Skip to main content

ঝগড়া

 


টিউশনিতে গিয়ে দেখলাম ছাত্রের মা-বাবা তুমুলঝগড়া। আমার কাছে ব্যাপারটা কেমন অস্বস্তিকর মনে হলো। তবুও ঝগড়ার মাঝে যেহেতু ঢুকেই পড়েছি বিষয়টা খতিয়ে না দেখলেই নয়৷

এদিকে আমার ছাত্র খুব মনোযোগ দিয়ে বাবা-মায়ের ঝগড়ার মাঝে কথা গিলছেন। ফাঁকিবাজ ছেলেটার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে, সে আজ পড়ার মোডে নেই৷ যাইহোক আমি নিচু গলায় আন্টিকে জিজ্ঞেস করলাম, -কি হয়েছে আন্টি? কোনো সমস্যা? আন্টি কিছু বলার আগেই ছাত্রের বাবা বলে উঠলো, -কি আবার হবে? তোমরা তো সবই বুঝো?বর্তমান যুগে কাউকে বিশ্বাস করাটা কত ভয়ানক ব্যাপার! আর সে বিশ্বাস যদি নিজের ঘরের বউ ভেঙে দেয়। তাহলে আর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই মরে যায়। আংকেলের কথাটা মাথার উপরে দিয়ে গেল। এই বয়সে আন্টি কি এমন করে বসলো? যে তার বিশ্বাস ভেঙে গেছে? তাদের বড় ছেলে এবার অনার্স ৩য় বর্ষের ছাত্র। যাইহোক,নিজের মনকে প্রশ্ন করলে উলটাপালটা উত্তর আসবে। তাই আংকেলকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, -কি করেছে আন্টি? ব্যস,এখন গড়গড় করে সব বলতে লাগলো আংকেল। -দ্যাখো না মা! আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ৷ এতো ছলচাতুরী কি আমাদের মানায়? তুমি আমার ছেলেকে পড়ানো বাবদ কতো টাকা সম্মানী পাও? -আমি তো ২০০০ টাকা। -দেখেছো? আর তোমার আন্টি এতো মাস আমার থেকে তোমার কথা বলে ৩০০০ টাকা করে নিতো। শুধু তাই নয়।বড় ছেলের কলেজ, ভার্সিটি, হাত-খরচ সব কিছুতেই বাড়িয়ে বলে আমার কাছ থেকে নিয়েছে। ছোট ছেলের ভর্তি ফি যদি হয় ১ হাজার উনি নিয়েছে ৭ হাজার। বাড়িওয়ালার ভাড়া তো একই কিন্তু কারেন্ট বিলের ক্ষেত্রেও সবসময় আমাকে বাড়িয়ে বলে। আশ্চর্য এগুলো কি? আমাকে এতো কেন মিথ্যে বলতে হবে তার? আমি কি খুব খারাপ স্বামী? তাকে কি আমি না খাইয়ে রাখি? তবে কেন এতো মিথ্যার আশ্রয়? এটা কি আমার বিশ্বাস ভাঙা নয়? কেন সব জায়গায় তার ১ টাকার ক্ষেত্রে ৭ টাকা বাড়িয়ে বলার অভ্যাস? তার যদি টাকার এতোই প্রয়োজন। আমার কাছে চাইতে পারতো। আমি তো দেখি না, তার কোনো কিছুর অভাব আছে? তাহলে কেন এই ছল আমার সাথে? কথাগুলো শুনে আমিও একটু অবাক হয়ে গেলাম। আংকেলের কথা তো সত্যিই।কিসের এতো অভাব আংটির? যার জন্য এতো মিথ্যে বলে টাকা বাড়িয়ে নিতে হয়?আংকেলের কষ্ট পাওয়াটা স্বাভাবিক। আরও অবাক হলাম৷ আন্টি কিছুতেই স্বীকার করছে না। আর সে সোজা বলে দিলো, আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমি উনাদের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে কোনো কথা বললাম না। -হয়তো আপনাদের দুজনেরই কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাপারটা সামলানোর কথা বলে চলে এলাম। পরদিন আবার পড়াতে গিয়ে দেখলাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তার মানে, এটা ভুল বুঝাবুঝি ছিল৷ আমিও আগ বাড়িয়ে কখনও আন্টিকে এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করি নি। তবে মাস দুয়েক পর।ছাত্রের বাবা আমাকে বললো, -নওমি,আমার ছেলেকে সামনে মাস থেকে আর পড়াতে এসো না।আসলে কি করবো বলো তো? হঠাৎ করে আমার চাকুরিটা চলে গেছে। নতুন চাকুরি খুঁজতেও তো মাস দুয়েক লেগে যাবে। তাই বলছি আমরা আবার, তোমাকেই ডাকবো পড়ানোর জন্য। এখন চলতে একটু সমস্যা হয়ে যাবে। কথাটা শুনে আমার কাছে খুব খারাপই লাগলো। এদিকে সামনে আলভির বার্ষিক পরিক্ষা ঘনিয়ে এসেছে। ও তো এমনিতেই ফাঁকিবাজ। আর নিজে নিজে কিভাবে পরিক্ষা দিবে? ভাবতে ভাবতেই পাশেই রুম থেকে আন্টি এসে বললো, -তুমি নওমিকে না করে দিচ্ছো কেন? জানোনা, আলভির পরিক্ষা ঘনিয়ে এসেছে? -হ্যাঁ তো কি করবো? এখন তো আমার চাকুরিটা নেই। -চাকুরি নেই তো কি হয়েছে? আমি আছি না? ওর বেতন নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমার ৬ মাসও যদি চাকুরি না থাকে, আমি তোমার সংসার আর তোমার ছেলেদের ঠিক আগের মতো করেই চালাতে পারবো ইনশাআল্লাহ। আংকেল রীতিমতো অবাক হয়ে গেলো। -মানে? কিভাবে সম্ভব? তোমার ইনকামের তো কোনো রাস্তা নেই। এতো টাকা কোথায় পাবে? -সেদিন তো ওর সামনে আমাকে কত কথা শুনালে।আমি বিশ্বাস ভেঙেছি। তোমার কাছে বাড়িয়ে বলে টাকা নেই৷ তখন আমি তোমার সাথে তর্ক করি নি। আজ বলছি কেন টাকা নেই জানো? বিপদের কোনো হাত পা নেই৷ হঠাৎ কোথায় কোন কাজে লেগে যায় বলা যায় না। আর তোমার কাছ থেকে কম নিলেও এই টাকাটা কি তুমি রাখতে পারতে বলো? পারতে না!আমি নেই বলে কি খরচ করে ফেলি? না। ওই তো, সেদিন তোমার বড় ছেলে এসে বললো, ভার্সিটি থেকে পিকনিকে যাবো টাকা দাও৷ দিয়ে দিলাম। কই তখন তো তোমার কাছে আমি চাই নি? ছোট ছেলেটাকে নিয়ে যখন স্কুলে যাই। ছেলেটা বায়না ধরে মামুনী এটা কিনে দাও,ওটা কিনে দাও। কই কখনও তোমার কাছে আলাদা করে সেই টাকা নিয়েছি? টীচারের বেতন, বাড়িওয়ালার ভাড়া,বুয়ার বেতন, ময়লার বিল, ওয়াইফাই বিল থেকে শুরু করে সব কিছুর টাকা তুমি আমার হাতে ১৫ তারিখের পরে দাও। অথচ তুমি জানোই না, আমি এগুলো প্রতি মাসে ৩ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করি। এতে করে পাওনাদারদের কাছে সম্মান বজায় থাকে। আর সেই সম্মান কি শুধু আমার? শুধু আমার না তোমারও। কারণ তুমি আমার স্বামী। তোমার কাছে আলাদা ভাবে যদি ১০০ টাকা চাই। তুমি কি দিবে আমাকে? কোনো কারণ ছাড়া ১০০ টাকা? দিবেনা।কারণ, তার জন্য তোমার কাছে আমার ১০০ টা কৌফেয়ত দেওয়া লাগবে।আর তুমি আমাকে কি করে বলতে পারলে আমি বিশ্বাস ভেঙে ফেলছি? তোমার কাছে বাড়িয়ে বলি ঠিকই কিন্তু তা এ সংসারেই কাজে লাগাই। কেন বলতো? এ সংসারটা যে আমার। আমার সংসার বাঁচিয়ে রাখার দ্বায়িত্বও আমারই। আন্টির কথা শুনে আমারই গর্ব হচ্ছে। আংকেল তো রীতিমতো বাকরুদ্ধ অবস্থা। ঘরের লক্ষী বুঝি একেই বলে! তার বড় একটি উদাহরণ তো এই পরিস্থিতি।কিন্তু, কত সহজে একজন পুরুষ তাদের ভুল বুঝে ফেলে। আপনি ঘরের কর্তা ঠিক আছে। মাস শেষে কিছু টাকা বেহিসেবীভাবে ঘরের বউকে দিয়ে রাখুন। কখনও এর হিসেব চাইবেন না। দেখবেন কোনো এক বিপদের দিনে অবলম্বন হিসেবে আপনার বউ আপনার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এতে করে বাইরে কারও কাছে আপনার ছোট হতে হবে না। খারাপ সময় আসাটা স্বাভাবিক।সবাই জীবনের কোনো না কোনো এক সময় আর্থিক সংকটে পড়ে। তবে, তা মোকাবেলায় সহধর্মিণীকে পাশে পাওয়াটা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। বিশ্বাস লেখাঃ ফাতেমা আক্তার নওমি।

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...