Skip to main content

পেট্রো ডলার ব্যবস্থা কী?


 পেট্রো ডলার ব্যবস্থা কী?

পেট্রো ডলার শব্দটি হচ্ছে পেট্রোলিয়াম ডলারের সংক্ষিপ্ত রূপ। মাটির গভীর থেকে উত্তোলিত খনিজ তেল (petroleuml) হচ্ছে পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন ও প্লাস্টিক সহ অনেক নিত্য প্রয়জনীয় পণ্যের কাঁচামাল। এর সাথে ডলারের সাথে এর সম্পর্ক বুঝতে ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসা যাক। ১৯৭১ সালে রিচার্ড নিক্সন যখন স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে, সেই সময় ডলার স্রেফ কাগুজে মুদ্রা হয়ে যায়। এর আগ পর্যন্ত ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ মজুদ থাকতো। হুট করে এমন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মুল্যমান কমে যেতে থাকে। তাই ডলারের বাজার মূল্য ধরে রাখতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডলারের চাহিদা টিকিয়ে রাখতে কালো সোনা বা খনিজ তেলকে সামনে আনা হয়। পরবর্তী কালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন সৌদি আরবকে সকল পেট্রোলিয়াম পণ্য একমাত্র মার্কিন ডলারে বিক্রি করার প্রস্তাব দেয়। এর বিনিময়ে মার্কিন সেনাবাহিনী সৌদি সরকারকে (রাজ পরিবারকে) পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করবে এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহায়তা করবে। আর চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা হবে আমেরিকার বিরোধিতা করার সমিল। তৎকালীন সম্রাট ফয়সাল এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য তেল সম্বৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশ সমূহও পেট্রো ডলার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এভাবে পেট্রো ডলার ব্যবস্থা যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে যেহেতু সকল রাষ্ট্রকেই জ্বালানী তেল, গ্যাস ক্রয় করতে হয় এবং তেল সম্বৃদ্ধ দেশসমূহ একমাত্র মার্কিন ডলারেই তা বিক্রি করে, প্রতিটি রাষ্ট্রকেই ডলার অর্জন করতে হয়। এভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ডলারের চাহিদা ক্রমাগত বিদ্যমান থাকে। অর্থনৈতিক প্রভাব - তেল, গ্যাসের উপর নির্ভরশীল দেশ সমূহ অর্থনৈতিক ঝুঁকি এড়াতে সব সময় আমেরিকার সাথে মুদ্রানীতির সামঞ্জস্য রেখে চলে। বলা যায় এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। উদারহণস্বরূপ সৌদি আরব যদি হুট করে শত্রুর উপর আক্রমণ করে বসে, তখন আমেরিকা শাস্তি স্বরূপ তার উপর ডলার ভিত্তিক লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। ফলে তাদের তেল আর বিক্রি হবে না - মাটির নিচেই পড়ে পড়ে রইবে। ঠিক এমনটিই আমেরিকা করেছে ২০১৫ সালে ইরানের সাথে। কেবল অর্থনৈতিক সুসম্পর্কই নয়, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো তাই আমেরিয়াক্র সাথে সমঝোতা রক্ষা করে চলে। এমন আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ হচ্ছে ভেনেজুয়েলা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পেট্রোলিয়াম সম্বৃদ্ধ দেশ হওয়া স্বত্বেও সে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। এক কথায় পেট্রো ডলার ব্যাবস্থা তেল সম্বৃদ্ধ দেশসমূহকে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে এবং একই সময়ে মার্কিন ডলারকে সমগ্র বিশ্বে শক্তিশালী করে তুলেছে। আরেকটি চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে এই ব্যবস্থায় ডলার পুনরায় আমেরিকাতে ফেরত আসে। কারণ যেহেতু তেল রপ্তানীকারক দেশসমূহ তেল বিক্রি করে মার্কিন ডলার অর্জন করে, তারা নিজেদের হাতে প্রচুর ডলারের রিজার্ভ করতে পারে। এই রিজার্ভ মার্কিন সরকারকে সুদে ঋণ দেওয়া হয়। চুক্তি সেভাবেই করা। সব মিলিয়ে সৌদি আরব সহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে পেট্রোডলার চুক্তি সরাসরি সুদখোরে পরিণত করেছে। এবার আসা যাক দ্বিতীয় পয়েন্টে। মার্কিন সরকারের বন্ড কেনা ছাড়াও এই ডলার প্রচুর অস্ত্র ও বিলাস বহুল পণ্য কেনা হয়, তার পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা হয়। এভাবে আমেরিকাতেই ডলার ফেরত আসে। আবার আমেরিকা তেল কিনে এবং আবার মধ্যপ্রাচ্যে ডলার যায়। এই চক্রকে বলে Petro Dollar Cycle বিকল্প ব্যবস্থা - পেট্রোডলার বলয় ভাঙ্গার প্রচেষ্টা দীর্ঘ এবং রক্তাক্ত। ইরাকের সাদ্দাম হোসেন তেল রপ্তানিতে স্বর্ণভিত্তিক মুদ্রাব্যাবস্থা চালু করতে চেয়েছিল। ২০০৩ সালে মার্কিন মিত্র বাহিনী ইরাকে আক্রমণ করে এবং সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তেল সম্বৃদ্ধ দেশ লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিও স্বর্ণ ভিত্তিক মুদ্রাব্যাবস্থা চালু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১১ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করা হয়। ইরাক এবং লিবিয়া উভয়ই বর্তমানে ডলারে তেল রপ্তানি করছে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চীন আমেরিকাকে টপকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল আমদানিকারক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এর পর থেকেই পেট্রো ইউয়ান নিয়ে আলোচনা আসতে শুরু করে। এর প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে চীন স্বর্ণভিত্তিক পেট্রোইউয়ান চালুর ঘোষণা দেয়। সেই বছরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে। এই সকল ঘটনা সমূহ একেবারে বিচ্ছিন্ন নাকি সংযুক্ত তা বলা মুশকিল। যাই হোক, পেট্রো ইউয়ান প্রকল্প এখন পর্যন্ত সুবিধা করতে পারেনি। স্বর্ণের পাশাপাশি কাগুজে মুদ্রা ব্যাবহার করে পেট্রো ডলার ব্যাবস্থা থেকে বের হবার প্রচেষ্টাও বিদ্যমান আছে। রাশিয়া ইতোমধ্যেই ইওরোপের সাথে ইওরোতে এবং চীনের সাথে ইউয়ানে গ্যাস রপ্তানি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পরে বিরোধী রাষ্ট্রের সাথে রাশিয়া সরাসরি রুবলে তেল, গ্যাস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। রাশিয়ার সমান্তরালে চীনও এই প্রচেষ্টা অব্যহত রাখছে। ইতোমধ্যেই চীন, ইরানের সাথে রিয়াল ও ইউয়ান ব্যাবহার করে বাণিজ্য চালাতে সম্মত হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা ব্যাবহার করে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে ভেনেজুয়েলা। এই লক্ষ্যে তারা তেলভিত্তিক নতুন ক্রিপ্টো মুদ্রা উদ্ভাবন করেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘পেট্রো’। চীনও ক্রিপ্টো মুদ্রা ব্যাবস্থাকে বড় পর্যায়ে নিয়ে অভ্যন্তরীণ লেনেদেনে ব্যাবহারের জন্য পাইলট প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। সবশেষে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া সরাসরি এই সিস্টেম থেকে বের হয়ে আসতে বাধ্য হয়। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির সিংহভাগ হয় ডলারে। এর একটি কারণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান, অপর একটি কারণ হচ্ছে সচেতনতার অভাব। তবে প্রয়োজন হচ্ছে পরিবর্তনের প্রসূতি। বর্তমানে ইরান, ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া ও চীনের উপর ডলার ভিত্তিক বিভিন্ন মাত্রার নিষেধাজ্ঞা জারি করায় এই দেশগুলো বিকল্প মুদ্রার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে উঠছে। খুব ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সমীকরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং দিন দিন বিশ্ব এই ব্যবস্থা থেকে বের একটু একটু করে বের হয়ে আসছে। মোহাইমিন পাটোয়ারী

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

Narcissist স্বামী স্ত্রী

  Narcissist স্বামী স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত থাকেন : Narcissist স্বামী প্রায়ই স্ত্রীর সাফল্যে প্রচণ্ড ঈর্ষান্বিত থাকেন। ধরুন, স্ত্রী আর্থিকভাবে বা সামাজিকভাবে স্বামীর চেয়ে বেশি capable, কিংবা তার চেয়ে উচ্চপদে কাজ করছেন। এমন ক্ষেত্রে, যদিও তিনি স্ত্রীর আয় ভোগ করেন, তবুও এ বিষয়ে তিনি খুশি নন; বরং এটি তাকে ইনসিকিওর ফিল করায়। স্ত্রীর সামাজিক পরিসর (social circle) যদি বড় হয় বা তার বেশি বন্ধু-বান্ধব থাকে, সেখানেও তিনি নিজেকে ইনসিকিওর মনে করেন। সবচেয়ে বেশি ইনসিকিওর অনুভব করেন যখন স্ত্রীর rank বা পদমর্যাদা তার চেয়ে উচ্চ হয়। ধরুন, স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে একটি পদে কাজ করছেন, কিন্তু স্ত্রী হয়তো আরও উচ্চ পদে রয়েছেন। তখন Narcissist স্বামী খুবই ইনসিকিওর ফিল করেন। ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসে ফাইন্যান্স, সামাজিক পরিসর, এবং পদমর্যাদার ক্ষেত্রে আমরা প্রায়ই দেখি যে স্ত্রীর rank স্বামীর চেয়ে উচ্চ হলে Narcissist স্বামী প্রচণ্ড ইনসিকিওর ফিল করেন। যেমন, স্ত্রী যদি কোনো প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হন, তিনি বলবেন, “তুমি ম্যানেজার, কিন্তু বাসায় কিছুই ম্যানেজ করতে পারো না; তুমি মানুষকে ক...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...