Skip to main content

আশুরার চেতনায় নির্মিত হোক দুঃশাসনমুক্ত সমাজ

 


আশুরা! এক হৃদয়বিদারক ইতিহাসের নাম। কারবালার প্রান্তরে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ন্যায় এবং সত্যের আত্মত্যাগের জ্বলন্ত উদাহরণ। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনটি গভীর বেদনার, একই সঙ্গে উদ্দীপনারও। এটি শুধু শোক আর স্মরণের দিন নয়; বরং এটি প্রতিবাদের, প্রতিরোধের এবং চেতনার দিন। যে চেতনা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সত্যের ঝান্ডা উঁচিয়ে ধরতে শেখায়, অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে মাথা নত না করে শহীদ হতে শিক্ষা দেয়।হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম, কারবালা প্রান্তরে নবীজি (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হুসাইন (রা.) ও তার পরিবারসহ ৭২ জন সাথি অন্যায় শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে শহীদ হন। তাদের অপরাধ ছিল একটিই, তা হলো জালিমের বায়াত না করা এবং সত্য ও ইনসাফকে সমর্থন করা। তারা রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখে গেছেন যে, সত্যের পথ কখনোই চুপ করে থাকার নয়, অন্যায়কে মেনে নেওয়া ঈমানের পরিপন্থী।

কারবালার শহীদরা আমাদের দেখিয়ে গেছেন, জীবন হারানো যায়, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যায় না। তারা আমাদের শিখিয়েছেন, শুধু ভাষণে নয়, বাস্তব জীবনে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মত্যাগ করতে হয়। আর এই শিক্ষা গ্রহণ করেই গড়ে তুলতে হবে একটি দুঃশাসনমুক্ত সমাজ।

আজকের বাস্তবতা বড়ই করুণ। বিশ্বজুড়ে অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ মানুষ দিশাহারা। শোষণ-নিপীড়নের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে অসংখ্য নিরপরাধ জনগণ। গরিব-বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার হয়ে পড়েছে কাগুজে কথা। ঠিক এমনি এক প্রেক্ষাপটেই আশুরার চেতনা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

আশুরার বার্তা হলো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। দুঃশাসন ও জুলুমের বিরুদ্ধে সত্যের আওয়াজ তোলো। হুসাইন (রা.) আত্মত্যাগ করে জানিয়ে গেছেন, ‘আমার মতো কেউ ইয়াজিদের মতো শাসকের কাছে মাথা নত করতে পারে না।’ অর্থাৎ, কোনো মুসলমানের পক্ষে জুলুমের সঙ্গে আপস করা, মুনাফেক নেতৃত্বকে সমর্থন করা বা নীরবতা পালন করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা জালিমদের প্রতি বিন্দুমাত্রও ঝুঁকো না, তাহলে আগুন তোমাদের স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ : ১১৩)

এই আয়াত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ করে, জুলুম ও দুঃশাসনের প্রতি সামান্যতম নমনীয়তাও ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ কারণেই হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ ইসলামের চেতনার এক আলোকবর্তিকা, যা যুগে যুগে অনুপ্রেরণার উৎস। আমরা যদি হুসাইনের উত্তরসূরি হতে চাই, আমাদের সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আমাদের পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইনসাফ ও আদর্শিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কারবালা শুধু শোক নয়, এটি প্রতিবাদ, চেতনা ও আদর্শিক বিপ্লবের প্রতীক।

একটি দুঃশাসনমুক্ত সমাজ গড়তে হলে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জনকল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ইসলামি চিন্তা ও চেতনার আলোকে পরিচালিত হতে হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তর। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও আল্লাহভীতি জাগাতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে হতে হবে আমানতদার, খোদাভীরু এবং জনগণের খেদমতে নিবেদিতপ্রাণ।

এখানে আশুরার শিক্ষা আমাদের পথ দেখায়। জুলুমের কাছে আত্মসমর্পণ নয়; বরং সত্য, ইনসাফ, আত্মত্যাগ ও আল্লাহভীতির ভিত্তিতে সংগ্রামই একমাত্র মুক্তির পথ। হুসাইন (রা.)-এর রক্তে লাল সেই পথই দুঃশাসনমুক্ত সমাজের একমাত্র আলো।

আসুন, আমরা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে আশুরার চেতনা বাস্তবায়ন করি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হই, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের আলো জ্বালাই। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করি। শেষ কথা হলো, আশুরা আমাদের শুধু অতীত স্মরণ নয়, বরং বর্তমান সংশোধনের ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক বাস্তব শিক্ষা। ‘আশুরার চেতনায় নির্মিত হোক দুঃশাসনমুক্ত সমাজ’—এটাই হোক আমাদের প্রত্যয়।

লেখক : মুফতি আ. জ. ম. ওবায়দুল্লাহ     ,মুহাদ্দিস, 

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...