পাঁচই তৈরির রেসিপি----------------------------------- পাঁচই তৈরির জন্য প্রয়োজন একটি মাত্র উপাদান আর তা হলো - আউশ ধান অথবা কালো বোরো ধান। আউশ ধান এবং কালো বোরো ধানের চাউলের ভাত প্রাকৃতিক ভাবেই হালকা মিষ্টি স্বাদের। আউশ ধান জোগাড় করতে না পারলে অগত্যা অন্য যে কোনো ধান দিয়েই তৈরি করা যাবে। তবে অবশ্যই তা বীজ ধান হতে হবে। প্রথমে দুই /তিন কেজি অথবা প্রয়োজন মত (কম/বেশি ) শুকনো বীজ ধান রাতভর পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরদিন সকালে পানি ঝরিয়ে টুকরি বা ঝুরিতে করে ছায়াযুক্ত স্থানে পাঁচ-ছয় দিন রেখে দিতে হবে। এসময় প্রতিদিন একবার করে পানি ছিটিয়ে দিয়ে ধান হালকা ভাবে ভিজায়ে দিতে হবে। এভাবে ৩/৪ দিনের মধ্যে ধান অংঙ্কুরিত হয়ে শিকড় বের হবে। এই অঙ্কুরিত ধানকে সিরাজগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ট্যাক গজানো। ৫/৬ দিন পর ধানের শিকড় যখন প্রায় এক /দেঢ় ইঞ্চি আকারের হয়ে যাবে তখন রৌদ্রে ভালোভাবে শুকাতে হবে। এবার ঐ শিকড়যুক্ত ধান ঢেঁকিতে কুটে এর চাউল বের করে নিতে হবে। এরপর সেই চাউল ঢেঁকিতে গুঁড়া করতে হবে। অঙ্কুরিত ধানের চাউলের এই গুঁড়া/গুঁড়ো পাঁচই ভাতের মূখ্য উপকরণ। এছাড়া ট্যাক ধানের তুষ পানিতে ভিজায়ে তা ছেকে নিতে হবে। পরবর্তী পদক্ষেপ পাঁচই এর ভাত রান্না করা। সাধারণত বিকেল বেলা কিংবা সন্ধ্যা রাতে কিছুটা নরম করে আউশ ধানের আতপ চাউলের জাউ ভাত রান্না করতে হবে। আতপ চাউল ২/৩ কেজি (অথবা প্রয়োজন মতো)। আমার মা সব সময় পাঁচই এর ভাত রান্নার জন্য মাটির তৈরি ধান সিদ্ধ করার বড় পাতিল ব্যবহার করতেন। এবার রান্না করা সেই গরম ভাতের হাঁড়ির মধ্যে পরিমাণ মতো পূর্বে প্রস্তুত করা চাউলের গুঁড়া এবং ট্যাক ধানের তুষের পানি ও পরিমিত পরিমাণে লবণ ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। মিশানোর সময় প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা গরম পানি ঢেলে দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে বড় হাতল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে হবে। সবশেষে পাতিলের মুখে ঢাকনা দিয়ে তারপর কোনো মোটা কাপড় দ্বারা ভাল করে বেঁধে রাখতে হবে। এভাবে সারা রাত গরম ভাত জাড়িত হয়ে সকালে পাঁচই/পাঁচন ভাতে পরিণত হয়। পাঁচইতো তৈরি হলো এখন তা খাওয়ার পালা। পাঁচই এমনিতেই হালকা মিষ্টি ।আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্য কিছু সাথে না নিয়ে সরাসরি ভক্ষণ করি। এতে অরিজিনাল স্বাদ ও গন্ধ পাওয়া যায়। তবে কেউ ইচ্ছা করলে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য আম, কলা, কাঁঠাল, মধু, গুড়, চিনি, কোরানো নারিকেল, দুধ ইত্যাদির সাথে পাঁচই খেতে পারেন। পাঁচই ভাত মূলত পুরোটাই শর্করা (Carbohydrate)। ভাতে পানি দিয়ে রাখলে বিভিন্ন গাজনকারি (Fermentation) ব্যাক্টেরিয়া (Bacteria) বা ইস্ট (Yeast) শর্করা ভেঙ্গে ইথানল ও ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে। এই ইথানলই পাঁচই এর ভিন্ন রকম স্বাদের জন্য দায়ী। পাঁচই মূলত ভাত সংরক্ষণের একটি পদ্ধতি। সাধারণ তাপমাত্রায় ভাত বেশিক্ষণ রেখে দিলে তা পচে খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কিন্তু পানি দিয়ে রাখলে গাজনকারি ব্যাক্টেরিয়া সেখানে ল্যাকটিক এসিড তৈরি করে যার ফলে এই ভাতের অম্লত্ব বেড়ে যায় (pH কমে)। তখন পচনকারি ও অন্যান্য ক্ষতিকারক ব্যাক্টেরিয়া, ছত্রাক ভাত নষ্ট করতে পারে না। এখানে উল্লেখ্য যে, পাঁচই একটা লোকজ খাবার যা একসময় গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রিয় খাবার হিসেবে বিবেচিত হতো। তবে দেশের সর্বত্র এটা সমানভাবে জনপ্রিয় ছিল না। কালের বিবর্তনে এই খাবার হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে পাঁচই অপরিচিত। এর স্বাদ-গন্ধ-আভিজাত্য নির্ভর করে তৈরির দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার উপর। তাছাড়া পাঁচই তৈরির পর খাওয়ার উপযোগী হতে ৭ /৮ ঘন্টা সময় লাগে। আপনার কাছে এটা ভালো নাও লাগতে পারে তবে বিরূপ মন্তব্য করবেন না। কারণ প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যই মহান আল্লাহ্র অশেষ রহমত। খাবার উপযুক্ত হওয়ার সময় থেকে দুই -তিন ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচই খেতে হয়। তা না হলে পাঁচই পচে গন্ধ হয়ে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে ভালো হয় ফ্রিজের নরমাল তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। তাহলে আপনি পরবর্তী একদিন ভালো ভাবেই খেতে পারবেন। তাছাড়া ফ্রিজের ঠান্ডায় এর স্বাদ বৃদ্ধি পাবে। সতর্কতা : পাঁচই খাওয়ার পর কারো কারো অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে। --মো. আলী আশরাফ খান

Comments
Post a Comment