Skip to main content

সিজোফ্রেনিয়া


 তাসনিয়া যখন কলেজ থেকে শীতের ছুটিতে বাড়ি ফেরে, সে এক অচেনা মানুষকে দেখে।

তিনি ছিলেন তার বাবা—নাজমুল সাহেব (ছদ্মনাম)—যিনি একসময় গ্রামের প্রিয় শিক্ষক, ধর্মপ্রাণ মানুষ, আর মেয়েদের জন্য ছিলেন এক গর্বিত অভিভাবক। কিন্তু সেই ছুটিতে, বাবার চোখে ছিলো অস্থিরতা। তিনি হঠাৎ রেগে যাচ্ছেন, মানুষকে সন্দেহ করছেন, এমনকি নামাজের মাঝখানে চিৎকার করে উঠছেন—"সবাই আমার বিরুদ্ধে!" রাতে একা একা কথা বলছেন, আবার মাকে সন্দেহ করছেন। একদিন তাসনিয়াকে পর্যন্ত বলেন— “তুই আমার মেয়ে না। তুই ওদের এজেন্ট।” এই কথাগুলো যেন একটা তীব্র ছুরি হয়ে বিঁধে গিয়েছিলো তাসনিয়ার মনে। সে বুঝে গিয়েছিল, এই মানুষটা তার চেনা বাবা নন। কিন্তু সে এটাও জানত না, এটা কী হচ্ছে। মায়ের মুখে ভয়, ছোট বোনেরা কিচ্ছু বুঝে না, আর পুরো বাড়ি জুড়ে তৈরি হয় এক নিঃশব্দ আতঙ্ক। বাবার স্কুল থেকেও অভিযোগ আসে—আচরণগত সমস্যার জন্য ছুটি দেওয়া হয় তাকে। তাসনিয়ার মনে হতে থাকে, তারা হয়তো সমাজের চোখে ‘সমস্যার পরিবার’ হয়ে উঠবে। সব শোনার পর মিস রুকাইয়া (ছদ্মনাম) বললেন, “তাসনিয়া, এটা হয়তো তোমার বাবার দোষ না। এটা হতে পারে স্কিজোফ্রেনিয়া নামের একটি মানসিক অসুস্থতা। এতে মানুষ বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যায়, বিভ্রান্তি তৈরি হয়, সন্দেহে ভোগে। কিন্তু এটা চিকিৎসাযোগ্য।” এই কথা শোনার পর তাসনিয়া গুগলে খোঁজ করতে শুরু করে। জানে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে: “বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষ স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। বাংলাদেশেও অনেক মানুষ এই রোগে ভুগলেও, সামাজিক অপবাদ আর ভয়ের কারণে চিকিৎসা নিতে ভয় পান।” এই পরিস্থিতি শুধু রোগীর নয়, পরিবারেও তৈরি করে এক ভয়াবহ মানসিক চাপ। একজন প্রিয় মানুষ ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এমন অসুখ একদিকে যেমন মানুষের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে, তেমনি সমাজের চোখে তাকে এক ‘ঝামেলার মানুষ’ বানিয়ে তোলে। তাসনিয়া হাল ছাড়েনি। সে মাকে বোঝায়, সে ইউটিউব, গুগোল করে লাইফস্প্রিং-এর ভিডিও খুঁজে পায়। বেশ কিছু ভিডিও দেখার পরে তাসনিয়া সাহস পায়, ভরসা পায় এবং মা'কেও সাহস দেয় একটু কথা বলার জন্য। মা যোগাযোগ করেন আমাদের সাথে, অনলাইনে ঘরে বসেই। সিজোফ্রেনিয়া অন্য আর শারীরিক রোগের মতোই একটি মানসিক স্বাস্থ্যজনিত অসুখ, যার সঠিক চিকিৎসা রয়েছে। এটা কোনো অভিশাপ না, চিকিৎসার মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। অতঃপর... এখন তিন মাস কেটে গেছে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে তাসনিয়া কলেজে ফিরে আসলে, মিস রুকাইয়া জিজ্ঞেস করেন, “তোমার বাবা কেমন এখন?” তাসনিয়ার চোখে জল, কিন্তু মুখে হাসি। "ম্যাম, বাবাকে আবার ফিরে পেয়েছি। এখন উনি নামাজে যান, আমাদের চিনেন, গল্প করেন। আর আগের মতো বললেন, ‘তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস তাসনিয়া।’

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...