বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য এক সময় ছিল অগাধ ও অপার। নদী-নালা, খাল-বিল, বন-জঙ্গল মিলিয়ে এই দেশ ছিল হাজারো পাখির নিরাপদ আবাসভূমি। আমাদের দেশের অধিকাংশ পাখি গাছেই বসবাস করে। তারা গাছেই বাসা বাঁধে, ছায়ায় আশ্রয় নেয়, গাছের ফল-মূল খেয়ে বেঁচে থাকে এবং ঝড়-বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেয় গাছের ঘন ডালপালায়। গাছ মানেই পাখিদের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভয়াবহ। নির্বিচারে গাছ কাটা, নগরায়ন এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সেই নিরাপদ আশ্রয় এখন চরম হুমকির মুখে। বর্তমানে বাংলাদেশে যেভাবে উন্নয়নের নামে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে তা আমাদের পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শুধুমাত্র একটি পূর্ণবয়স্ক গাছই ৫০ থেকে ১০০টির বেশি পাখির আবাসস্থল হতে পারে। আপনি যখন একটি গাছ কাটছেন, তখন হয়তো বুঝতেই পারছেন না আপনি কতগুলো ছোট জীবনের ঘর এক সঙ্গে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। আজ ঢাকার মেট্রোরেল বা ফ্লাইওভার প্রকল্পের নির্মাণের জন্য হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। প্রতিস্থাপন কার্যক্রম খুবই দুর্বল। ফলে শহরজুড়ে আগে যেসব এলাকায় সকালবেলা পাখির কিচিরমিচির শোনা যেত, আজ সেখানে কেবল যানবাহনের কোলাহল। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটির মতো পার্বত্য এলাকাগুলোতেও গাছ কেটে বসতি গড়ার সংখ্যা বাড়ছে। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের স্থানীয় প্রজাতির অনেক পাখি তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা শহরের দিকে চলে আসে, যেখানে তারা টিকে থাকতে পারে না। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় চিংড়ি চাষের জন্য বনভূমি উজাড় করা হচ্ছে, এতে জলাভূমি নির্ভর পাখিদের অস্তিত্ব হুমকিতে পড়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকায় পাখির সংখ্যা আগের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ হলো ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার তাজমহল রোড। কিছু বছর আগেও সেখানে রাস্তাঘেঁষা বড় বড় গাছে দোয়েল, শালিক, চড়ুইসহ নানা পাখি বাস করত। কিন্তু উন্নয়নের নামে গাছগুলো কেটে ফেলার পর সেই চেনা কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। এমন দৃষ্টান্ত দেশের প্রতিটি শহরে, এমনকি গ্রামাঞ্চলেও বাড়ছে। এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে বেশ কিছু গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদন। ২০২৩ সালে বন অধিদপ্তর জানায়, গত এক দশকে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি প্রায় ১০% হ্রাস পেয়েছে। ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)’ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে—নগরায়নের চাপ ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পের ফলে দেশের ৪০% পাখি প্রজাতি তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাতে বসেছে। The Daily Star পত্রিকার একটি প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, “Urban Expansion Threatens Bird Habitats,” যেখানে শহরাঞ্চলের গাছ কাটার ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরা হয়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা ও জনসচেতনতা। তবে হ্যাঁ আমাদের উন্নয়ন দরকার কিন্তু সেটি হতে হবে পরিকল্পিত এবং পরিবেশবান্ধব। প্রতিটি কাটা গাছের বদলে অন্তত তিনটি গাছ রোপণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। শহর ও গ্রামে পাখিদের জন্য নিরাপদ ‘গ্রিন জোন’ তৈরি করতে হবে, যেখানে গাছ সংরক্ষণ ও নতুন গাছ লাগানোর উদ্যোগ থাকবে। স্থানীয় মানুষদেরকেও সচেতন করতে হবে যেন তারা গাছ কাটার আগে ভাবেন—এই গাছটি হয়তো কোনো পাখির পরিবারের একমাত্র ঠিকানা। আমরা যদি সত্যিই চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙার আনন্দ উপভোগ করতে পারে তাহলে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। পাখিরা প্রকৃতির সৌন্দর্য, গাছ তাদের ঘর। সেই ঘর রক্ষা করলেই প্রকৃতি বাঁচবে, বাঁচবে আমাদেরও অস্তিত্ব।

Comments
Post a Comment