~কানুর গল্প~
জয়ফুল জয়
আমি যার কথা বলতে যাচ্ছি, সে ছিল আমার সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে আপন, আমার প্রাণের টুকরো, আমার পোষ্য বিড়াল ‘কানু’।
শুরুটা ২০২২ সালের আগস্ট মাসে, এক গভীর রাতে। আমাদের কারও অজান্তেই বাড়ির একটি কম ব্যবহার হওয়া ঘরের এক কোণে রাখা পুরনো বাক্সের ওপর সন্তান জন্ম দিয়েছিল একটি মা বিড়াল। সকালে হঠাৎ এক অদ্ভুত গন্ধ ও বিড়ালের উপস্থিতিতে আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি। খুঁজে দেখতে গিয়ে সেই বাক্সেই দেখতে পাই পাঁচটি নবজাতক ছানা... তার মধ্যে একজন ছিল আমার কানু।
দু’টি ছানা জন্মের পরপরই দুর্ভাগ্যজনকভাবে মারা যায়, সম্ভবত মায়ের শরীরের চাপে। বেঁচে থাকে তিনটি। আমরা ওদের নাম দিই। একজন গায়ে তুলনামূলকভাবে বড়, সাদা রঙের, তার নাম ‘বিগ শো’। একজন কালচে বাদামি-সাদা মেশানো, তার নাম ‘কেলো’। আর যার গায়ে সাদা রঙ, লেজে কালো ছোপ এবং মাথায় হালকা দাগ সে-ই ছিল আমার কানু। কেলো ও কানু ছিল হুলো (ছেলে) আর বিগ শো ছিল মেয়ে।
ছোটবেলা থেকেই কানু শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল প্রায়ই পেট খারাপ হতো। আমি ওষুধ কিনে আনতাম আর আমি ও আমার স্ত্রী মিলেই ওকে যত্ন করে ওষুধ খাওয়াতাম। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠত আবার খেলাধুলা করত। আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে তিনজন একসাথে ঘুরে বেড়াত।
কিন্তু একদিন হঠাৎ বিগ শো আর ফিরল না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল, পাশের কারো ঘরের পাশে প্রাণহীন পড়ে আছে সে, সম্ভবত কোনো কুকুর বা বন্য প্রাণীর আক্রমণে মারা গেছে। মায়ের চোখে সেই দৃশ্য এখনো জ্বলজ্বল করে কিন্তু কানু আর কেলো সেটা চোখে না দেখলেও বুঝে গিয়েছিল তাদের একজন আর নেই। ভীতু হয়ে গিয়েছিল দু'জনেই।
সময় পেরিয়ে গেল, ভয় কেটে গেল। ওরা আবার খেলতে শুরু করল। তবে খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। কারোর ভাগ কেউ কাউকে দিত না।
তারপর এক সময় এল বয়ঃসন্ধি। এই সময়টায় ওদের মধ্যকার বিভেদ আরও বাড়তে লাগল। আগে যা ছিল কেবল খাবার ঘিরে তা হয়ে উঠল সারাক্ষণের দ্বন্দ্ব। কেলো সুযোগ পেলেই কানুকে আক্রমণ করত। আমরা যতই চেষ্টা করতাম, সবসময় সামলানো সম্ভব হত না। অফিস থেকে ফিরেই প্রায়শই শুনতাম “আজ কেলো ওকে খুব মারধর করেছে।”
তারপর একদিন ঘটে গেল সেই ভয়াবহ ঘটনা! কানু উঠোনে ঘুমাচ্ছিল, এমন সময় একটি অচেনা বিড়াল এসে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে দেয়। মারপিটের সময় কানু বাইকের নিচে গিয়ে পড়ে এবং ওর বুকের ওপরে লোহার স্ট্যান্ড আঘাত করে। সেই থেকে ওর শ্বাসকষ্টের শুরু। অনেক চিকিৎসা, অনেক ওষুধ... শেষ পর্যন্ত ও কিছুটা সুস্থ হলেও হাঁপানি তার চিরসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৪ সালের শীতে কানু প্রচণ্ড কষ্ট পায়। খেতেও পারে না, ঘুমাতে পারে না। অবশেষে ডাক্তার দেখিয়ে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। কানুর মুখের কষ্ট দেখলে চোখের জল ধরে রাখা যায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে সে আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। আবার হাঁটাহাঁটি শুরু করে, খিদে ফিরে আসে, শরীর-স্বাস্থ্যও একটু একটু করে ভালো হতে থাকে।
২০২৫ সালের ৫ জুন। সন্ধ্যা নাগাদ হঠাৎ কানু বাইরে বেরিয়ে যায়। শরীর দুর্বল হওয়ায় ও বাইরে গেলে আমরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতাম। সেদিনও দেরিতে ঘরে ফেরে। রাতে দুবার বমির চেষ্টা করে কিন্তু অন্যকিছু নয়। পরদিন সকালেও একটু বেশি খায়, দেখে মনে হয় সব ঠিক।
কিন্তু দুপুর থেকে কানু আবার হাঁপাতে শুরু করে। একাধিক ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেও কাউকে বাসায় আনতে পারিনি। শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে ওকে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হয়নি। যেন এক অসহায় বাবার চোখের সামনে নিজের সন্তানের ধুকধুকানি দেখা ছাড়া আর কিছু করার উপায় ছিল না।
৮ জুন। আমি নেবুলাইজারের ব্যবস্থা করতে বের হই। ঠিক তখনই কানু দৌড়ে এসে ঘরের সেই একান্ত প্রিয় কোনায় চলে যায়। আমাদের কিছু বলতে চায়, কিন্তু আর বলা হয়ে ওঠে না...
ও আমার সামনেই স্থির হয়ে যায়। এক লহমায় মনে হল, আমার প্রাণটা যেন আমার চোখের সামনেই থেমে গেল। আমি জানি, সেই অনুভব আর কখনো আমার জীবনে পূর্ণ হবে না। আমার হৃদয়ের এক অংশ চিরতরে নিঃশেষ হয়ে গেল।
কানু, আমার প্রিয়...
তুই যেখানেই থাকিস না কেন, ভালো থাকিস।
তোর জন্য মন কাঁদে... সবসময়।collected
.jpg)
Comments
Post a Comment