ডলারের খেলা বিষয়টি কেমন?মনে করেন, বাংলাদেশ টাকা ছাপিয়ে কিছু জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিল। এখন সমস্যা হচ্ছে বাংলা টাকা আন্তর্জাতিক বাজারে চলে না। তাই বাংলাদেশকে টাকা ভাঙ্গিয়ে ডলার কিনতে হবে। কিন্তু টাকা ছাপিয়ে ডলার কিনতে গেলেই বাজারে টাকার মান পড়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমেরিকার হিসেব ভিন্ন। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ডলারে হয়, সে টাকা ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি আমদানি করে ফেলতে পারে। এর জন্য আমেরিকাকে বিশেষ বেগ পোহাতে হয় না। তবে হ্যাঁ, অত্যাধিক ডলার ছাপালে আমেরিকাকেও মূল্যস্ফীতির মুখে পড়তে হয় বা ডলারের মান পড়ে যায়। তবে এর প্রভাব বাজার থেকে বিদেশী মুদ্রা কেনার মত প্রকট না। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, বাংলাদেশ প্রতি মাসে ৩০০ কোটি ডলার আয় করে এবং ২৭০ কোটি ডলার খরচ করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাসে ৩০ কোটি ডলার সঞ্চয় করতে পারবে যা বিপদের দিনে কাজে লাগবে। কিন্তু যদি এমন হয় যে বাংলাদেশ প্রতি মাসে ২৭০ কোটি ডলার আয় করছে কিন্তু ৩০০ কোটি ডলার খরচ করছে? সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে মাসে ৩০ কোটি ডলার কিনতে হবে। কিন্তু কে বাংলা টাকা কিনবে? আপনি যদি চীনের একজন নাগরিককে বলেন, “আমার কাছে কিছু বাংলা টাকা আছে, আপনি কিনবেন?” স্বভাবতই সে বলবে না। আবার যদি আপনি ব্রাজিলের কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বলেন, “আমার কাছে কিছু বাংলা টাকা আছে, আপনি কিনবেন?” সেও খুব সম্ভবত না বলবে। কিন্তু যদি আপনি সেই একই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, “আমার কাছে কিছু ডলার আছে, আপনি কিনবেন?” সে হয়তো আগ্রহ দেখাবে, রেট জিজ্ঞেস করবে, ভালো দাম পেলে কিনবে। কারণ ডলার সব দেশের প্রয়োজনীয় বস্তু। পর্যটকরা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ডলার নিতে পারে (অন্যান্য মুদ্রা নিলে ভালো দাম পায় না), ব্যবসায়ীরা ডলার দিয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেন করতে পারে, বিনিয়োগকারীরা ডলারে স্পেকুলেট করে, অনেকে নিজ সম্পদ সঞ্চয় করে রাখতে ডলারকে পছন্দ করে। কিন্তু বাংলাদেশের বাহিরে কোন ব্যক্তি কি বাংলা টাকা হাতে রাখতে চাইবে? আপনি ভাবতে পারেন, যারা বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা করে অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে নিজ দেশে পণ্য আমদানি করে, তারা হয়তো বাংলা টাকা হাতে রাখতে চাইবে। উত্তর হচ্ছে না। সে ডলার হাতে রাখতে চাইবে। কারণ আন্তর্জাতিক এলসি ডলারে হয়, বাংলা টাকায় না। একমাত্র যারা বাংলদেশে ঘুরতে আসতে পারে তারা বাংলা টাকা সাথে রাখার চিন্তা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে তাও হয় না। কারণ, বাংলাদেশ কোন বিদেশী পর্যটক আসে না। সামান্য যারা আসে, তাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডলার এমনেই থাকে, তাই বাংলা টাকা কেনার কোন প্রেরণা সাধারনত কাজ করে না। তাছাড়া বাংলা টাকার তুলনায় ডলার বহন করার আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা কম। সবশেষে বাংলাদেশী টাকার মূল্যস্ফীতি ডলারের থেকে বেশি। তাই বাংলা টাকা হাতে না রেখে ডলার রাখলেই উত্তম। সব মিলিয়ে দেখা গেল, বাংলাদেশ যদি রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের তুলনায় মোট আমদানি ব্যয় বেশি করে, খুব দ্রুত ডলার রিজার্ভ (থাকলে) শেষ হয়ে যাবে। তারপরে আর কোন উপায় থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাজারে টাকা বিক্রি করে ডলার কেনা দুরূহ ব্যাপার। তাই টাকার বিনিময়ে ডলার কেনার খেলা শুরু করলে খুব দ্রুত টাকার মান পড়ে যেতে থাকবে। এমন বাস্তবতা আমরা দেখেছি এশিয়ান কারেন্সি সংকটের সময়। আরও দেখা গিয়েছে পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরান সহ নানা দেশে। এই সকল দেশযে খুব বেশি টাকা ছাপিয়েছে তা না। কেবলমাত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেনদেনে ডলার সংকটের কারণে তাদের মুদ্রার খুব দ্রুত মান পতন হয়। কিন্তু সেই তুলনায় ফেডারেল রিজার্ভ (আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক) বহু বছর ধরে বিপুল পরিমাণ ডলার ছাপানোর পরেও খুব কম মূল্যস্ফীতি অনুভব করেছে আমেরিকা। মোহাইমিন পাটোয়ারী

Comments
Post a Comment