ছোটবেলা থেকেই আমি খুব পেটুক স্বভাবের। যতটা না খেতে পারতাম, তার চেয়ে বেশি নিতাম। তারপর একটু খেলেই আর পারতাম না, প্লেটে ভাত পড়ে থাকত। এটা নিয়ে তখন চিন্তাও করতাম না। বিষয়টা খুবই স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু একদিন প্রাইমারি স্কুলে থাকাকালীন, বোধহয় তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি। সেই সময়ে, 'ভাত দে' নামের একটা ছবি দেখি বিটিভিতে। আমজাদ হোসেনের এই কালজয়ী সিনেমা আমার ভেতরে এমন একটা ঝাঁকুনি দিল, যেটা আমাকে বদলে দিয়েছিলো সম্পূর্ণ রূপে। সিনেমার গল্পটা এক মা-বাবা আর তার সন্তানের জীবনসংগ্রামের। ক্ষুধার কষ্ট কী, সেটা যে মানুষ কখনো অনুভব করেনি, সে-ও এই সিনেমা দেখে একবার হলেও মনে মনে কেঁদে উঠবে। এক মায়ের অসহায়ত্ব, একটা সমাজের নিষ্ঠুরতা, একটা মেয়ে মানুষ ছোট থেকে বড় হয়ে উঠার সংগ্রাম, সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষদের দ্বারা বার বার পিষ্ট হওয়া গরীব মানুষদের অবহেলিত হওয়া—সব মিলিয়ে এটা শুধু একটা গল্প না, একটা বাস্তবতা। যা আমাদের চারপাশে প্রতিদিন ঘটে যাচ্ছে এখনো। এখন অভাব অনেকটা কম, তবে যে সময়কার গল্প এখানে বলা হয়েছে তখন ভাতের কতটা অভাব ছিলো সেটা আপনার বাবা-মা বা দাদা-দাদিকে জিজ্ঞেস করলেই পাবেন। এই ছবিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলাম শেষ দৃশ্যে। যেখানে শাবানার চরিত্র সবকিছু হারিয়ে, সমাজের সব অবিচারের ভার নিয়ে, একসময় একটা রাইস মিলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে—'ভাত দে! ভাত দে হারামজাদা!!' সবশেষে মৃত্যুর সময় কাতরাতে কাতরাতে চালের গোলায় স্পর্শ করার যে কামনা, এই দৃশ্যটা যে কতটা কঠিন। যে এই দৃশ্যটা দেখেনি তাকে কোনোভাবেই এক্সপ্লেইন করা সম্ভব না ভাই! সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলাম, যার খাবার নেই তার কাছে একমুঠো ভাত মানে জীবন। আর আমাদের যাদের খাবারের অভাব নেই, তারা অবহেলায় সেটা ফেলে দিই! সেদিন থেকে আমি আর কখনো খাবার নষ্ট করিনি। আজও, ভাত খেতে বসলে এই সিনেমার কথা মনে পড়ে। ভাবি, আমাদের প্লেটের প্রতিটা দানার পেছনে কত মানুষের শ্রম, কত মানুষের কষ্ট লুকিয়ে আছে। এক মুঠো ভাতের জন্য মানুষ কতই না কষ্ট করেছে বা এখনো করছে! ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া 'ভাত দে' শুধু একটা সিনেমা না, এটা একটা দলিল। একটা চিরন্তন শিক্ষা। কিংবদন্তি নির্মাতা আমজাদ হোসেন এই সিনেমার মাধ্যমে ক্ষুধার বাস্তবতাকে আমাদের সামনে এতটাই স্পষ্ট করে তুলেছেন যে, একবার দেখলে আপনি আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারবেন না। আপনি কাঁদবেন, কাঁদবেন এবং অনুভব করবেন! -হৃদয় আহমেদ

Comments
Post a Comment