বৃটেনের রাজা তৃতীয় জর্জ বিশেষ দূত পাঠিয়েছে চীনে। সাথে পাঠালো তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কিছু বৃটিশ প্রযুক্তি - ঘড়ি, টেলিস্কোপ, রাইফেল, শিল্প কারখানায় উৎপাদিত কাপড় ইত্যাদি। উদ্দেশ্য একটাই। চীন যেন ইংল্যান্ডের সাথে বাণিজ্য উন্মুক্ত করে। রাজা কিয়ানলং সেই দ্রব্যাদি দেখলেন। সেই সময় চীনের জিডিপি ছিল বিশ্বে সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী সকল রাষ্ট্রের চেয়ে সে ছিল জ্ঞান, অর্থনীতি ও ক্ষমতায় যোজন যোজন এগিয়ে।
তাই চিঠির উত্তরে লিখে পাঠালো, “আপনি বহু সাগর পার হয়ে আমাদের সভ্যতার সুফল ভোগের জন্য প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন; এই বিনয় প্রশংসনীয়।
কিন্তু আমাদের সাম্রাজ্যে ‘আকাশের নিচের সমস্ত কিছুই আছে’—বিদেশী কারিগরি বস্তুর কোনো প্রয়োজন নেই।"
সব মিলিয়ে চীনের রাজা বৃটেনের সক্ষমতাকে পরিমাপ করতে ব্যার্থ হয়। তার ফলাফল সে ৪৬ বছর পরে পায় প্রথম আফিম যুদ্ধে।
এই জাতীয় ঘটনার জন্য চীন মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ইংল্যান্ডের স্টিল জাহাজ ও ইঞ্জিনের সামনে চীনের নেভি যেন কাগজের বাঘের মত গুড়িয়ে যায়। শত বছরের দম্ভ এক পলকে পানি। তাতেই শেষ না। এই ঘটনার ফল হিসেবে তাকে একটি অপমানজনক চুক্তি করতে হয়। যুদ্ধের যত খরচ হয়েছে সব চীনকে দিতে হবে। হংকং লিজ দিতে হবে এবং বৃটেনের একজন ব্যক্তি যা কিছুই করুক না কেন তার বিচার চীন করতে পারবে না। করবে ইংল্যান্ড।
যেই জাতি নিজেকে কখনও অদ্বিতীয় দেখেনি তার জন্য এমন চুক্তি ছিল মাথা কাটা যাবার মতন অপমানজনক। সাথে সাথে চীনের ভিতরে আলোচনা শুরু হয় যে কেন আমরা হেরে গেলাম। কীভাবে সামনে আগাবো?
রাজা সংস্কার কমিটি গঠন করলো। একজন বলল আমাদের গণিত চর্চা করতে হবে। বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া মোকাবেলা করা সম্ভব না। আরেক পক্ষ বলে আমি ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি। পৃথিবীতে সেই সফল হয়েছে যে সুশাসন করেছে। তাই আমাদের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তখন পর্যন্ত চীন দ্বিধাবিভক্ত। এত মহান ঐতিহ্য ফেলে বিদেশী কিছু গ্রহণ করবে নাকি নিজেদের রাস্তাতেই তাদেরকে মোকাবেলা করবে?
সেই দ্বিধা বেশিদিন টিকেনি। দশ বছরের মধ্যেই আবার পরাজিত হয় চীন দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে। এবারে চুক্তি আরও অপমানজনক। আফিম বিক্রির বৈধতা দিতে হবে, মিশনারি কার্যক্রম করতে দিতে হবে, তৎকালীন সময়ে ৮ মিলিয়ন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্পূর্ণ চীনা জাতি বিপর্যস্ত।
সাথে সাথে সে শুরু করে আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি অর্জন এর যাত্রা। তবে চাইলেই কি তা এত সহজে অর্জন করা যায়? শত বাধা, গৃহ যুদ্ধ ও বিদেশী আক্রমণ চলতে থাকলো। তাছাড়া নিজেদের এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছেড়ে অন্যের জিনিস শেখা অনেকটা মাথা নত করার মতন ব্যাপারও বটে।
তারপরেও গুটি গুটি পায়ে সেই দিকেই যাত্রা শুরু করে।
চীন থেকে বহু দূরে অবস্থিত আরেকটি আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী রাজ্য ছিল ওসমানীয়। হটাত তারা আবিষ্কার করলো সাম্রাজ্য ছোট হয়ে আসছে। একের পর এক যুদ্ধে কেবল হেরেই যাচ্ছে ঘটনা কী?
ঘটনা যতদিনে আবিষ্কার করা হয়েছে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এবারেও সমস্যা বিজ্ঞান। কিন্তু নিজেদের মহান ঐতিহ্য ছেড়ে কি অন্যের শিক্ষা নেওয়া যায়? এই দোটানায় যেতে যেতে এক পর্যায়ে মেনে নিতে বাধ্য হয় ওসমানিয়া।
বলা যায় চীনে সমসাময়িক তারাও উঠে পড়ে লাগে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায়।
প্রায় ১৭৫ বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু তারা উভয়ে এখন বানাচ্ছে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমান, অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ, গাড়ি, ক্যামেক্যাল, মেশিনারিজ, জেট ইঞ্জিন ও অন্যান্য শিল্প পণ্য। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র এখন তারা সেইটা আমরা জানি কিন্তু ইতিহাস কত পুরাতন তা জানি না।
যেভাবে দেখেন আজকের দুনিয়া তার কোনটা জাদু না। কিছু জিনিস আসলে আগে বা পরে শিখতেই হবে। তাই যত আগে শেখা যায় তত লাভ।
উদাহরণস্বরূপ ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত জাপান ছিল সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি রাষ্ট্র। কিন্তু সেই বছর তারা দেখলো একটি আমেরিকান স্টিল ও ইঞ্জিনের জাহাজ। তাদের সমুদ্র তীরে। কেউ যুদ্ধ করলো না। কিন্তু তারা চিন্তিত হয়ে আলোচনা করলো। তারপর বলল, এই আধুনিক বস্তুর সাথে আমরা পারবো না। তাই বাণিজ্য উন্মুক্ত করে তাদের থেকে শিখি। ফলাফল এখন পর্যন্ত জাপানের প্রযুক্তি এদের থেকে এগিয়ে আছে। যেমন এগিয়ে আছে জার্মান ও আমেরিকান প্রযুক্তি। জি, বর্তমানে বিশ্বে যা দেখছেন তা অতীতের প্রতিচ্ছবি বটে। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম জাতির দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা করা উচিৎ।
মোহাইমিন পাটোয়ারী
Comments
Post a Comment