গত শুক্রবার যেন রক্তের বন্যা বয়ে গেল। হেলিকপ্টার যখন নিচে এসে এটাক করল তখন আমি রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছিলাম। সাথে সাথে মানুষ এদিকে সেদিকে পাগলের মতো দৌড় দিল আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু সব প্রতিষ্ঠান তালা মেরে দারোয়ান বসিয়ে রেখেছে যেনো কেউ না ঢুকতে পারে। সম্পদের প্রতি তাদের কত মায়া, মানুষের প্রতি মায়া নেই। সে যাই হোক, যারা ছাউনী পেয়েছে তারা বলল এত যেন গাজা। তারপরেও চার জন মারা গেল ধানমন্ডি পাঁচ নাম্বার রোডে বিকাল চারটা দিকে। সব মিলিয়ে এবারে যেভাবে আন্দোলন ফুসে উঠে সেই সমীকরণ বদলে দেয় হেলিকপ্টার। অন্যথায় মানুষ পুরা পাগলের মতো হয়ে গেছিল। আমি প্রতিদিন সকালে নামাজের পর লাল সূর্য দেখতাম তার দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বলতাম। আমাদের দেশের উপর আরেকটি রক্তাক্ত দিন নেমে এসেছে। শুক্রবার মাগরিবের নামাজের ঠিক আগে নিউ মার্কেট এরিয়াতে পুলিশ পিছু হটার আগে একেবারে অকারণে কয়েকজন মেরে ফেলে। যারা ছিল তারা বলল এতে প্রচণ্ড দুঃখিত। তারপরে আমাদের আজিমপুরে আক্রমণ হয়। শোনা যাচ্ছে কারফিউর মাঝে বাসার সামনে একটা ছেলে ময়লা ফেলতে গেলে তাকেও মেরে ফেলা হয়। ছাত্রদের মৃত্যুর গল্প আপনারা শেয়ার করছেন। কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি মানুষের জীবন গুরুত্বপূর্ণ। এই যে এত খেটে খাওয়া মানুষ, যাত্রাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এলাকায় এত মানুষ মারা গেল তাদের কথা শুনতে পারছি না। কিন্তু একটা সন্তান পেলে বড় করা কত কষ্টের পিতা মাতা মাত্রই বুঝে। আমি দেখলাম এক ছেলের চোখে ছররা বুলেট প্রবেশ করেছে। একটা চোখের দাম কত? হেলিকপ্টার থেকে ফেলা টিয়ার বোমে একজনের হাত শেষ। একটা হাতের দাম কত? জনগণের টাকা দিয়ে তো মেট্রোর ভাঙ্গা কাঁচ জোড়া লাগানো যায়। যে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু বা অন্ধ হল তার ক্ষতির পরিমাণ কত? আর যেই পিতামাতা সন্তান হারালো? পৃথিবীর সব হিসেব কি টাকার অংকে করা যায়? সবচেয়ে দুঃখের কথা হচ্ছে এই সব অস্ত্র বুলেট ও বেতন আমাদের করের টাকায় কেনা। এবারে আমি খুব ভালো ভাবে বুঝলাম ইসলামে কর হারাম কেন। আল্লাহ যা জানেন আমরা তো জানি না। আমার বাবা অনেক নিষ্ঠার সঙ্গে কর দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে বেশি করেও দিতেন। সেদিন যদি হেলিকপ্টার থেকে আমার উপর আক্রমণ হতো, সারা জীবন আফসোস করতেন। আমার নিজেরও করদাতা হিসেবে আফসোস হচ্ছে আমি নিজেও কিছু খুনের সহায়ক। যেই আমি কোক পর্যন্ত খাই না, সেই আমি কি এখন থেকে কর দিতে পারি?
“উকবা বিন আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ট্যাক্স গ্রহণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” –মুসনাদে আহমাদ: ১৭৩৯৪, সুনানে আবু দাউদ: ২৯৩৭
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যামানায় জনৈক নারী যিনায় লিপ্ত হওয়ার পর অনুতপ্ত হয়ে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তি দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নিজের শাস্তির আবেদন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রজমের আদেশ দেন এবং বলেন,
“لقد تابت توبة لو تابها صاحب مكس لغفر له”. –صحيح مسلم 4528
“সে এমন তাওবা করেছে, যা ট্যাক্স উত্তোলনকারী করলে তাকেও ক্ষমা করে দেয়া হতো।” –সহীহ মুসলিম: ৪৫২৮
হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. (৬৭৬ হি.) বলেন,
“فيه أن المكس من أقبح المعاصي والذنوب والموبقات”. –شرح النووي على مسلم 11\203
“এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয়, ট্যাক্স গ্রহণ নিকৃষ্টতম একটি অপরাধ ও গুনাহ এবং ধ্বংসাত্মক কাজ।” –শরহে মুসলিম: ১১/২০৩
ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রহ. (৮৫৫ হি.) বলেন,
“বর্তমান সময়ে ট্যাক্স হল, জালেমরা এবং তাদের সহযোগীরা নগর-বন্দরে আগমনকারী ব্যবসায়ী এবং বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা থেকে যা উত্তোলন করে থাকে। ইসলামপূর্ব যুগে এই ট্যাক্সের প্রচলন ছিল। ইসলাম তা বাতিল করে দেয় এবং শরয়ী বিধান অনুযায়ী যাকাত, উশর ও খারাজ আদায়ের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে যখন জালেম শাসকরা ক্ষমতা দখল করে, তখন থেকে পুনরায় তারা এ জুলুম শুরু করে। তারপর থেকেই জালেম ও ফাসেক মন্ত্রীরা নির্ধারিত হারে এ ট্যাক্স বসাতে থাকে, তা বাড়াতে থাকে এবং তার অনেক শাখা প্রশাখা বের করতে থাকে। এমনকি পরিশেষে ছোট-বড় সব কিছুতেই তারা ট্যাক্স আরোপ করে। আর এর মাধ্যমে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ বাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, ‘যে আমাদের দ্বীনের মাঝে নতুন কোনো বিষয় উদ্ভাবন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” -নুখাবুল আফকার: ৮/১১৩
ইমাম ইবনে হাযম রহ. বলেন,
‘পথ-ঘাট ও নগরদ্বারে আগমন-প্রত্যাগমনকারীদের থেকে যে চাঁদা উত্তোলন করা হয় এবং হাটে-বাজারে জনসাধারণ ও ব্যবসায়ীদের থেকে আমদানিকৃত পণ্য বাবদ যে ট্যাক্স নেয়া হয়, তা অনেক বড় জুলুম, হারাম ও ফিসক হওয়ার ব্যাপারে সকলে ঐকমত্য হয়েছেন।’ -মারাতিবুল ইজমা, পৃষ্ঠা: ১২১
মোহাইমিন পাটোয়ারী

Comments
Post a Comment