আপনার প্রিয় বিড়ালটি প্রতিদিন খেলাধুলা করছে, স্বাভাবিকভাবে খাচ্ছে এবং ঘুমাচ্ছে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকা একেবারেই যথেষ্ট নয়। কারণ অনেক সময়ই বিড়ালদের ভিতরে এমন কিছু শারীরিক সমস্যা তৈরি হতে থাকে যা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর ও নীরব ঘাতক হলো হৃদরোগ (Heart Disease)। বিশেষ করে Hypertrophic Cardiomyopathy (HCM) নামক একটি রোগ যা বিড়ালের হৃদপেশিকে পুরু করে তোলে এবং রক্ত সঞ্চালনের ব্যাঘাত ঘটায়। Cornell University College of Veterinary Medicine-এর এক গবেষণায় জানা যায়, অনেক সুস্থ বিড়াল হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যার আগে কোনো লক্ষণও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। এই রোগটির সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো, এটি সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং উপসর্গ না থাকার কারণে অনেক মালিকই শেষ মুহূর্তে বুঝতে পারেন যখন আর কিছু করার থাকে না। তবে হৃদরোগ প্রতিরোধ একেবারে অসম্ভব নয়। সঠিক যত্ন ও জীবনধারা অনুসরণ করলে বিড়ালের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এর জন্য প্রথমে গুরুত্ব দিতে হবে উচ্চ মানের লো-কার্ব ডায়েট বা খাদ্যাভ্যাসে। বিড়াল মূলত obligate carnivore অর্থাৎ তাদের শরীরের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম কার্বোহাইড্রেট এবং উচ্চ মানের প্রাণিজ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য তাদের হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অনেক কমার্শিয়াল ক্যাট ফুডেই অপ্রয়োজনীয় ফিলার হিসেবে ভুট্টা, গম বা অন্যান্য শস্যজাতীয় উপাদান থাকে যা বিড়ালের জন্য ক্ষতিকর। এসব উপাদান থেকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ তৈরি হয়ে শরীরে চর্বি জমে এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলে। এভাবে হৃদপিণ্ডে চাপ পড়ে এবং ধীরে ধীরে হৃদরোগ তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ Taurine না থাকলে বিড়ালে Dilated Cardiomyopathy দেখা দিতে পারে যা মারাত্মক প্রাণঘাতী। তাই খাবার কেনার সময় অবশ্যই লেবেল পড়ে দেখুন যাতে লেখা থাকে “grain-free”, “high in protein” এবং “taurine enriched”। এরপর আসে বিড়ালের শারীরিক ব্যায়াম ও খেলাধুলা। অনেকেই মনে করেন, ঘরের ভিতরে থাকা বিড়ালের আলাদা করে খেলাধুলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো অবসাদগ্রস্ততা, ওজন বৃদ্ধি এবং স্ট্রেস এই তিনটি বিষয় একত্রে একটি বিড়ালের হৃদরোগের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। খেলাধুলা বিড়ালের রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে, হৃদস্পন্দন সঠিক রাখে এবং মানসিক চাপ কমায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিটের খেলাধুলা বিড়ালের হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। আপনি চাইলে ছোট একটি বল, ফেদার স্টিক বা লেজার লাইট দিয়ে সহজেই এই খেলাধুলা নিশ্চিত করতে পারেন। এটি শুধু একটি আনন্দের মাধ্যম নয় বরং একটি জীবনরক্ষাকারী অভ্যাস। তবে খাদ্য এবং ব্যায়ামের পাশাপাশি নিয়মিত ডিওয়ার্মিং এবং ভেটের সাথে পরামর্শ করাও অত্যন্ত জরুরি। পেটের কৃমি বা পরজীবী বিড়ালের রক্তে এমন বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে দেয় যা হৃদপিণ্ডের ওপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। এর ফলে রক্তচাপ বাড়ে, হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি মারাত্মক হৃদরোগে রূপ নেয়। তাই প্রতি ৩ থেকে ৪ মাস অন্তর বিড়ালকে ডিওয়ার্মিং করানো এবং প্রতি ৬ মাস অন্তর একজন অভিজ্ঞ ভেটের মাধ্যমে পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। যদি আপনার বিড়াল হঠাৎ করে হাঁপাতে শুরু করে, পেছনের পা দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা বেশি ঘুমাতে শুরু করে তাহলে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ইকোকার্ডিওগ্রাফি বা ইসিজি করিয়ে নিতে হবে। কারণ এ ধরণের লক্ষণগুলো অনেক সময় হৃদরোগের প্রাথমিক ইঙ্গিত দিতে পারে। সহজ ভাষায় বললে, হৃদরোগ বিড়ালের এক নীরব শত্রু। তবে সচেতনতা, যত্ন ও ভালোবাসা দিয়ে এই শত্রুকে দূরে রাখা সম্ভব। আপনি যদি শুরু থেকেই বিড়ালের খাদ্য, খেলাধুলা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে সচেতন হন তাহলে অনেক বিপদকেই সহজে ঠেকানো সম্ভব। মনে রাখবেন! একটি ছোট সিদ্ধান্ত যেমন খাবার পরিবর্তন বা নিয়মিত চেকআপ আপনার প্রিয় সঙ্গীটির জীবন বাঁচাতে পারে। তাই আজ থেকেই সচেতন হোন আর আপনার বিড়ালকে দিন এক দীর্ঘ, সুস্থ ও সুখী জীবন। রেফারেন্স: * Cornell University College of Veterinary Medicine – “Feline Hypertrophic Cardiomyopathy” * Journal of Feline Medicine and Surgery – “Nutritional factors in feline heart disease” * European College of Veterinary Internal Medicine (ECVIM) – “Exercise and cardiac function in domestic cats” * American Veterinary Medical Association (AVMA) – “Feline heart health and parasitic risks”
.jpg)
Comments
Post a Comment