আমি অনেক বছর ধরে এই মাটিতে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বয়স যতই বাড়ে, স্মৃতি তার চেয়েও গভীর হয়। এই সময়ের মধ্যে আমি বহু প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়েছি। পাখিরা আমার ডালে বাসা বাঁধে, তাদের ছানাগুলো আমারই কোলে চোখ মেলে পৃথিবী দেখে। মৌমাছিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আমার শরীরে বাসা বানায়। ছোট পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, এমনকি কেঁচোরাও আমার শিকড়ের নিচে বাস করে। আমি তাদের আশ্রয় দিই, খাবার দিই, বাঁচার অবলম্বন দিই। তবুও আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমি কাউকে তাড়াই না বরং সবাইকে নিয়েই গর্বে বাঁচি। কারণ আমি জানি, এই পৃথিবীটা কেবল মানুষের নয়, এটা আমাদের সবার। কিন্তু তোমরা মানুষ! তোমাদের দৃষ্টি যেন শুধু নিজের প্রয়োজনেই আটকে থাকে। এত জমি, এত দালানকোটা, এত প্রযুক্তি তবুও একটা গাছের ঠাঁই রাখতে পারো না? প্রতিদিন তোমরা হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলছো, যেন গাছ কাটা একটা সাধারণ কাজ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছো, একটা গাছ কাটা মানে শুধুই কাঠ হারানো নয়? এতে একটা বাসা ভেঙে যায়, পাখি ছানা হারায়, মৌমাছি মধুর উৎস হারায়, মাটির নিচে থাকা প্রাণীরা আশ্রয় হারায়। এক গাছ কাটলে হাজার প্রাণী অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। গাছের ছায়া, পাতা, ফল, মাটির জলধারণ ক্ষমতা, বাতাস পরিশোধন এসব কিছুই একসাথে নষ্ট হয়ে যায়। তবুও মানুষ ভাবে, কেবল তার জীবনই মূল্যবান। বাকি সব প্রাণী যেন শুধুই অপ্রয়োজনীয় উপাদান। অথচ প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই আছে নিজস্ব গুরুত্ব। প্রকৃতির সাথে মিলেমিশেই তো আমাদের অস্তিত্ব টিকে আছে। জমি হয়তো কাগজে তোমরা কেনাবেচা করো কিন্তু প্রকৃতির সেই জমি কি কেবল মানুষের একার? সেই মাটি, সেই পানি, সেই বাতাস কি কেবল তোমাদের অধিকারে? আজ গাছ কাটার ফলে পৃথিবী দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে। বৃষ্টির মৌসুম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, খরা আর বন্যা বাড়ছে, পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বাতাসে অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, দূষণ বাড়ছে, মানুষও নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ, শুধু প্রকৃতি নয় তোমরাও বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়ছো নিজের অজান্তে। আজ আমাদের নিধন করছো বলে হাজারো প্রাণ হারাচ্ছে আশ্রয় আর খাবার। কিন্তু কাল হয়তো তোমরাও হারাবে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা। (কোনো এক গাছের কথা যা আমরা শুনতে পায় না!) তাই সময় এসেছে নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার। আমরা যদি একসাথে না বাঁচি তাহলে একে একে সবাইই হারিয়ে যাবো। আমাদের করণীয় হলো, একটি গাছ কাটলে অন্তত তিনটি গাছ লাগানো, ছাদে-বারান্দায়-ফাঁকা জায়গায় যতটা সম্ভব গাছ লাগানো, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই গাছ ভালোবাসতে শেখানো, গাছ কাটার আগে সরকারি অনুমতি বাধ্যতামূলক করা, বনভূমি রক্ষা ও গাছ সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা। শহরের চারপাশে সবুজ পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে প্রকৃতি ও মানুষ একসাথে বাঁচবে। গাছ কেবল কাঠ নয় এটা জীবন, এটা নিঃশ্বাস, এটা ভবিষ্যতের প্রতীক। সত্যি বলতে, গাছের জন্য একটু জায়গা বের করে নেওয়া মানে প্রকৃতিকে ভালোবাসা, নিজের আগামীকে রক্ষা করা। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি প্রাণ রক্ষা নয় বরং একটি ভবিষ্যৎ তৈরি করা। আসুন, গাছকে ভালোবাসি, বাঁচিয়ে রাখি কারণ গাছ আমাদেরই জীবনের অংশ।

Comments
Post a Comment