বাংলাদেশের ইতিহাসে অপচয়কারী ব্যয় হচ্ছে আমার মতে ক্রিকেট। কারণ, দেশ জুড়ে বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ জমিতে স্টেডিয়াম নির্মাণ করে খালি ফেলে রাখা (যদিও দেশে গৃহহীন মানুষ আছে), রক্ষণাবেক্ষণের পিছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়, বিসিবির পিছে হাজার কোটি টাকা এবং খেলোয়াড়দের ট্রেনিং ও বিদেশ ভ্রমণ সহ সমস্ত ব্যয়ের রিটার্ন এই জাতির জন্য ঋণাত্মক।প্রথমত, যুবক শ্রেণীর প্রচুর সময় নষ্ট করে ক্রিকেট দেখে। তারা ঠিক মতো কাজ কর্ম ও পড়াশোনা না করে টিভির সামনে বসে থাকে। এমনকি অনেকে এর জন্য মাঠে গিয়ে খেলাধুলাও করে না। এলাকার সম বয়সীদের সাথে মিছে না। কেবল টিভি ও ডিভাইস নিয়ে পড়ে থাকে যার ফলাফল চরম মাত্রায় ঋণাত্মক। কিন্তু খেলোয়াড়রা কি আমাদের দেশকে আর্থিকভাবে লাভবান করেছে? এর উত্তরও না। কারণ ক্রিকেট থেকে বাংলাদেশ অতি সামান্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বরং এই আসরগুলোতে দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা ঢালে এবং দেশের মানুষের কাছে বেশী দামে পণ্য বিক্রি করে সেই টাকা তুলে আনে। সব মিলিয়ে ক্রিকেটের দ্বারা সমাজে কোন অর্থনৈতিক ভ্যালু তৈরি হয় না বরং দেশের আনাচে কানাচে থাকা ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় কারিগর এবং বেকারীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তৃতীয়ত, খেলার মাঝে বিজ্ঞাপনের খরচ অনেক বেশী। প্রায় লক্ষ টাকা পড়ে এক বার বিজ্ঞাপণ দেখাতে। এই বিজ্ঞাপনে মূলত তাই দেখানো হয় যাতে লাভ অনেক বেশী কিন্তু সামাজিক ভ্যালু নেই। সেজন্য দেখবেন আমরা মূলত কোক, পেপসি, জুস সহ যত প্রকার অস্বাস্থ্যকর পণ্যের কিংবা বডি স্প্রে ও অন্তর্বাসের অশ্লীল বিজ্ঞাপন দেখতে বাধ্য হই। এই অশ্লীলতা কেবল বিজ্ঞাপন না, নতুন করে চিয়ার লিডারসদের মাধ্যমেও ছড়ানো হচ্ছে। চতুর্থত, খেলা আর নিছক খেলা নেই এখন, এখানে হার জিতের সাথে যেভাবে লাভ ভাগ বাটোয়ারা হয় তা একেবারে জুয়ার মতন। আর এখনতো খেলাকে কেন্দ্র করে ১০০% জুয়ার ব্যবসা গড়ে উঠেছে যা বর্তমানে অনলাইনে ছড়িয়ে গেছে এবং এর বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে দেদারচে। সবশেষে, এই বিদেশী খেলা গুলো আমাদের দেশীয় খেলাকে হত্যা করেছে। অছচ আমাদের দেশীয় খেলাগুলো খেলতে টাকা লাগে না, সামাজিকতার চর্চা হয় এবং প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক নিবিড় হয়। দেশীয় খেলাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে পুঁজিবাদী পণ্য, অশ্লীলতা ও নোংরা সংস্কৃতি বিস্তার করতে থাকে না। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এই খেলার আসরগুলো জুয়া না। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের টাকাতেই দেশীয় খেলাগুলোকে হত্যা সাধন করা হয়েছে। এমনকি যারা কোনদিন খেলা দেখে না তাদের থেকে কর আদায় করে। জনগণের টাকার কি নিদারুণ অপচয়।
দেশীয় খেলা যে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমরা ছোট থাকতে টাকা ছাড়া খেলেছি। কিন্তু এখন খেলার নামে শিশুদের থেকেও টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিভিন্ন এপ ডাউনলোড করা, কয়েন কেনা, লেভেল আপ করা সহ প্রিমিয়াম ভার্সন কেনায় শিশুদেরকে প্রচুর ব্যয় করতে হয়। ফ্রি গেমে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে পণ্য কিনতে উৎসাহিত করা হয়। আর ছোট বেলা থেকেই ভোগবাদী মানসিকতা তৈরি হয়। সেই তুলনায় আমাদের দেশীয় খেলা গুলো কত সামাজিক! কানামাছি, বৌছি, খো খো, দৌড়, সাঁতার, গোল্লাছুট খেলতে টাকা লাগে না, সামাজিকতার চর্চা হয় এবং প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক নিবিড় হয়। কেবল ঘরে বসে একাকীত্বে ভুগতে হয় না, সেজন্য চাইল্ড সাইকলোজিস্টের কাছেও যেতে হয় না। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে দেশীয় খেলা গুলো শরীর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ঘরে বসে গেম খেলে জিমে ভর্তি হওয়া কোন সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। জিম একে তো ব্যয়বহুল তার উপর এই পণ্যগুলো বিদেশ থেকে আনতে হয়। বিদেশি গাড়িতে চেপে জিমে গিয়ে আবার বিদেশী ট্রেড মিলেই দৌড়াই আমারা। এর অর্থ কী? আরও দুঃখজনক ব্যাপার কি জানেন? যারা আজ বাহিরে খেলতে অভ্যস্ত তারা দেশী খেলা ছেড়ে বিদেশী খেলা (ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি) খেলাতে অভ্যস্ত হচ্ছে। কিন্তু তাতে কি সমস্যা? সমস্যা হচ্ছে এই খেলা গুলোর টিভিতে দেখানো হয় যা শতভাগ নেশা উদ্রেককারী। অনেক সময় আমরা যত না খেলি তার চেয়ে বেশী খেলা দেখি। আর এই খেলার ফাঁকে ফাঁকে পুঁজিবাদী পণ্য, অশ্লীলতা ও নোংরা সংস্কৃতি বিস্তার করতে থাকে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে এই খেলার আসরগুলো যেভাবে সাজানো হয় তা জুয়ার মত। নিছক খেলা না। এই জুয়া এখন বিভিন্ন বেটিং এপের মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে। সবশেষে বিদেশি গেমের বিজ্ঞাপন ও ব্র্যান্ড দেখাতে শিশুরা বিদেশী পণ্য ও পুঁজিবাদী সংস্কৃতির প্রতি এক ধরণের টান অনুভব করে। ফলে বাংলাদেশের মত দেশে আমদানী নির্ভরশীলতা, মেধা পাচার ও অর্থনীতিতে সংকট তীব্র হয়। তারপরেও সরকার দেশি খেলার বিস্তারে খরচ না করে হাজার হাজার কোটি টাকা ও হাজার হাজার বিঘা জমি বিদেশী খেলার উন্নয়নে ব্যয় করছে। আমাদের করের টাকার কী নিদারূণ অপচয়। এই অস্বাস্থ্যকর ও অসামাজিক মোবাইল ও কম্পিউটার গেম ও বিদেশি খেলার পিছে টাকা নষ্ট না করে দেশীয় খেলাগুলোকে ফিরিয়ে এনে কম খরুচে ও সুস্থ জীবন যাপন করা নিয়ে রাষ্ট্রের কাজ করা উচিত।মোহাইমিন পাটোয়ারী

Comments
Post a Comment