নব্বইয়ের দশকে ভারত এক ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি হয়, যখন হঠাৎ করেই শকুনের সংখ্যা দ্রুত কমতে শুরু করে। তখন কেউ বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি কারণ শকুনকে তেমন প্রয়োজনীয় প্রাণী বলে মনে করা হতো না। কিন্তু এই প্রাণীগুলোর অভাবেই শুরু হয় বড় বিপর্যয়। মৃত পশুর দেহ পড়ে থাকত, যা আগে খেয়ে পরিষ্কার করে দিত শকুনেরা। ফলস্বরূপ, জীবাণুর বিস্তার ঘটে এবং বন্য কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে। এই বন্য কুকুর মানুষকে কামড়াতে শুরু করে, বাড়ে জলাতঙ্কের মতো মারাত্মক রোগ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৭ মিলিয়ন কুকুরের কামড়ের ঘটনা রেকর্ড হয় এবং মারা যায় প্রায় ৩৪,০০০ মানুষ। শুধু জনস্বাস্থ্যের দিক থেকেই ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। অনেক গবেষণার পর ২০০৩ সালে জানা যায়, গবাদি পশুর ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত ডাইক্লোফেনাক নামক ওষুধই শকুনদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। মৃত গরুর শরীরে থাকা এই ওষুধের বিষক্রিয়া শকুনের শরীরে কিডনি বিকল করে দেয় ফলে তারা মারা যেতে থাকে। তখনই ভারত সরকার পশু চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করে। এই ঘটনা সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যেসব প্রাণীকে আমরা অপ্রয়োজনীয় মনে করি, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনার প্রতিধ্বনি আজ আমরা ঢাকায় দেখতে পাচ্ছি। আজকের ঢাকা শহরে কাকের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। অথচ কাক শহরের এক অপরিহার্য বাসিন্দা, যারা প্রতিদিন রাস্তার আবর্জনা, মৃত প্রাণী খেয়ে পরিষ্কার রাখে শহরের পরিবেশ। কিন্তু গাছপালা নেই, আশ্রয়ের জায়গা নেই, তার উপর মানুষের অমানবিক আচরণ... এসব মিলিয়ে কাকও যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। আমরা হয়তো ভাবি, কাক না থাকলে কিছুই হবে না কিন্তু শকুনের মতো কাকও প্রাকৃতিক পরিষ্কারকারী। কাকের সংখ্যা কমে গেলে শহরের মৃত ইঁদুর, পচা খাবার পড়ে থাকবে যা থেকে রোগ ছড়াবে। ইতিমধ্যেই ঢাকা শহরে অজানা ভাইরাস, চর্মরোগ, অ্যালার্জি ইত্যাদির বিস্তার বেড়েছে, যার সঙ্গে এই প্রাকৃতিক পরিষ্কারকারীদের অনুপস্থিতির সম্পর্ক থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। প্রকৃতি কখনো একচেটিয়া ভালোবাসে না। প্রতিটি প্রাণী, গাছপালা থেকে শুরু করে পোকামাকড় পর্যন্ত প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই এখনই সময় আমাদের সচেতন হওয়ার। শুধু নিজেদের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও আমাদের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে, গাছ লাগাতে হবে, শিশুদের শেখাতে হবে কারণ প্রতিটি প্রাণী প্রকৃতির অংশ। সরকার এবং গবেষকদের উচিত কাকসহ পরিবেশবান্ধব প্রাণীদের নিয়ে আরও গবেষণা করা যাতে এইসব বিপদ আগেভাগে বোঝা যায়। একদিন হয়তো আমরা সবাই বুঝব... প্রকৃতি কারও ভুল ভোলে না। আজ যে প্রাণীকে তুচ্ছ ভাবছি, কাল তার অনুপস্থিতিতে হয়তো বড় বিপদের মুখে পড়ব আমরা নিজেরাই। তাই আসুন, কাককে বাঁচাই, প্রকৃতিকে বাঁচাই, নিজেকেও বাঁচাই কারণ একদিন হয়তো আমরা সবাই বুঝব "টাকা চিবিয়ে খাওয়া যায় না।" তথ্যসূত্র: Oaks et al., 2004 (Nature); Markandya et al., 2008 (Ecological Economics); Prakash et al., 2012 (PLoS One); WHO 2022 (Rabies Fact Sheet); Delhi Greens 2021; The Daily Star 2019.

Comments
Post a Comment