Skip to main content

কুকুর, বিড়াল আর পাখিদের একটা মিল

 


কুকুর, বিড়াল আর পাখিদের একটা মিল কোথায় জানেন? এরা সবাই নিজের এলাকা নিয়ে বেশ গর্বিত! মানে এমন ভাব, যেন এই দুনিয়ার মালিক ওরাই। হুট করে আপনি যদি তাদের রাজত্বে আরেকটা নতুন প্রাণী বা বন্ধু এনে হাজির করেন তাহলে শুরু হয়ে যাবে ভেতরে ভেতরে ঠান্ডা যুদ্ধ! কুকুর হয়তো ভাববে “এই নতুন মুখটা কে? আমার এলাকা দখল করতে এসেছে নাকি?”, আর শুরু করবে ঘেউ ঘেউ করে সিগন্যাল দেওয়া। বিড়াল তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না, নতুন কারও গন্ধ পেলে এমন মুখ বানায় যেন চরম অপমানিত হয়েছে। ওদিকে পাখিরা ছোট হলেও দামি! ডানা ছড়িয়ে, গলা ছেড়ে ডাক দিয়ে জানিয়ে দেয়, “ভাই! এ জায়গা আমার!”

এই বিষয়টাকে বিজ্ঞানীরা বলেন Territorial Behavior, যা প্রাণীদের প্রাকৃতিক, জেনেটিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যের একটা অংশ। যেমন Cornell University College of Veterinary Medicine গবেষণায় বলেছে, বাইরের প্রাণীর গন্ধ বা উপস্থিতি অনেক বিড়ালের মাঝে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা স্ট্রেসের মূল কারণ। কুকুরদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা আলাদা নয়। এরা চিরকালই পাহারাদার প্রকৃতির। American Kennel Club (AKC) এর তথ্য অনুযায়ী, অনেক কুকুর ছোটবেলা থেকেই সামাজিকরণ না পেলে পরবর্তীতে নতুন প্রাণীর আগমনে খুব বেশি টেরিটোরিয়াল ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। কুকুর নতুন প্রাণীকে দেখে ঘেউ ঘেউ করে, তার শরীরের গন্ধ শুকে বা নিজের জায়গা চিহ্নিত করে প্রস্রাব দিয়ে। এটা আসলে কুকুরের পক্ষ থেকে একটা ঘোষণা: “এই জায়গাটা আমার!” এতে যদি আপনি না বোঝেন তাহলে কুকুরটির মধ্যে ভয়, প্রতিযোগিতা এমনকি আক্রমণাত্মক আচরণও দেখা দিতে পারে। বিড়ালদের টেরিটোরিয়াল স্বভাব একটু ভিন্ন ধরণের। ওরা আক্রমণাত্মক না হয়ে বরং একধরনের অভিমান করে। যেমন ওরা ঘরের এক কোণে গিয়ে লুকিয়ে থাকে, নতুন প্রাণীর গন্ধ পেলে ঘরেই চিহ্ন রেখে যায় এমনকি কারও দিকে তাকিয়ে হিস বা ফোঁস শব্দ করে। Journal of Feline Medicine and Surgery (2015) অনুসারে, বিড়ালেরা এলাকা নিয়ে খুবই সংবেদনশীল এবং নতুন প্রাণীর কারণে তাদের স্বাভাবিক রুটিন বদলে গেলে মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হতে পারে। পাখিদের অনেকে মনে করেন ছোট বলে ওদের এধরনের আচরণ কম হবে। কিন্তু আসলে Birdlife International ও The Spruce Pets অনুযায়ী, বিশেষ করে টিয়া, বাজ বা চিল, লাভবার্ড বা ককাটেল প্রজাতির পাখিদের মধ্যে টেরিটোরিয়াল আচরণ বেশ প্রকট হয়। ওরা ডানা ছড়িয়ে হুমকি দেয়, খাঁচার কোণ কামড়ে দেয় বা জোরে জোরে ডেকে আপনাকে জানিয়ে দেয় “আমার জায়গায় কেউ আসবে না!” তাহলে কী করবেন? নতুন প্রাণী আনলে আগের প্রাণীর জায়গা কেড়ে না নিয়ে ধীরে ধীরে পরিচয় করাতে হবে। প্রথমে আলাদা ঘরে রাখুন, তারপর গন্ধের মাধ্যমে পরিচয় করান। এরপর খাঁচা বা দরজার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টির আদান-প্রদান, তারপর একসাথে খাওয়ানো। ASPCA (American Society for the Prevention of Cruelty to Animals) এর গাইডলাইন বলছে, প্রাণীদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি করতে গেলে "সময়, ধৈর্য আর পরিকল্পনা" এই তিনটি জিনিস একসাথে কাজ করতে হয়। কেউই চায় না তার এলাকা হুট করে অন্য কেউ দখল করে বসুক! আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, কিছুদিন আগে আমি নতুন একটি বিড়াল বাসায় এনেছিলাম। কিন্তু তখন আমার বাসায় আগে থেকেই অনেকগুলো বিড়াল ছিল। ভাবলাম, সবাই একসাথে থাকবে, খাবে, ঘুমাবে কিন্তু বাস্তবতা ছিল ঠিক উল্টো। নতুন আসা বিড়াল আর আগেরগুলো যেন একে অপরের চরম শত্রু! দিনরাত হিস-হিস, পেছন থেকে থাবা মারা এমনকি মুখোমুখি হয়ে মারামারিতে জড়ানোর চেষ্টা। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। ধীরে ধীরে আমি একে অপরের গন্ধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম, একটার কম্বল অন্যটার কাছে রাখলাম, খেলনা একে অপরের ঘরে রাখলাম। এরপর আমি নিজে সামনে দাঁড়িয়ে তাদের একসাথে খাওয়াতে শুরু করলাম যাতে তারা বুঝতে পারে “এই জায়গায় কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী না।” ধৈর্য, সময় আর ভালোবাসা দিয়ে আমি ধাপে ধাপে ওদের একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করালাম। আজ তাদের দেখে মনে হয় না কোনোদিন ঝগড়া হয়েছিল! ওরা এখন এমন বন্ধু যে একসাথে খেলাধুলা করে, জানালার পাশে বসে বাইরে তাকায় আর ঘুমায়ও পাশাপাশি। অনেকটা ছোট ভাইবোনের মতো! তখনই আমি বুঝলাম... প্রাণীদের শুধু খাওয়াদাওয়া দিলেই হয় না, তাদের জায়গা দিতে হয়, সময় দিতে হয়। তাহলেই ওরা শুধু স্বস্তি না, আমাদের জীবনে নিখাদ ভালোবাসাও ফিরিয়ে দেয়। 📚 রেফারেন্স তালিকা: * Cornell University College of Veterinary Medicine – “Feline Stress and Behavior Management.” https://www.vet.cornell.edu * American Kennel Club (AKC) – “Territorial Dog Behavior: Causes and Solutions.” https://www.akc.org * Journal of Feline Medicine and Surgery, 2015 – “Stress in Cats: Behavioral and Medical Signs.” https://journals.sagepub.com/home/jfm * Birdlife International – “Behavioral Ecology of Parrots and Other Pet Birds.” https://www.birdlife.org * ASPCA (American Society for the Prevention of Cruelty to Animals) – “Introducing New Pets.” https://www.aspca.org * The Spruce Pets – “Understanding Parrot Territorial Aggression.” https://www.thesprucepets.com

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...