উজবেকিস্তানে গেলে কোন শহরে যাওয়া উচিত?
১২ মাস চাকরিসূত্রে উজবেকিস্তানে থাকার সুবাদে এ দেশটি চষে বেড়ানোর সুযোগ হয়েছে। তাসখন্দ, বুখারা, গিজদুভান, সমারখন্দ, তিরমিয, বেরুনী, খিভা, উরগেন্স, নুকুস, কুংগ্রাড, ময়নাক, আরাল সাগর, মারগিলন, ফারগানা, আন্দিজান, নামাঙ্গন, কাশি, মারহামাত, শাখরিজাবস, আমিরসয় সহ বহু জায়গায় ঘুরার সুযোগ হয়েছে। সেটার উপর ভিত্তি করে আজকের এই লিখাটা।
সাধারণত যারা উজবেকিস্তান ঘুরতে যায় তার সিংহভাগ তাসখন্দ, সমারখন্দ এবং বুখারায় যাওয়ার প্লান করেন। এ তিনটা শহর ঘুরে অনেকেই হতাশ হয়ে বলেন, " আহ! ইমাম বুখারী, ইমাম তিরমিযীর জন্মস্থানে ইসলামের এ অবস্থা!! " এই শ্রেণীর মানুষরা উজবেকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে জানে না৷ উজবেকিস্তানে ১৯২১ সাল থেকে সোভিয়েতের অধীনে থাকার সময় ইসলাম পালন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল৷ ১৯৯১ সালে স্বাধীন হলেও তখনকার প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভও কম্যুনিষ্ট স্টাইলে ২০১৬ পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন এবং এই সময়ও ইসলাম নিষিদ্ধ ছিল৷ মূলত ২০১৬ র পর থেকে ইসলাম পালন আবারও শুরু হয়৷ প্রায় দুইটা প্রজন্ম ইসলাম থেকে দূরে ছিল। তাসখন্দ, সমারখন্দ, তিরমিজ, খিভা, কাশি, বুখারায় গেলে আপনার মনে হবে ইউরোপীয় সংস্কৃতির দেশ। বাজারঘাট সব জায়গা নারীদের দখলে৷ যদিও এ শহর গুলোতে অনেক পীর আওলিয়ার জন্মভূমি।
ইসলামি সংস্কৃতি দেখতে চাইলে আপনি ভ্রমণ করতে পারেন নামাঙ্গিন, আন্দিজান, ফারগানা, মারগিলন এই অঞ্চল গুলোতে৷ এ শহর গুলোর বাজারঘাটে বেশিরভাগই পুরুষ, নারীরা বেশিরভাগই বোরখা এবং হিজাব পরিহিত৷
নামাঙ্গন অঞ্চলে সাবেক সোভিয়েত আমলেও ইসলাম পালন সমুন্নত ছিল৷ এই জন্য এ অঞ্চলের মানুষ এটা নিয়ে গর্ববোধ করে। তো যারা সবুজ অঞ্চল ফলমূলের এলাকা এবং ইসলামি সংস্কৃতি দেখতে চান তারা এই এলাকাগুলোতে যেতে পারেন৷
মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্চয় হলো আরাল সাগর শুকিয়ে যাওয়া। দুঃসাহসিক ভ্রমন করে আরাল সাগর এবং জাহাজের কবরস্থান দেখতে চাইলে যেতে পারেন যেতে পারেন উজবেকিস্তানের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল কারাকালপাকস্থানের ময়নাকে৷ আমার মনে হয় প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে আমিই প্রথম মূল আরাল সাগরে গিয়েছি৷ ৬৭ হাজার বঃকি: এর আরাল সাগরে শুকিয়ে এখন মাত্র ১২ হাজার কিমি অবশিষ্ট আছে৷ মৃত সাগরের মত ভেসে থাকতে চাইলে মূল আরাল সাগর ঘুরে আসতে পারেন তবে অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। নিরাপদ দেশ উজবেকিস্তান ভ্রমন করুন নিশ্চিন্তে:
Uzbekistan: A Safest Country to Visit for all:
ভ্রমনের জন্য উজবেকিস্তান খুবই নিরাপদ একটি দেশ৷ কোন রকম অযাচিত দুশ্চিন্তা ছাড়া উজবেকিস্তান ঘুরতে যেতে পারেন একলা কিংবা দোকলা অথবা পরিবার বন্ধুজন নিয়ে৷ এমনকি আপনি একলা মেয়ে হলেও নিশ্চিতে ঘুরতে পারবেন উজবেকিস্তানে৷ কোন ধরনের হ্যারাসমেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা একদমই ক্ষীণ৷ সর্বোচ্চ যেটা হতে পারে সেটা হলো রশিক উজবেক পুরুষরা আপনাকে চোখ মারবে 😏😏।
অনলাইনে ইভিসা প্রাপ্তি খুবই সহজ এবং সাদা পাসপোর্টেও ভিসা নিশ্চিত৷
ভারতীয় বিমানসংস্থা ইন্ডিগো তে করে কম খরচে দিল্লি হয়ে আসা যাওয়া করতে পারেন।
আর আপনি যদি ভারত বয়কটের চরম সমর্থক হয়ে থাকেন অথবা আপনার টাকা যদি ডেন্স দেয় তাহলে আপনি অন্যান্য বিমান যেমন তার্কিশ, এয়ার আরাবিয়া, কাতার এয়ারলাইন্স, এমিরাত এয়ারলাইনস এ যেতে পারেন৷
উজবেকিস্তানে বিভিন্ন শহরের মধ্যে টুরিস্ট লোকেশন গুলোতে একদম স্বল্প ব্যয়ে ঘুরতে ব্যবহার করতে পারেন Yandex go (like UBER but best service) আর সমারখন্দ, বুখারা সহ আন্তঃশহরে যেতে অবশ্যই প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে পারেন ট্রেন ভ্রমন৷ আরামদায়ক এবং স্বল্প ব্যয়ে উজবেকিস্তানের ট্রেন ভ্রমন টা মিস করাটা ছোটখাটো ধরনের বোকামি হবে৷ অনলাইন থেকে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে অথবা ট্রেন স্টেশন ( ভোকজাল) থেকে অরগিনাল পাসপোর্ট দিয়ে নিজের টিকেট নিজেই কাটতে পারেন৷
ট্রেন ভ্রমন ভাল না লাগলে বা টিকেট ম্যানেজ না করতে পারলেও সমস্যা নাই৷ শেয়ারড প্রাইভেট কার অথবা বাসে করে সহজেই এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতে পারবেন।
হোটেল বা হোস্টেল সিটের বুকিং সহজেই বুকিং ডট কম থেকে দিতে পারেন৷
ভাষাগত জটিলতা ছাড়া উজবেকিস্তান ভ্রমনে আর কোন রকম সমস্যা রিপোর্ট হয় নাই এখন পর্যন্ত৷ মোবাইলে গুগল মামার সহযোগিতা নিয়ে এ জটিলতা সহজেই নিরসন করা যাবে৷
অবশ্য আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য আরেকটা সমস্যা হতে পারে সেটা হল খাওয়ার সমস্যা৷ যারা ঝাল পছন্দ করেন তারা আমার মত কাঁচা মরিচ সাথে রাখতে পারেন৷
এখন পর্যন্ত উজবেকিস্তানের মানুষ খুবই ভদ্র, অপ্রতারক এবং অধোঁকাবাজ৷ অপরিচিত হিসেবে এরা কাউকে বিপদে তো ফেলবেই না উল্টো উপকার করবে...
যেহেতু নিরাপদ দেশ, মানুষ ভাল তাই নিজে নিজেই নিশ্চিতে ঘুরতে যেতে পারেন, একান্ত দরকার না হলে কোন ধরনের এজেন্সির সহযোগীতা প্রয়োজন হবে না৷ সাহস করে ভ্রমণ শুরু করতে পারেন৷
উজবেকিস্তান ভ্রমণের উত্তম সময় হলো এপ্রিল থেকে জুন এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। ভয়াবহ গরম থাকে জুলাই আগস্ট মাসে। স্নোফল দেখতে যেতে পারেন ডিসেম্বর জানুয়ারীতে৷
ফল খেতে যেতে পারেন মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। উজবেকদের পোশাকআশাক:
Traditional dress of Uzbekistan
ফ্যাশন সচেতন উজবেকিস্তানের মেয়েরা সাধারণত রঙবেরঙের জামা কাপড় পছন্দ করে। শপিংমলে অনেক জরি চুমকি জামা দেখা যায়৷ মডার্ন মেয়েরা ওয়েস্টার্ন পোষাকে অভ্যস্ত অনেকটা। ইসলামি কালচারের মেয়েরা হিজাব পড়ে বের হয়৷ এবং দিনদিন উজবেকিস্তানে হিজাবি মেয়ের সংখ্যা দৃশ্যমান আকারে বাড়তেছে (হাসমিক, আমার আরমেনিয়ার কলিগ)৷
ট্রেডিশনাল পোশাক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পড়ে। সাধারণত উজবেক মেয়েরা ওড়না খুবই কম পরিধান করে।
এসব তাসখন্দ, বুখারা, তিরমিজ এবং সমারখন্দের চিত্র।
তবে নামাঙ্গন, ফারগানা, মারগিলন এবং আন্দিজানের দৃশ্য উজবেকিস্তানের অন্য অঞ্চল থেকে একদমই আলাদা। এখানে প্রায় প্রতিটি মহিলা বোরখা এবং হিজাব পরে। এ এলাকা গুলোতে পরিপূর্ণ ইসলামি কালচার লক্ষণীয়৷
পুরুষদের পোষাকে তেমন একটা বৈচিত্রতা নাই৷ উজবেক পুরুষ বিয়ে করতে গেলেও কোর্ট টাই পরে, অফিসে গেলেও কোর্ট টাই পরে।
উজবেকরা ব্যক্তিগত আয়ের প্রায় ৫০% পোশাকে বা ফ্যাশনের পিছনে খরচ করে। একজামা বেশিদিন পরে না৷ নতুন ডিজাইনের কোন জামা বাজারে আসলে সেটা কেনার জন্য এরা হুমড়ি খেয়ে পরে৷
এদের পোশাক-আশাকের মধ্যে অশ্লীলতা একদমই দৃশ্যমান নয়....
ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে উজবেকিস্তান ভ্রমনে সাবধান হউন:
২০২৩ থেকেই আমি বলে আসছিলাম যে উজবেকিস্তান ভ্রমনপিপাসুদের জন্য চমৎকার একটি গন্তব্য হতে যাচ্ছে৷ আমার ভিডিও দেখে এখন শত শত মানুষ উজবেকিস্তানে ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও উজবেকিস্তান ভ্রমন নিয়ে অনবরত বিস্তারিত অথেনটিক তথ্য শেয়ার করে আসছি তবুও অনেকেই না জানার কারণে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন৷ বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি উজবেকিস্তানে ভ্রমন প্যাকেজ অপারেট করে আসছেন৷ এরকম দুটো টুর এজেন্সি কে আমি চিনি যারা সফলতার সাথে উজবেকিস্তানে টুর অপারেট করে করতেছেন। এর বাহিরে হয়তবা আরও এজেন্সি বর্তমানে টুর অপারেট করতেছে৷ বাট সময় এসেছে আপনাদের সাবধান হওয়ার৷
জাস্ট ২ দিন আগে আমার মেসেঞ্জারে এক আপু নক দিয়ে উনার প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয় টা আমাকে জানান৷ ঐ আপুর মতে, উনারা ৬ জন উজবেকিস্তানে যাওয়ার জন্য এক এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেন (ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করার সুযোগ না থাকায় ঐ এজেন্সির নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকলাম)। নির্দিষ্ট বাজেটে উনারা একমত হয়ে উজবেকিস্তান ভ্রমণের জন্য সবকিছু চূড়ান্ত করেন এবং ঐ এজেন্সি কে টাকা ও দেন। এজেন্সি তাদের ফ্লাইট টিকেট ও পাঠান। সব কিছু প্রায়ই ঠিক মতই এগুচ্ছিল কিন্তু হঠাৎ করে ঐ এজেন্সির লোকের সাথে উনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়৷ ফ্লাইট টিকেট ও উনাদের অগোচরে বাতিল করা হয় এবং শেষমেষ উনাদের উজবেকিস্তান ভ্রমন স্থগিত হয়ে যায়৷
ঘটনাটা জানতে পেরে খুবই মর্মামত হলাম৷ একটা এজেন্সির এহেন কাজে এখন যে সব টুর এজেন্সি ভাল কাজ করে তাদের উপরেও মানুষ অনাস্থা পোষণ করতে পারে।
মো: আকবর হোসেন
চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী
sound of silence channel/ youtube

Comments
Post a Comment