Skip to main content

মিরাসে বৈষম্যের অভিযোগ অজ্ঞতামূলক

 


উত্তরাধিকার আইনে নারীর বৈষম্য নিয়ে উত্থাপিত বিষয়টি ইসলাম ও মুসলিমবিরোধীদের একটি অমূলক ও ভ্রান্ত অভিযোগ। যুগে যুগে এ প্রশ্নটি যেমন তর্ক-বিতর্কে রূপ নিয়েছে, তেমনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে নস্যাৎ করতে তৎপর তথাকথিত সুশীলরা কৌশল বুঝে বিষয়টি সময়ে সময়ে সামনে এনেছে; বিশেষ শ্রেণিকে উসকে দিয়েছে। আমি দেখেছি উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিটিও বিষয়টি না বোঝার ভান করে; বিতর্ক করতে পছন্দ করে। কোরআন ও সুন্নাহর প্রমাণ তুচ্ছ করে, যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে বাহ্যিক শুধু একটি বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। তা হলো ‘পুত্র-কন্যার দ্বিগুণ পায়’। দুঃখজনক হলেও সত্য, তারা আল-কোরআনের আয়াতগুলো যেমন পাঠ করেনি, তেমনি ফিকহি বিশ্লেষণও অধ্যয়ন করেননি।

শুরুতেই দেখে নেওয়া যাক, আল-কোরআন এ বিষয়টিকে কীভাবে উল্লেখ করেছে? মোটাদাগে, আল-কোরআনের চতুর্থ সুরা আন-নিসায় পাঁচটি আয়াতে তথা ৭, ১১, ১২, ৩৩ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতগুলোয় ইসলামি উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিন্তু পরিপূর্ণ মূলনীতির আলোচনা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এ বিষয়গুলোর দিকে তাকালে মনে হবে ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষের তুলনায় কম অংশ দেওয়ার মাধ্যমে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বিচার করলে তার উত্তর এই আয়াতগুলোর মধ্যেই এবং বর্ণনার আশপাশে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রায়ই কেউ আলোচনায় আনেন না। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলতে পারি, উত্তরাধিকার বিষয়ে আলোচনা শুরুর আগে বিয়ে-সংক্রান্ত আলোচনা স্থান পেয়েছে। সেখানে স্ত্রীদের মোহর পরিশোধ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং তা সন্তুষ্টচিত্তেই করতে হবে। [আয়াত ৪ : ৪] এটি নারীদের অধিকার এবং মালিকানাও তার।

তদুপরি, কিছু অবস্থা আছে, যেখানে পুরুষরা উত্তরাধিকারী হন না কিন্তু নারীরা হন। এ বিষয়টা আমরা কতটুকু জানি? সে অবস্থাগুলো হলো : (১) নানি (মায়ের মা) উত্তরাধিকারী হতে পারেন কিন্তু দাদা (বাবার বাবা) সব সময় উত্তরাধিকারী নন, (২) মৃত ব্যক্তি মারা যাওয়ার সময় যদি মা থাকেন এবং বাবা না থাকেন, তাহলে মা এ সম্পত্তির মালিক হবেন এবং বাবা না থাকার কারণে বাবার দিকের কোনো পুরুষ এ সম্পত্তির ভাগ পাবে না, (৩) সন্তানহীন ব্যক্তির সম্পত্তিতে তার বাবা-মা না থাকলে এবং একমাত্র বোন থাকলে সম্পত্তির একক মালিক হতে পারেন, কিন্তু ভাই তা পান না বরং অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে হয়, (৪) ছেলের মেয়েরা কিছু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী হন কিন্তু চাচাতো ফুফাতো ভাইয়েরা কোনো ভাগ পান না, (৫) নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট অংশপ্রাপ্ত কিন্তু পুরুষদের কিছু পরিস্থিতিতে ‘আসাবা’ (নির্দিষ্ট অংশ না পেয়ে অবশিষ্টাংশ পাওয়া) হয়। ফলে, নির্দিষ্ট কোনো অংশ নাও পেতে পারেন।

এখন যুক্তি না মানলেও একটি যুক্তি দিই। দেখুন প্রকৃতিগতভাবে একজন পুরুষ যা করতে পারেন, তা একজন স্ত্রী নাও করতে পারেন। আবার একজন স্ত্রী যা করতে পারেন, তা একজন নারী নাও করতে পারেন। তাই বলে কি তাদের মধ্যে সমতা নেই। আছে। এই কিছু ক্ষেত্রে পারা না পারা একে অন্যের মধ্যে যেমন সমতা নিয়ে এসেছে, ঠিক তেমনি শরয়ি বিধানের ক্ষেত্রেও তাই করা হয়েছে।

স্ত্রীর মোহর, ভরণপোষণই শুধু স্বামীর ওপর বর্তায় না বরং তার নিরাপত্তার দায়িত্বও তাকে নিতে হয় [সুরা আল-বাকারাহ : ২৩৩]। মোহরের পরিমাণটাও নির্ধারণ হবে স্ত্রীর সামাজিক অবস্থা বিবেচনায়। ভাই সম্পত্তির দ্বিগুণ পেয়েই তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান না। বরং ওই বোনের প্রয়োজনে ভাইকে দায়িত্ব পালন করতে হয় বাধ্য হয়ে। বোনের প্রয়োজনে ভাইয়ের দায়িত্বপালন বাধ্যতামূলক হলেও বোনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। নারীর কাজ করা বাধ্যতামূলক নয়। তবু তাদের মালিকানার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু স্বামীর জন্য তা ফরজ করে দেওয়া হয়েছে। পুরুষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার স্ত্রীর, বাবা-মা, সন্তানসন্ততি, ভাই-বোনদের দেখাশোনা করা, তাদের প্রয়োজন মেটানো। ক্ষেত্রবিশেষ নিকট-দূর-আত্মীয় প্রতিবেশীর অধিকার নিশ্চিত করা। এটি তাদের ওপর বাধ্যতামূলক কাজ। অন্যদিকে একজন নারীকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

শুধু মালিকানাই যথেষ্ট নয়। বরং তার সঙ্গে নিজের এবং সম্পদের নিরাপত্তাও জরুরি। সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে সে সম্পদ শেষ হয়ে যায়। এগুলোর দায়িত্বও পুরুষদের দেওয়া হয়েছে। নারীরা এসব কষ্ট করা ছাড়াই তার সব অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ করেছে বিনিময় ছাড়া। এটিই শরিয়তদাতার বিধান। এ বিধান সুদূরপ্রসারী। যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার আইন প্রণয়ন করে আধুনিক সভ্যতা কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে উত্তরাধিকার আইন নিশ্চিত করতে পারেনি, সেখানে এক পৃষ্ঠার দিকনির্দেশনায় তার সুষ্ঠু সমাধান করা হয়েছে। জ্ঞানীদের জন্য এখানেও অনেক শিক্ষা রয়েছে। অহেতুক সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করে শুধু হতভাগারাই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...