইবার আসি পাঠানের তৃতীয় স্বভাবে, ইহা অতিশয় বিরক্তিকর সন্দেহ নাই। টাকা গুনিবার কালেই হউক অথবা পাসপোর্টের পাতা উল্টাইবার কালে, পাঠান তাহার তিনটি আঙ্গুলির অগ্রভাগ জিহ্বায় লাগাইয়া সিক্ত করিয়া লইবেই লইবে এবং গণন কালে একাধিকবার। সমগ্র আফগানিস্তানে সকলেই এই ব্যাপারে ভিন্নতা দেখাইয়াছেন বলিয়া স্মরণ করিতে পারি না, বস্তুতঃ ইহা সমগ্র আফগানিস্তানে এক রাষ্ট্রীয় প্রথাই বলা চলে। দিন দশেকের ভ্রমণে অন্ততঃ পক্ষে বার পঞ্চাশেক অথবা তাহারও অধিকবার আমাদিগের পাসপোর্ট পরীক্ষা হইয়াছে বিভিন্ন জায়গায়, প্রতি ক্ষেত্রেই বিভিন্ন পাঠানের লালারসে আমাদিগের পাসপোর্ট এর পাতা সিক্ত হইয়াছে, কোভিড কালে কি ব্যবস্থা ছিল অজানা, তবে পাসপোর্ট এর পাতায় স্যানিটাইজার স্প্রে করিয়া ইহা শুদ্ধ করিবার প্রয়াস মস্তিকে আসিলেও পাসপোর্ট বলিয়া নিজেকে নিবৃত্ত করিয়াছিলাম। আরেকটি পাঠানী স্বভাব হইলো ইহাদের নিজস্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকিবার ধৃঢ় মানসিকতা। এই বিষয়ে অল্প বয়সী হইতে অভিজ্ঞ পক্ক কেশ মুখমণ্ডলে ভারী চামড়া ও অগণিত দাগ বিশিষ্ট পাঠানের অবিকল একই রকম স্বভাব, কোনও ব্যতিক্রম দৃষ্টি গোচর হয় নাই। দুয়েক খানি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি আপনাদিগের বুঝিতে সুবিধা হইবে। কাবুলে আমাদের মধ্য বয়সী ড্রাইভার সাহেব, মোহাম্মদ এর গাড়ি চড়িয়া ঘুরিয়াছিলাম, গাড়ি চালাইবার সময় মোহাম্মদ সাহেব দৃঢ়চেতা পুরুষ, ঠিক তেমনই, রাস্তা পারাপার করা পাঠানও একই রকম দৃঢ়চেতা, সমস্যা এই খানেই, কেহই কাহারও নিজস্ব দৃঢ়তা জলাঞ্জলি প্রদান করিয়া অপরকে সুযোগ করিয়া দিতে নারাজ। যিনি রাস্তা পার হইবার সিদ্ধান্ত নিয়াছেন উনি রাস্তা একই ভাবে, একই গতিবেগ বজায় রাখিয়া দৃঢ়তার সহিত পার হইবেন আর গাড়ি চালক মোহাম্মদও একই গতিবেগে একই সরলরেখায় গাড়ি লইয়া যাইবেন, তাহাতে সংঘর্ষ প্রাণহানি ইত্যাদি পাঠানের দৃঢ়তায় ফাটল ধরাইতে পারিবে না। আমি চালকের আসনের পার্শ্বে বসিয়া অসহায় ভাবে দুই পাঠান পুরুষের দৃঢ়তা দেখিয়া চিৎকার করিয়াছি বেশ কয়েকবার কিন্তু সংশ্লিষ্ট দুই পাঠানই এই বিষয়ে নির্বিকার। যেকোনো পাঠান এর দৃঢ় বিশ্বাস, সারা দুনিয়ার বাকি সকলেই তাহাদের মতোই শক্তিশালী, আমোদ ও খাদ্য প্রিয়, আহারের পরিমাণেও তাহাদিগের একই রকম ধারণা এবং অনিবার্য ভাবেই পাঠান তাহাদের ধারণার ব্যাপারে দৃঢ়, উহাতে ফাটল ধরাইবার কোনও সুযোগ নাই। ইহা আমাদের মত দুর্বল শরীর, ক্ষুদ্র পাকস্থলী ও রোগগ্রস্ত উদর এর বাঙালির নিকট বেশ কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করিয়া তোলে। যে কারুর সহিত করমর্দন কালে যেকোনো পাঠান তাহার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়া অপরের পাঞ্জায় প্রথমে থাপ্পড় মারিবেন, অতঃপর অপর ব্যক্তির পাঞ্জা কষিয়া ধরিবেন এবং কুশল বিনিময় চলিতে থাকিবে, যাহা ইতিপূর্বে বর্ণনা করিয়াছি। বাঙ্গালীর নিকট এই করমর্দন রীতিমতো পীড়া দায়কই বটে, করমর্দনের পর মিনিট দশেক তাহার রেশ থাকিয়া যায়, আর রাস্তা ঘাটে সকলেই যখন আমাদিগের সহিত আলাপ পরিচয়ে আগ্রহী তখন এই পীড়া স্বাভাবিক ভাবেই অতীব তীব্র আকার ধারণ করিয়া লয়। আর পাঠান যদি পরিচয় কালে খানিক আবেগপ্রবণ হইয়া পড়ে, তাহা হইলে সাধু সাবধান, আপনি বাঙালি হইলে পলায়ন অবশ্য কর্তব্য, কারণ আবেগের তাড়নায় পাঠান আপনাকে আলিঙ্গন করিবেন, আর সেই বজ্র আলিঙ্গনে পাঁজরের অস্তিত্ব রক্ষা করা আপনার পক্ষে অসম্ভব হইয়া পরিবে। বস্তুত, পাঠানের সহিত আহার করাও মহা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, একজন পাঠান যে পরিমাণ আহার করিতে পারে তাহাতে আমার পরিবারের চার জন মানুষ এর অনায়াসে একবেলা উদরপূর্তি হইবে, সমস্যা হইল ওই একই, পাঠানের দৃঢ়চেতা স্বভাব, তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস এই পৃথিবীর সকলেই তাহাদের মত উদর ক্ষমতা লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, তাহারা তাই আপনাকে আহারে নিস্তার প্রদান করিবেন এই আশা করা বাতুলতা। আফগানিস্থান ভ্রমণে প্রাণহানির আশঙ্কা নাই, কিন্তু পাঠানের সহিত কোনো বাঙালি ভোজন এ বসিলে তাহার আশঙ্কা রহিয়াছে বৈ কি। বাঙ্গালীর সহিত পাঠানের একটি বিষয়ে আশ্চর্যজনক ও অদ্ভুত মিল রহিয়াছে, উভয়েরই গল্প বিলাসী, আড্ডায় তীব্র অনুরাগ এবং তা চা সহযোগে, দুই বা ততোধিক পাঠান একত্রিত হইলেই গল্পের আসর জমিয়া ওঠে, এই ব্যাপারেও সকল পাঠান একই রকম, সে যত গুরুত্বপুর্ণ কাজই হউক, গল্প করিবার গুরুত্মের কাছে তাহা নিতান্তই শিশু। সঙ্গের চিত্র খানি আপনাদিগকে পাঠানের স্বাক্ষরের নমুনা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করিবে। Explorer Shibaji দেশ বিদেশের অভিজ্ঞতা

Comments
Post a Comment