Skip to main content

থাইল্যান্ডে চিকিৎসা – যে তথ্যগুলো জানার

 


গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রায় এক মাস সময় আমি ব্যয় করেছি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আমার মায়ের চিকিৎসা ও এর ভিসা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রসেস নিয়ে। আজকের লেখায় আমি থাইল্যান্ডে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন টিপস নিয়ে আলোচনা করব। যারা ভবিষ্যতে থাইল্যান্ডে চিকিৎসার জন্য যাবেন, তাদের আশা করি এটা কাজে লাগবে।

ব্যাকগ্রাউন্ড: আমার মায়ের চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য আমরা থাইল্যান্ড যাব বলে ঠিক করি। আমার মায়ের চোখে নার্ভজনিত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশের ডাক্তারদের মতামতগুলো খুব স্পষ্ট ছিল না। আর তাই  বিকল্প ও উন্নত চিকিৎসার জন্যই আমাদের থাইল্যান্ডে যাওয়া।

ভারত না নিয়ে থাইল্যান্ড কেন? – কারন ভিসা দ্রুত পাওয়া যাবে।

আমরা তিনজন থাইল্যান্ড যাব সিদ্ধান্ত হলো। আমার মা, বোন, আর আমি। থাইল্যান্ডে যাওয়ার প্রথম ধাপ হলো ভিসার জন্য আবেদন করা। আমার মা আর বোন দুইজনই বাংলাদেশে থাকে, কাজেই তাদের বাংলাদেশীদের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী ভিসার জন্য এপ্লাই করতে হবে। কিন্তু, আমি কানাডার নাগরিক বিধায় আমার কোন ভিসা লাগবে না।

ভিসা: ভিসার জন্য এপ্লাই করতে অভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্ট ব্যবহার করুন (এরা ৫-৬ হাজার টাকা ফি নিবে)। ভালো ট্রাভেল এজেন্ট ব্যবহার করা খুব ইম্পর্টেন্ট – ঝামেলা কম হবে, কাজ দ্রুত হবে। এই ট্রাভেল এজেন্ট ভি,এফ,এস গ্লোবালের কাছে আপনার ভিসা এপ্লিকেশন জমা দিবে, ভি,এফ,এস গ্লোবাল জমা দিবে থাই এমব্যাসির কাছে, এরপর থাই এমব্যাসি আপনার ভিসা দিবে। (ট্রাভেল এজেন্ট ছাড়া ভি,এফ,এস গ্লোবালের কাছে সরাসরি ভিসা এপ্লিকেশন করা যায় কিনা – ব্যাপারটা আমার জানা নেই। আমার সময় কম থাকায় এই বিষয়টা নিয়ে আমি ঘাঁটাঘাঁটি করিনি)।

ভিসা এপ্লিকেশন করতে থাইল্যান্ডের যে কোন হাসপাতালের সাথে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। আপনি বললে আপনার ট্রাভেল এজেন্ট এই এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দিবে। কিন্তু আমার উপদেশ হলো এই এপয়েন্টমেন্ট আপনি নিজেই ফোন করে নিন। আপনি যেখানেই ট্রাভেল এজেন্ট ঢুকাবেন সেখানেই দেরী হবে। আর আমি কানাডা থেকে বাংলাদেশে ছুটি নিয়ে এসেছিলাম বিধায় আমার হাতে সময় খুব কম ছিল। আমি নিজেই হাসপাতালে ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি, এর সুবিধা হলো বার বার প্রয়োজনমত এপয়েন্টমেন্ট চেন্জ করতে পেরেছি, ট্রাভেল এজেন্ট এর হাতে পায়ে ধরতে হয়নি। এপয়েন্টমেন্ট নিতে কোন টাকা লাগে না বা ক্রেডিট কার্ড ইনফরমেশন দেয়া লাগে না, শুধু সুন্দর করে ইংরেজী বলতে হয়। আমি বলব – আপনি বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ফাইনালি দেখান আর না দেখান, ভিসার জন্য বামরুনগ্রাদ থেকে এপয়েন্টমেন্ট নিন, কারণ ওদের কাস্টমার সার্ভিস খুবই ভাল। ফোন করলে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আপানাকে এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দিবে এবং প্রায় সাথে সাথেই ইমেইলে এপয়েন্টমেন্ট লেটার পাঠিয়ে দিবে। আপনি আপনার মোবাইল থেকেই সরাসরি ফোন করতে পারবেন। হাসপাতালের নম্বরের আগে থাইল্যান্ডের কান্ট্রি কোড +৬৬ ব্যবহার করবেন। যদি তাড়াতাড়ি এপয়েন্টমেন্ট  চান তো ফোনেই এপয়েন্টমেন্ট নিন – ইমেইল বা অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে নয়। অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে এপয়েন্টমেন্ট চাইলে তারা আপনাকে ২ দিন পরে উত্তর দিবে।  

ভিসার এপ্লিকেশনের জন্য কি কি লাগে তা আপনি ইন্টারনেটে সার্চ করলে সহজেই পেয়ে যাবেন (যেমন – এটা দেখতে পারেন)। অভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্ট ব্যবহার করুন। বাংলাদেশে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের এজেন্ট আছে যারা অভিজ্ঞ – আপনি তাদের কাউকে ব্যবহার করতে পারেন। আমি প্রথমে অনভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্ট ব্যবহার করে ২ দিন সময় নষ্ট করেছি। তারা বলেছিল – আমার মায়ের পুরনো সকল পাসপোর্ট অবশ্যই জমা দিতে হবে, না হলে ভিসা হবে না। ভুল তথ্য। পুরনো পাসপোর্ট হারিয়ে যেয়ে থাকলে আপনি যে জি,ডি করেছেন সেটার কপি জমা দিলেই হবে। আর পুরনো পাসপোর্ট যদি থেকে থাকে তাহলে শুধু লাস্ট এর ১টা পুরনো পাসপোর্ট দিলেই হবে।  অনভিজ্ঞ ট্রাভেল এজেন্ট আরো বলেছিল – থাইল্যান্ডের হাসপাতালের এপয়েন্টমেন্ট লেটারে রোগীর পাশাপাশি এটেনডেন্ট এরও নাম থাকা লাগবে। ভুল তথ্য। শুধু রোগীর নাম আর জন্মতারিখ থাকলেই চলে।     

আপনি যেদিন আপনার ট্রাভেল এজেন্ট এর কাছে এপ্লিকেশন জমা দিবেন, তার ৭-১০ বিজনেজ ডে পরে এপয়েন্টমেন্ট নিন। আমাদের ক্ষেত্রে আমি ট্রাভেল এজেন্ট এর কাছে এপ্লিকেশন জমা দিয়েছিলাম ২৬শে সেপ্টেম্বর, তারা ভি,এফ,এস গ্লোবালের কাছে দেয় ২৭শে সেপ্টেম্বর। ২৮শে সেপ্টেম্বর ছিল ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি, ২৯-৩০শে সেপ্টেম্বর শুক্র-শনিবার ছুটি। অক্টোবরের ১ তারিখ ভি,এফ,এস গ্লোবালের ওয়েবসাইটে দেয় যে আমাদের এপ্লিকেশন থাই এমব্যাসির কাছে আছে। আর এর পর পঞ্চম কর্মদিবসে ৫ই অক্টোবর বিকালে আমার মা আর বোনের ভিসা হয়। অনেকেই ভিসা এপ্লিকেশন জমা দেয়ার পর ভি,এফ,এস গ্লোবাল এবং/অথবা থাই এম্বেসি থেকে ফোন পেয়ে থাকেন। তবে, আমরা এরকম কোন ফোন পাইনি। 

নিচের ওয়েবসাইট থেকে আপনি চেক করতে পারবেন:

https://www.vfsvisaonline.com/Global-Passporttracking/Track/

বিকালে ভিসা হওয়ায় আমার ট্রাভেল এজেন্ট বলেছিল তারা সেদিন পাসপোর্ট দিতে পারবে না। কিন্তু, জোরাজুরি করার পর তারা সেদিন সন্ধাতেই ভি,এফ,এস গ্লোবাল থেকে পাসপোর্ট নিয়ে আমাদেরকে দিয়েছিল।

প্লেনের টিকেট ও থাইল্যান্ড মুদ্রা: আপনি যে কোন ট্রাভেল এজেন্ট বা অনলাইন থেকে (যেমন – গো যায়ান এপ) দিয়ে টিকেট করতে পারেন। আমরা ইউ এস বাংলার ফ্লাইট নিয়েছিলাম, দামে রিজনিবল, সার্ভিস ভাল। বাংলাদেশ থেকে সকাল ১০ টায় ছাড়ে, পৌনে তিন ঘন্টা লাগে পৌছতে। কিন্তু, থাইল্যান্ড যেহেতু সময়ে বাংলাদেশ থেকে ১ ঘণ্টা এগিয়ে, তাই থাইল্যান্ড সময় পৌনে ২ টার আপনি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যংককের সুবর্ণভূমি (বি,কে,কে) এয়ারপোর্টে পৌঁছবেন। আর ফেরার দিন, রিটার্ন ফ্লাইট ছাড়বে থাইল্যান্ড সময় দুপুর ২টা ৪০ মিনিটে।

 আপনার সাথে যদি হুইলচেয়ারগামী যাত্রী থাকে এবং এয়ারপোর্টে আপনি যদি হুইলচেয়ার সার্ভিস চান তাহলে আপনার এয়ারলাইন্সকে আপনার ফ্লাইটের কমপক্ষে ৮ ঘন্টা আগে জানাতে হবে। এর পরে যদি জানান তাহলে হুইলচেয়ার সার্ভিস পাবেন কিনা কোন গ্যারান্টি নাই (চেক ইনের সময় যদি হুইলচেয়ার রিকয়েস্ট করেন তাহলে পাবেন কিনা কোন গ্যারান্টি নাই, যদিও আমরা পেয়েছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ।)

আপনি আপনার নিজের হুইলচেয়ারও নিয়ে আসতে পারেন অথবা এয়ারপোর্টের হুইলচেয়ারও ব্যবহার করতে পারেন। আপনি কোনটি করছেন তা চেক-ইনের সময় চেক-ইন অফিসারকে জানান। 

আপনি যদি নিজের হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন তাহলে প্লেনে উঠার আগ-পর্যন্ত রোগী ঐ হুইল্চেয়ারেই থাকবে। উঠার ঠিক আগ-মুহুর্তে এয়ারলাইন্সের কেউ এসে হুইলচেয়ারটি নিয়ে চেক-ইন লাগেজে দিয়ে দিবে। এই হুইলচেয়ার পরবর্তীতে থাইল্যান্ড পৌঁছে কনভয়ার বেল্ট থেকে কালেক্ট করতে হবে।

থাইল্যান্ডের মুদ্রাকে বাথ বলে। গুগলে সার্চ করলে ১ বাথ = ৩ টাকা দেখাচ্ছিল, কিন্তু আমি যখন বাথ কিনতে গিয়েছিলাম তখন ৩.৫-৪.০০ টাকা করে পড়েছিল।

থাইল্যান্ডে চলাফেরা ও মোবাইল: আপনি বাসে চড়তে পারেন কিন্তু আমি যেহেতু রোগি নিয়ে গিয়েছি তাই ট্যাক্সি / উবার ছাড়া অন্য কোন বাহনে চড়া হয় নি। আমি বলব – থাইল্যান্ডের উবার ভাড়া বাংলাদেশের চেয়েও কম এবং গাড়িগুলো খুব ভাল। তাই ট্যাক্সি/উবার ব্যবহার করাই আমি সাজেস্ট করব।

তবে থাইল্যান্ডে আসলে “উবার” এপ টা নেই। এর দুইটা রিপ্লেসমেন্ট আছে – গ্র্যাব আর বোল্ট। আমার প্রথমে গ্র্যাবটা সেট আপ করতে একটু সমস্যা হচ্ছিল, প্লাস গ্র্যাব এ ভাড়াও একটু বেশী। তাই আমি প্রায় সবসময়ই বোল্ট এপ টা ব্যবহার করেছি। আপনি যদি এপ ব্যবহার না করে সরাসরি নিজে ট্যাক্সি ঠিক করেন তাহলে ৫০-১০০ বাথ ভাড়া বেশী পড়বে। তাই, সবচেয়ে সাশ্রয় হচ্ছে বোল্ট এপ ব্যবহার করা। আর ড্রাইভারদের ব্যবহার খুব অমায়িক ও ভদ্র। বোল্ট এর ড্রাইভাররা এক্সট্রা টাকা চাইবে না।  অন্যদিকে ট্যাক্সি দরাদরি ও মিটার দুইভাবেই চলে। মিটারে চললে আপনার কাছে ৫০ বাথ অতিরিক্ত চাইতে পারে।

আপনি এয়ারপোর্টে নামার পর মোবাইল সিম কিনে নিবেন। পুরো এয়ারপোর্ট জুড়ে অসংখ্য সিম বিক্রির স্টোর পাবেন। লাগেজ সংগ্রহের কনভয়ার বেল্টের সাথেই কয়েকটা এরকম স্টোর আছে। ব্যাংকক যেহেতু টুরিস্ট সিটি, তাদের ফোনের প্যাকেজগুলো খুবই টুরিষ্ট-ফ্রেন্ডলি। আমি এ,আই,এস কোম্পানির সিম কিনেছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে। ২৯৯ বাথে সিম সহ ১৫ জিবি ডাটা, ৫০ মিনিট লোকাল কল, এ,আই,এস থেকে এ,আই,এস কল ফ্রি। 

আপনি সিম এনাবল করে এয়ারপোর্টেই বোল্ট এপ ব্যবহার করে ছোট গাড়ী বা বড় গাড়ি নিতে পারবেন। আমরা এক্স-এল সাইজের গাড়িয়ে নিয়েছিলাম (কম্প্যাক্ট এস ইউ ভি)। এতে আমাদের ৩ জনের তিনটা বড় লাগেজ, দুইটা হ্যান্ড-লাগেজ, হুইলচেয়ার সব জায়গা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের হোটেল ছিল ব্যাংককের ব্যস্ততম “সুকুমভিত ১১” রোডে। উবার ভাড়া এসেছিল সাড়ে পাচশ টাকা। (প্রসংগত বলে রাখি – বাংলাদেশে থাকতে এক এজেন্ট এর সাথে আমার কথা হয়েছিল, সে ১৩০০ টাকা চেয়েছিল এই ট্রিপ এর জন্য। ভাগ্যিস নেইনি!)

আপনার সিম এর ডাটা বা কল লিমিট শেষ হয়ে গেল রিচার্জ করা খুবই সহজ। এদের রিচার্জের সিস্টেম অনেকটা বাংলাদেশের মতই। প্রথমে টাকা ভরবেন, তারপর পছন্দমত প্যাকেজ কিনবেন। মোবাইলে টাকা ভরার অনেক রকম অপশন আছে – এ,টি,এম মেশিন, সেভেন-ইলেভেনের রিচার্জ বুথ, এপ। তবে সবচেয়ে সহজ বোধহয় অনলাইনে রিচার্জ করা নিচের সাইট থেকে। শুধু মনে রাখবেন, আপনি যখন আপনার মোবাইল নম্বর লিখবেন তখন তা শুন্য দিয়ে শুরু করতে হবে। পুরো নম্বরটা ১০ ডিজিটের হবে।

https://www.ais.th/en/consumers/package/prepaid/top-ups

https://www.ais.th/en/consumers/package/prepaid/add-ons/home

এই আই এসের সাইটে বিভিন্ন ডাটা/কল প্যাকেজ পাবেন। ওদের সাইটে কিভাবে ব্যালেন্স চেক করা যায় সেই তথ্যও পাবেন।

হোটেল: বেশীরভাগ বাংলাদেশী ব্যাংককে এসে এম্বাসেডর হোটেলে উঠে। এটা “সুকুমভিত ১১” রোডে।  আমি এম্বাসেডরে উঠিনি। আপনি বুকিং ডট কম থেকে রিভিউ ও দাম থেকে আপনার পছন্দমত হোটেল নিতে পারেন (ট্রাভেল এজেন্ট না ধরাই ভাল)। সুকুমভিত ১১ রোডে থাকার সুবিধা হলো এখান থেকে আপনার প্রয়োজনীয় সব কিছু খুব কাছে। ১০ মিনিট হেটে আপনি সবচেয়ে বিখ্যাত বামরুনগ্রাদ হাস্পাতাল বা রাটনিন চক্ষু হাসপাতালে যেতে পারবেন। অনেকগুলো মানসম্পন্ন বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট ও আছে এই রাস্তায় (বাঙলা খাবার, মুন রেস্টুরেন্ট , লিটল স্পাইসি, মেজবান)। অনেকগুলো মানি এক্সচেঞ্জ পাবেন এখানে। গ্রোসারী করার জন্য পাবেন ২ টা সেভেন-ইলেভেন, আরো ভালো গ্রোসারি করতে ভিলা মার্কেট, রাস্তায় ফলের দোকান, ১০ মিনিট হাটলেই আরবদের মার্কেট যেখানে প্রচুর আরবী খাবার ও আতর পাওয়া যায়। এই মার্কেটে একটা ছোট মসজিদও আছে যে মসজিদে আমি জুম’আর নামাজ পড়েছি। মসজিদটা একটা রেস্টুরেন্ট এর ভিতরে উপরের তলায়। রেস্টুরেন্ট এর নাম – “মিডল ইস্ট হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট”। এখানে জুমার খুতবা শুরু হয় ১২:৩০টায়, নামাজ ১টায়। জায়গা ছোট তাই মসজিদ খুব দ্রুত ভরে যায়, মসজিদে জায়গা পেতে চাইলেই খুতবা শুরুর প্রথম দিকেই চলে যান।  

“সুকুমভিত ১১” রোডে এমবাসেডর হোটেল এর কাছাকাছি বাংলাদেশী কয়েকটা মুদির দোকান টাইপের স্টোর আছে। কাজেই, বাংলাদেশী তেল/সাবান আনতে ভুলে গেলে অসুবিধা নাই, এখানে সব পাবেন।

থাই রা কেমন: থাই রা খুবই বিনয়ী জাতি। এবং বেশীরভাগ থাই বেশ সৎ। অর্ধেক ব্যাংককবাসী ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজী পারে। তারা আপনাকে সাহায্য করতে চাইবে, ঠকাতে চাইবে না। আমি ওদের মধ্যে কোন রেসিজম দেখিনি। থাইরা সবাই একজন আরেকজনকে খুব সম্মান করে ও হেসে কথা বলে। আপনার ট্যাক্সি ড্রাইভার, হোটেলের দারোয়ান, হাসপাতালের লিফট্ম্যান, রিসেপশনিস্ট সবাই আপনার সাথে হেসে কথা বলবে।  

তবে থাইল্যান্ড হলো বডি মাসাজ, ড্যান্সবার, গাজা ও এলকোহলের স্বর্গ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর আপনি সুকুমভিত এলাকায় হাটতে থাকলে অনেক থাই মেয়ে আপনাকে হাই স্যার, হ্যালো স্যার বলে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইতে পারে। আপনি তাদের দিকে না তাকিয়ে হেঁটে চলে গেলে কোন সমস্যা নাই। রাস্তায়ও তারা বিভিন্ন আপত্তিকর জিনিস বিক্রি করতে থাকে। তাই সন্ধ্যার পর আপনি আপনার সন্তান নিয়ে হোটেলের বাইরে না বের হওয়াই ভাল। আমাদের হোটেলের কাছের বারগুলোতে রাত ১০ টা থেকে শুরু করে ৩টা পর্যন্ত মিউজিক এর শুব্দ শুনেছি আমরা।

খাওয়া-দাওয়া: হেন দেশের খাওয়া নাই আপনি ব্যাংককে পাবেন না। আর বাঙ্গলাদেশী হোটেল গুলোর রান্না ভাল, দামও রিজনেবল (আপনি গুগলে সার্চ করলেই দাম/মেনু সব পেয়ে যাবেন)। কাজেই বাংলাদেশী খাবার একদমই মিস করবেন না।

কেনা-কাটা:

ব্যাংককে একটু পর পরই আপনি সেভেন-ইলেভেন গ্রোসারী স্টোর পাবেন। এগুলোতে আপনার দৈনন্দিন খাবার থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ছোট-খাট সবকিছুই পাবেন। পানির বোতল চাইলে এখান থেকে কিনতে পারবেন। তবে, আমাদের হোটেলে প্রতিদিন ৩-৪ টা ফ্রি পানির বোতল দিত। এছাড়া বিশুদ্ধ পানি রিফিল করারো ব্যবস্থা ছিল। এছাড়াও হাসপাতালেও ফ্রি ছোট ছোট পানির বোতল থাকে। আপনি গ্রোসারির জন্য ভিলা মার্কেটেও যেতে পারেন, ওদের ফলের কালেকশন বেশী। রাস্তাতেও অনেক ফল ও জুসের ফেরিওয়ালা পাবেন।

সুকুমভিত এলাকায় হাটলে আপনি সব রকম জিনিস কেনার প্রচুর দোকান পাবেন। এগুলোতে দামাদামী হয়। আপনার কাছে যে ব্যাগ ৮০০ বাথ চাইবে, দামা-দামী করে সেটা হয়ত আপনি ৫০০ বাথে কিনতে পারবেন। তবে কিছু স্টোরে ফিক্সড প্রাইস আছে, আপনি স্টোর দেখলেই বুঝতে পারবেন। 

আর আপনি যদি ভালো সুপার মার্কেট থেকে কাপড়-জামা বা গিফট আইটেম কিনতে চান তাহলে বিগ-সি তে যেতে পারেন। রাচাদামরী এলাকার বিগ-সি টা খুব ভাল। এটা একটা শপিং মল এর ভেতরে অবস্থিত। কাজেই, আপনি অনেক স্টোর ঘুরে পছন্দ মত জিনিস কিনতে পারবেন। দাম খুবই রিজনেবল।  আমরা বিগ-সি এক্সট্রা (রাচাদাফিসেক রোডে অবস্থিত) তেও গিয়েছিলাম। আমাদের ভাল লাগেনি।

শুনেছি এম,বি,কে সেন্টারও শপিং এর জন্য ভাল, যাওয়া হয়নি। এছাড়া যেতে পারেন প্যালাডিয়াম মলে – এই মলের বাইরে বংগবাজারের মত প্রচুর ফেরিওয়ালা কাপড় নিয়ে বসে। 

চিকিৎসাঃ

ডাক্তার দেখাতে চাইলে আগে ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নেয়া ভাল। তবে এপেয়েন্টমেন্ট না নিয়েও আপনি আউট-পেশেন্ট-ক্লিনিকে গেলে এবং ডাক্তার এভেইলেবল থাকলে আপনাকে তখুনি এপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দেখবে। আপনার রোগের আগের ইতিহাস থাকলে আগের প্রেস্ক্রিপশন ও রিপোর্টগুলো দিন।

কোন হাসপাতালে দেখাবেন? ব্যাঙ্ককে অসংখ্য হাসপাতাল। আপনি ঘাটাঘাটি করে দেখুন, আপনার যে স্পেশালিস্ট দরকার সেটা কোন হাসপাতালে বেশী আছে। সব প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর ওয়েবসাইটে ডাক্তারের লিস্ট পাবেন, তারা কিসের স্পেশালিস্ট জানতে পারবেন, কবে কবে পেশেন্ট দেখেন তাও জানতে পারবেন। মনে রাখবেন – সব ডাক্তার সব দিন রোগী দেখেন না। কোন কোন ডাক্তার সপ্তাহে মাত্র ১ দিন রোগী দেখেন, তাও ২ ঘন্টার জন্য।  

আমার মায়ের যেহেতু চোখের সমস্যা ছিল তাই আমরা প্রথমে গিয়েছিলাম রাটনিন আই হসপিটালে। রাটনিন হাসপাতালের ডা. পিসিত আমার মায়ের ফাইল থেকে বললেন উনার যে সমস্যা তাতে শুধু চোখের ডাক্তারে হবে না অন্যান্য আরো স্পেশালিষ্ট লাগবে। আপনি উনাকে বামরুনগ্রাদ বা অন্য কোন জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তারের ভিজিট ছিল ১০০০ বাথ, কিন্তু নার্সের ফি, ফাইল চেক ফি অন্যান্য মিলিয়ে ২৩০০ বাথের মত পড়ল।

এরপর বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে গেলাম – যেটা ব্যাংককের শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল নামে পরিচিত। এখানকার ডাক্তারগুলো বেশ অভিজ্ঞ। বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের ডাক্তার আম্মার ফাইল থেকে একটা ইনভেস্টিগেশন প্ল্যান দাড় করালেন। তিনিও সর্বমোট ফি একই রকম নিলেন। কিন্তু, তিনি চোখ, ব্রেইন ও মেরুদন্ডের এম, আর, আই দিলেন।

বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে অন্য হাসপাতাল গুলোর মতই খরচ লাগে, কিন্তু খরচ বেড়ে যায় রোগিকে এডমিট করালে বা টেষ্ট করালে। বামরুনগ্রাদের এম,আর,আই এর জন্য ৭৫,০০০ বাথ চাইল। এত বেশী খরচ বিধায় আমরা টেষ্টটা এখানে করালাম না। আমরা গেলাম “ব্যাংকক ক্রিশ্চিয়ান হসপিটাল”-এ। এখানে একই পরীক্ষা প্রায় এক তৃতীয়াংশ খরচে করানো যায়। পরে এই রিপোর্ট নিয়ে বামরুনগ্রাদের ডাক্তারকে দেখিয়েছিলাম – উনি আরো টেস্ট করতে দিয়েছিলেন। বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের চিকিৎসা আমাদের ভালো লাগে নি, খুব বেশী টেস্ট দেয়। তারচেয়ে “ব্যাংকক ক্রিশ্চিয়ান হসপিটাল” এর ডাক্তারগুলো অনেক মানবিক। আমরা বাকী চিকিৎসা ওখানেই করিয়েছিলাম।

“ব্যাংকক ক্রিশ্চিয়ান হসপিটাল” এ খরচ কম হলেও এদের সার্ভিস খুব ভাল। আর এই দুই হাসপাতালের মাঝামাঝি খরচের আরেকটা হাসপাতাল হলো – “সামিতভেজ সুকুমভিত হসপিটাল”।  আরেকটি দামী হাসপাতাল হলো “ব্যাংকক ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল”।

থাইরা ইংরেজী প্রেসক্রিপশনকে “মেডিকেল সার্টিফিকেট” বলে। মেডিকেল সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য ওরা অল্প কিছু টাকা অতিরিক্ত রাখে। আপনাকে নার্স যখন জিজ্ঞেস করবে – মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগবে কিনা, তখন অবশ্যই “হ্যাঁ” বলবেন – নাহলে প্রেস্ক্রিপশন হাতে না-ও পেতে পারেন আর পেলেও সেটা থাই ভাষায় হবে, ইংরেজীতে না।

সরকারী হাসপাতাল এর কি অবস্থা? ব্যাংককে বেশ কিছু সরকারী হাসপাতাল আছে যেমন – চুলা লং কর্ন হসপিটাল, সিরিরাজ হসপিটাল।  বাংলাদেশে কেউ কেউ আপনাকে বলবে আপনি ব্যাংককে যেয়ে সরকারী হাসপাতালে দেখান খরচ কম পড়বে। কিন্তু বাস্তব হলো – আপনি বাংলাদেশ থেকে এসে ব্যাংককে সরকারী হাসপাতালে দেখানো প্রায় অসম্ভব। এক – সরকারী হাসপাতালে স্পেশালিষ্ট দেখাতে হলে ৬ মাস থেকে ১ বছরের লম্বা সিরিয়াল আছে। সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার নিজে আমাকে এ কথা বলেছেন। আমি তারপরেও চেষ্টা করেছিলাম – এপয়েন্টমেন্ট পাইনি।  দুই – সরকারী হাসপাতালের নার্স এমনকি অনেক ডাক্তারো ইংরেজী বলতে পারে না। তাদের ওয়েবসাইটগুলোতেও ইংরেজী তথ্য খুব সীমিত। তিন – আমি যতদূর ঘাটাঘাটি করে পেয়েছি ওয়েব সাইট অনুসারে টুরিস্টরা সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারে না।

আজ এ পর্যন্তই। আশা করি লেখাটা আপনার উপকারে আসবে। ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমাপ্রার্থি। ড. আদনান ফায়সাল

Comments

Popular posts from this blog

মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার

  প্রায়ই সকালে খবরে দেখি, দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কখনো মধ্যবয়স্ক কেউ, কখনো আবার শিশু। প্রত্যেকটি মৃত্যু সংবাদই আমাকে মনে করিয়ে দেয়, কার মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কে আমরা কেউই জানি না, কিন্তু এটা আমাদের সাথেই থাকে সব সময়। আমার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে একদিন আর দেখা হবেনা, এটাই সত্য আল্লাহ বলেন: “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫) এই কঠিন সত্য আমরা জানি ঠিকই। কিন্তু দুনিয়ার সুখ-দুঃখের ভেতরে আমরা এতটাই বিভোর হয়ে থাকি যে মৃত্যু নিয়ে খুব কমই ভাবি। আমরা প্রায়ই মানুষের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বলে মনে করি। কিন্তু আদৌ কি তা সত্য? মৃত্যু কি সত্যিই কোনো দুর্ঘটনা? রাসুল (ﷺ) বলেছেন: “মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো উপহার” (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২৬১) রাসুল (ﷺ) কেন মৃত্যুকে উপহার বললেন, এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, তিনি বিশেষভাবে মুমিনদের কথা বলেছেন। সেই সব মানুষদের, যারা দুনিয়ার চেয়ে আল্লাহ তায়ালাকে বহু গুণ বেশি ভালোবাসে। মৃত্যুর মাধ্যমেই আমরা দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে প্রবেশ করি আরেক জীবনে। সেই জীবনের শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই। আর যদি আমরা মুমিন হই, ...

জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি

  অনেকেই জীবনে খুব বড় হতে চান । বড় কাজ করতে চান, বড় বিজনেস করতে চান, দেশ পরিবর্তন করতে চায়। খুব ভাল এই চাওয়া গুলো। মন বড় রাখাই উচিত । কিন্তু এর পাশা পাশি আমরা যেটা ভুলে যাই যে, অনেক ছোট ছোট কাজেও কিন্তু সাফল্য এবং জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে থাকে। আপনি প্রতিদিন নামাজ পড়ছেন ৫ বার । এটাও বড় সাফল্য । আপনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করেন, এটাও সাফল্য । আপনি করো ক্ষতি করেন না। পরিবারের বিপদে আপদে পাশে থাকেন। রোজ একজন মানুষ কে খাওয়ান। আপনি ৯ টার অফিসে ৯ টায় হাজির হন, কাজে ফাঁকি দেন না। এসব কিছুই বিশাল সাফল্য । আমরা কেন জানি এসব ছোট ছোট কাজ কে সাফল্য মনে করি না। আমরা শুধু জীবনে ফাটায় ফেলতে চাই। এবং তা করতে যেয়ে জীবনকে অপ্রয়োজনে কষ্টকর করি। সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয় না। আমি আপনি চাইলেই ইলন মাস্ক হতে পারবোনা । কিন্তু একজন ভালো মানুষ আমরা সবাই হতে পারব যাকে সমাজের কাজে লাগে। সমাজে ১০% মানুষ বড় কাজ করবে। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়েছেন, ভালো পরিবার দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন - তারা জন্ম থেকেই কিছুটা আলাদা। কিন্তু বড় কাজ করতে পারছেন না মানে আপনি জীবনে সফল নয় - এটা ভাবা ঠিক নয়।...

নিকটবর্তী মানসিক রোগ

  ১. অস্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তা ২. খাবারে ও পানিতে কিছু মেশানোর সন্দেহ ৩. ভাংচুর, সন্দেহ প্রবনতা ৪. গায়েবী কথা শোনা ৫. একা হাসা ও কথা বলা ৬. টেনশন, অস্থিরতা, উদ্বেগ, বিষন্নতা, হতাশা, একই চিন্তা ও কাজ বারে বারে করা ৭. খিটখিটে মেজাজ ৮. দীর্ঘমেয়াদী মাথাব্যথা, ঘাড় ও বুক সহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও জ্বালাপোড়া মাথা ঘোরা, বুক ধরফর, হাত-পা ঝিনঝিন ৯. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, হিস্টিরিয়া, কথা বন্ধ ১০. অসামাজিক আচরণ মাদকাসক্তি সহিংসতা ও নিজের শরীরে আঘাত করা উপরের সমস্যাগুলোর যেকোন একটা হলে আপনি দ্রুত সময়ের মাঝে নিকটবর্তী মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। ========================================= বিয়ের পর প্রত্যেক পুরুষের semen fluid analysis করা উচিত। ‌ এটা একটা বেসিক infertility টেস্ট যাতে দেখা হয় পুরুষ‌ মানুষটি বাবা হওয়ার যোগ্য কিনা। বিয়ের আগে করলে আরো ভালো। এটি করতে খরচ হয় স্থানভেদে মাত্র এক থেকে দেড় হাজার টাকা।সরকারি হাসপাতালে করলে ১০০ টাকায় করতে পারবেন। আমাদের দেশে কোন দম্পতির বাচ্চা না হলে এখনো অনেক জায়গায় মেয়েদেরকে ব্লেইম করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যাটা থাকে ...