Skip to main content

‘আকাশের নিচের সমস্ত কিছুই আছে’

 


সালটা ছিল ১৭৯৩।

বৃটেনের রাজা তৃতীয় জর্জ বিশেষ দূত পাঠিয়েছে চীনে। সাথে পাঠালো তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কিছু বৃটিশ প্রযুক্তি - ঘড়ি, টেলিস্কোপ, রাইফেল, শিল্প কারখানায় উৎপাদিত কাপড় ইত্যাদি। উদ্দেশ্য একটাই। চীন যেন ইংল্যান্ডের সাথে বাণিজ্য উন্মুক্ত করে। রাজা কিয়ানলং সেই দ্রব্যাদি দেখলেন। সেই সময় চীনের জিডিপি ছিল বিশ্বে সর্বোচ্চ। প্রতিবেশী সকল রাষ্ট্রের চেয়ে সে ছিল জ্ঞান, অর্থনীতি ও ক্ষমতায় যোজন যোজন এগিয়ে। তাই চিঠির উত্তরে লিখে পাঠালো, “আপনি বহু সাগর পার হয়ে আমাদের সভ্যতার সুফল ভোগের জন্য প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন; এই বিনয় প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের সাম্রাজ্যে ‘আকাশের নিচের সমস্ত কিছুই আছে’—বিদেশী কারিগরি বস্তুর কোনো প্রয়োজন নেই।" সব মিলিয়ে চীনের রাজা বৃটেনের সক্ষমতাকে পরিমাপ করতে ব্যার্থ হয়। তার ফলাফল সে ৪৬ বছর পরে পায় প্রথম আফিম যুদ্ধে। এই জাতীয় ঘটনার জন্য চীন মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ইংল্যান্ডের স্টিল জাহাজ ও ইঞ্জিনের সামনে চীনের নেভি যেন কাগজের বাঘের মত গুড়িয়ে যায়। শত বছরের দম্ভ এক পলকে পানি। তাতেই শেষ না। এই ঘটনার ফল হিসেবে তাকে একটি অপমানজনক চুক্তি করতে হয়। যুদ্ধের যত খরচ হয়েছে সব চীনকে দিতে হবে। হংকং লিজ দিতে হবে এবং বৃটেনের একজন ব্যক্তি যা কিছুই করুক না কেন তার বিচার চীন করতে পারবে না। করবে ইংল্যান্ড। যেই জাতি নিজেকে কখনও অদ্বিতীয় দেখেনি তার জন্য এমন চুক্তি ছিল মাথা কাটা যাবার মতন অপমানজনক। সাথে সাথে চীনের ভিতরে আলোচনা শুরু হয় যে কেন আমরা হেরে গেলাম। কীভাবে সামনে আগাবো? রাজা সংস্কার কমিটি গঠন করলো। একজন বলল আমাদের গণিত চর্চা করতে হবে। বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া মোকাবেলা করা সম্ভব না। আরেক পক্ষ বলে আমি ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি। পৃথিবীতে সেই সফল হয়েছে যে সুশাসন করেছে। তাই আমাদের সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তখন পর্যন্ত চীন দ্বিধাবিভক্ত। এত মহান ঐতিহ্য ফেলে বিদেশী কিছু গ্রহণ করবে নাকি নিজেদের রাস্তাতেই তাদেরকে মোকাবেলা করবে? সেই দ্বিধা বেশিদিন টিকেনি। দশ বছরের মধ্যেই আবার পরাজিত হয় চীন দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে। এবারে চুক্তি আরও অপমানজনক। আফিম বিক্রির বৈধতা দিতে হবে, মিশনারি কার্যক্রম করতে দিতে হবে, তৎকালীন সময়ে ৮ মিলিয়ন ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এমন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্পূর্ণ চীনা জাতি বিপর্যস্ত। সাথে সাথে সে শুরু করে আধুনিক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি অর্জন এর যাত্রা। তবে চাইলেই কি তা এত সহজে অর্জন করা যায়? শত বাধা, গৃহ যুদ্ধ ও বিদেশী আক্রমণ চলতে থাকলো। তাছাড়া নিজেদের এত সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছেড়ে অন্যের জিনিস শেখা অনেকটা মাথা নত করার মতন ব্যাপারও বটে। তারপরেও গুটি গুটি পায়ে সেই দিকেই যাত্রা শুরু করে। চীন থেকে বহু দূরে অবস্থিত আরেকটি আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী রাজ্য ছিল ওসমানীয়। হটাত তারা আবিষ্কার করলো সাম্রাজ্য ছোট হয়ে আসছে। একের পর এক যুদ্ধে কেবল হেরেই যাচ্ছে ঘটনা কী? ঘটনা যতদিনে আবিষ্কার করা হয়েছে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এবারেও সমস্যা বিজ্ঞান। কিন্তু নিজেদের মহান ঐতিহ্য ছেড়ে কি অন্যের শিক্ষা নেওয়া যায়? এই দোটানায় যেতে যেতে এক পর্যায়ে মেনে নিতে বাধ্য হয় ওসমানিয়া। বলা যায় চীনে সমসাময়িক তারাও উঠে পড়ে লাগে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায়। প্রায় ১৭৫ বছর পার হয়ে গেছে কিন্তু তারা উভয়ে এখন বানাচ্ছে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বিমান, অত্যাধুনিক যুদ্ধ জাহাজ, গাড়ি, ক্যামেক্যাল, মেশিনারিজ, জেট ইঞ্জিন ও অন্যান্য শিল্প পণ্য। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র এখন তারা সেইটা আমরা জানি কিন্তু ইতিহাস কত পুরাতন তা জানি না। যেভাবে দেখেন আজকের দুনিয়া তার কোনটা জাদু না। কিছু জিনিস আসলে আগে বা পরে শিখতেই হবে। তাই যত আগে শেখা যায় তত লাভ। উদাহরণস্বরূপ ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত জাপান ছিল সম্পূর্ণ আবদ্ধ একটি রাষ্ট্র। কিন্তু সেই বছর তারা দেখলো একটি আমেরিকান স্টিল ও ইঞ্জিনের জাহাজ। তাদের সমুদ্র তীরে। কেউ যুদ্ধ করলো না। কিন্তু তারা চিন্তিত হয়ে আলোচনা করলো। তারপর বলল, এই আধুনিক বস্তুর সাথে আমরা পারবো না। তাই বাণিজ্য উন্মুক্ত করে তাদের থেকে শিখি। ফলাফল এখন পর্যন্ত জাপানের প্রযুক্তি এদের থেকে এগিয়ে আছে। যেমন এগিয়ে আছে জার্মান ও আমেরিকান প্রযুক্তি। জি, বর্তমানে বিশ্বে যা দেখছেন তা অতীতের প্রতিচ্ছবি বটে। তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে মুসলিম জাতির দ্রুত সঠিক পরিকল্পনা করা উচিৎ। মোহাইমিন পাটোয়ারী

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...