কুরআনের অন্যতম একটি মিরাকল হলো এর নিখুঁত শব্দের ব্যবহার। শব্দের ব্যবহারে এর যথার্থতা। আরবরা হাঁটা এবং দৌড়ানোর জন্য প্রায় ডজন খানেকের উপরে ক্রিয়াপদ ব্যবহার করতো। কুরআনে ব্যবহৃত এরকম পাঁচ ছয়টি ক্রিয়াপদ নিয়ে এখন আমরা কথা বলবো। হাঁটার জন্য সবচেয়ে সাধারণ ক্রিয়াপদ হলো 'মাশা ইয়ামশি।' আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কুরআনে বলেন- هُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ ذَلُوۡلًا فَامۡشُوۡا فِیۡ مَنَاکِبِهَا وَ کُلُوۡا مِنۡ رِّزۡقِهٖ - "তিনিই তো তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে হাঁটা চলা করো এবং তাঁর রিয্ক থেকে তোমরা আহার কর।" (৬৭:১৫) 'মাশা ইয়ামশি' মানে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ব্যস্তহীনভাবে চলা ফেরা করা। আপনি ধীরে সুস্থে হাঁটছেন- এর নাম মাশা। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাঁটার জন্য যে আরেকটি ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হয়... আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা কুরআনে বলেন- فَاِذَا قُضِیَتِ الصَّلٰوۃُ فَانۡتَشِرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ وَ ابۡتَغُوۡا مِنۡ فَضۡلِ اللّٰهِ - "অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান কর।" (৬২:১০) 'ইনতাসারা' মানে একেকজনের একেকদিকে চলে যাওয়া। জুমুয়ার নামাজ শেষ হয়ে গেলে সবাই যে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে এর নাম ইনতাসারা। ইনতাসারার মাঝে কোনো দ্রুততা নেই, উদ্দীপনা নেই। এলোমেলোতা আছে কিন্তু তাড়াহুড়ো নেই। আরেকটি ক্রিয়াপদ হলো সাইর। আল্লাহ তায়ালা বলেন- قُلۡ سِیۡرُوۡا فِی الۡاَرۡضِ فَانۡظُرُوۡا کَیۡفَ بَدَاَ الۡخَلۡقَ ثُمَّ اللّٰهُ یُنۡشِیٴُ النَّشۡاَۃَ الۡاٰخِرَۃَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ - বল, ‘তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর, অতঃপর দেখ’ কীভাবে তিনি সৃষ্টির সূচনা করেছিলেন, তারপর আল্লাহই আরেকবার সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (২৯:২০) ক্রিয়াপদ 'সাইর' মানে দূরে কোথাও যাওয়া। এখানেও চলার মাঝে কোনো ক্ষিপ্রতা নেই এবং ত্বরা নেই। আমি আসল পয়েন্টে আসছি। একটু পরেই। এই তিন ধরণের ক্রিয়াপদ স্বাভাবিক গতিতে হাঁটার কথা বলছে। এ হাঁটার মাঝে কোনো ত্বরা নেই, তাড়া নেই, ক্ষিপ্রতা নেই, কোনো উদ্দীপনা নেই। এ তিনটি ক্রিয়াপদের সবগুলোই দুনিয়ার কিছু ব্যাপার নিয়ে কথা বলছে। এখন, চলুন দেখি আখিরাত সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য আল্লাহ কোন ধরণের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন। হঠাৎ করেই আপনি এ ক্যাটাগরির শব্দ দেখেন না, আপনি লক্ষ্য করেন ভিন্ন ক্যাটাগরির শব্দের ব্যবহার। শব্দগুলো শুনেই আপনার হার্ট বিট বেড়ে যায়, হিম্মত বেড়ে যায়, কাল্পনিক শক্তি বেড়ে যায়, ঈমান বেড়ে যায়। যেমন, জুমুয়ার নামাযে যাওয়ার জন্য আল্লাহ কোন ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন? یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِذَا نُوۡدِیَ لِلصَّلٰوۃِ مِنۡ یَّوۡمِ الۡجُمُعَۃِ فَاسۡعَوۡا اِلٰی ذِکۡرِ اللّٰ - "হে মু’মিনগণ! জুমু‘আর দিনে যখন নামাযের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর স্মরণের দিকে শীঘ্র ধাবিত হও।" (৬২:৯) ক্রিয়াপদটি হলো فَاسۡعَوۡ - 'ফাসআও।' 'সাআ' হলো এমন হাঁটা যেখানে জিদ নিয়ে, উদ্দেশ্য নিয়ে ক্ষিপ্রতার সাথে, দ্রুততার সাথে হাঁটা হয়। আপনি সবকিছুকে উপেক্ষা করে ক্ষিপ্রতার সাথে সামনে এগিয়ে যান। আপনার একটি গন্তব্য আছে ঐ গন্তব্যে আপনাকে পৌঁছতেই হবে। এর নাম 'সাআ।' আপনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ডান বামে মনোযোগ হারানোর সময় আপনার নেই। নামাজে যাওয়ার জন্য আল্লাহ স্বাভাবিক গতির শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। তিনি 'ফামসু' বলেননি। তিনি 'সিইরু' বলেননি। তিনি বলেছেন ফাসআও। ঠিক পরের আয়াতেই নামাজ শেষ হয়ে গেলে 'ফানতাসিরু'-- ধীরে সুস্থে ছড়িয়ে পড়ো। আগের লেভেলের দ্রুততা তোমাকে দেখাতে হবে না। আরেকটি উদাহরণ। দ্রুত গতিতে হাঁটার জন্য কোন শব্দটি ব্যবহার করা হয়? سريع - সারিই'' সারাআ سرع অর্থ দ্রুত হাঁটা। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা বলেন- وَ سَارِعُوۡۤا اِلٰی مَغۡفِرَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ جَنَّۃٍ عَرۡضُهَا السَّمٰوٰتُ وَ الۡاَرۡضُ ۙ اُعِدَّتۡ لِلۡمُتَّقِیۡنَ - তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি হচ্ছে আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে। (৩:১৩৩) 'ইমসু' অর্থাৎ আস্তে হেঁটে না, سَارِعُوۡۤا সারিউ দ্রুত হাঁটতে থাকো, তাড়াতাড়ি চলো, দ্রুত অগ্রসর হও আল্লাহর মাগফিরাতের দিকে। তো, এখন হঠাৎ করেই গতি বেড়ে গেছে। আপনি ক্যাজুয়াল্লি হাঁটছেন না, আপনি দৌড়াচ্ছেন, রেসিং করে দ্রুত আল্লাহর ক্ষমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এরচেয়ে আরো বেশি গতির আরেকটি শব্দও আল্লাহর মাগফিরাতের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। سَابِقُوۡۤا اِلٰی مَغۡفِرَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ جَنَّۃٍ عَرۡضُهَا کَعَرۡضِ السَّمَآءِ وَ الۡاَرۡضِ - তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হও, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের প্রশস্ততার মত। (৫৭:২১) এখানে ব্যবহার করা হয়েছে سَابِقُوۡۤا সাবিকুও। সাবিকু মানে আপনি এক নম্বর হতে চান। এমনভাবে দৌড়ান যে সবার আগে পৌঁছতে চান। 'সাবাকার' সর্বোচ্চ ভার্সন হলো 'ফাসতাবাকা'। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা বলেন- فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ - "সওয়াবের কাজে তোমরা প্রতিযোগিতা করো।" যখন সৎ কাজের কথা আসে তখন এমনভাবে ধাবমান হও যেনো তুমি সমগ্র মানব জাতির মধ্যে এক নম্বর হতে চাও। তোমার নিজের জীবনে, তোমার দিনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ফাসতাবিকু। তুমি নাম্বার ওয়ান হতে চাও। তোমার দ্বারা যত বেশি ভালো কাজ করা সম্ভব ক্ষিপ্রতার সাথে করতে থাকো। [এছাড়া আরও আছে] - শায়েখ ইয়াসির কাদি

Comments
Post a Comment