Skip to main content

কার্ণিশগুলো নীরব

 


আমার শৈশব কেটেছে ঢাকায়। একসময় এই শহরের সকাল শুরু হতো কাকের কা কা ডাকে আর দিন শেষ হতো তাদের সারি সারি বসে থাকা দৃশ্য দিয়ে। ছাদ, বৈদ্যুতিক তার, গাছের ডাল কিংবা জানালার কার্ণিশ কাকেরা যেন সর্বত্র। সেই সময় ঢাকার চেহারায় ছিল এক প্রাকৃতিক ছন্দ আর সেই ছন্দের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কাক।

ভাত খাওয়ার পর উচ্ছিষ্ট বারান্দায় ছুড়ে দিলে মুহূর্তেই ৩-৪টি কাক উড়ে আসত। ওদের ছিল না কোনো দাবি, কেবল শহরের অব্যবস্থাপনার ভেতরেও তারা গড়ে তুলেছিল নিজস্ব ভারসাম্য। আর কাক ছিল বলেই শহরের রাস্তাঘাটে অনেক কিছু পড়ে থাকলেও দুর্গন্ধ ছড়াতো না... এক প্রকার নিঃস্বার্থ পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিল ওরা। কিন্তু সময় পাল্টেছে। ২০১৭ সালে S.S.C. শেষ করে আমি ফিরে এসেছি নিজের শহর রাজশাহীতে। মাঝে মাঝে যখন ঢাকায় যাই, সেই পরিচিত দৃশ্যটা আর দেখি না। বৈদ্যুতিক তারগুলো ফাঁকা, কার্ণিশগুলো নীরব, কাকদের কা কা ডাক যেন হারিয়ে গেছে শহরের কোলাহলের ভেতর। এটা কি শুধুই আমার চোখে ধরা পড়া একটুখানি পরিবর্তন? না, আসলে এই পরিবর্তনের পেছনে আছে অনেক গভীর কারণ। আমরা এখন যা ফেলে দিই, তা আগের মতো সাধারণ খাবার নয়। প্লাস্টিক, কীটনাশক আর রাসায়নিক মিশ্র বর্জ্যগুলো এখন কাকদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর একের পর এক গাছ কেটে, সবুজ ধ্বংস করে উঁচু দালান বানিয়ে আমরা কাকের বাসস্থানও কেড়ে নিচ্ছি। ফলাফল? শহর থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কাক। এটা শুধু পাখি হারানোর কষ্ট না, এটা আমার শৈশব হারানোর কষ্ট। আমার ছাদ, আমার বারান্দা, শহরের সেই প্রাণবন্ত সকালগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় এসে যখন দেখি ভাত ছিটিয়েও কাক আসে না তখন মনে হয় প্রবাদগুলোও যেন মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। আগে বলা হতো, "ভাত ছিটালেও কাকের অভাব হয় না", এখন তো বলতে হয় “ভাত ছিটালেও কাক দেখা যায় না”। আমরা এখন কেবল শহর সাজাচ্ছি কিন্তু তাতে প্রকৃতির কোনো স্থান রাখছি না। গাছহীন শহর, পাখিহীন সকাল এগুলো শুধু দৃষ্টিকটু না, এগুলো আমাদের অস্তিত্বেরও হুমকি। পরিবেশের ভারসাম্য, প্রাকৃতিক চক্র সব কিছুতেই কাকের মতো প্রাণীদের ভূমিকা ছিল যা আমরা ধ্বংস করছি আমাদের 'উন্নয়ন' নামের প্রতিযোগিতায়। কাকেরা চলে যাচ্ছে আর আমরা হারাচ্ছি শুধু একটা পাখি নয়, আমাদের শেকড়, আমাদের স্মৃতি আর প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ। শহরটা হয়তো আরও ঝকঝকে হচ্ছে কিন্তু মনটা কি আগের মতো পরিষ্কার আছে?

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...